মেলায় আসেনি নতুন ইসলামি বই, ক্রেতাও নেই

অমর একুশে বইমেলায় গত কয়েক বছরে ইসলামি বইয়ের চাহিদা বেড়েছে। ২০২৪ গণঅভ্যুত্থানের পর এ সংখ্যাটা আরও বেড়েছে। তবে এবারে দৃশ্য ভিন্ন। একদিকে আসেনি নতুন ইসলামি বই, অন্যদিকে পাঠক-ক্রেতাদেরও তেমন সাড়াশব্দ মেলেনি মেলায়।
নতুন বই আনেনি বেশিরভাগ প্রকাশনী
এবারের মেলায় অংশ নিয়েছে প্রায় ৫০টি ইসলামি প্রকাশনী, যাদের প্রায় কেউই নতুন বই সেভাবে আনেননি। দুয়েকটি প্রকাশনী ব্যতিক্রম হলেও মেলায় থাকা অধিকাংশ বই আগেই প্রকাশ হওয়া।
সমকালীন প্রকাশনীর স্টলের সামনে মাদ্রাসাপড়ুয়া তরুণ সাইদ বিন হাসান নেড়েচেড়ে দেখছিলেন কিছু বই। নতুন বই না পেয়ে মাদানীনগর থেকে আসা এই পাঠক আলাপে হতাশাই জানালেন, ‘ইসলামি প্রকাশনীগুলোতে নতুন বই তেমন একটা চোখে পড়েনি। প্রায় সবই পুরাতন বই। লোকজনেরও আনাগোনা নেই।’
মেলায় অংশ নেওয়া হবে কী হবে না, এ নিয়ে অনেক প্রকাশনী কিছুটা সময় দ্বিধায় ছিল। তার প্রভাবও পড়েছে কিছু ক্ষেত্রে। মাকতাবাতুল ইসলামের বিক্রয়কর্মী আব্দুর রউফ বলেন, ‘গতবারের বইমেলায় সুন্দর স্টলের জন্য পুরস্কার পেয়েছিলাম আমরা। এবারে অংশ নেওয়ার বিষয়ে দ্বিধা ছিল, পরে তাড়াহুড়ো করে স্টল করতে হয়েছে। নতুন বইও নিয়ে আসা সম্ভব হয়নি।’
‘লেখকপত্র’র সম্পাদক ও লেখক জহির উদ্দিন বাবর অবশ্য রোজার মধ্যে বইমেলায় পাঠক-ক্রেতার আসার বিষয়টি কঠিন বলে উল্লেখ করলেন, ‘পবিত্র রমজানের মধ্যে বইমেলায় সাড়াশব্দ নেই। অন্যান্য সময়ের চেয়ে রোজার মাসে মানুষজনের জন্য মেলায় আসা কঠিন। এ জন্য তেমন লোকজন আসছে না, বিক্রিবাট্টাও একদম নেই। এ জন্য প্রকাশকরা নতুন বই আনেননি।’
দর্শনার্থী কম, বিক্রিতেও মন্দা
মঙ্গলবার (৯ মার্চ) মেলার প্রাঙ্গণ ঘুরে দেখা যায়, তেমন মানুষই নেই। সেভাবে কোনো পাঠক বা দর্শনার্থীর দলও দেখা গেল না। ইসলামি বইয়ের স্টলগুলো প্রায় ফাঁকা, কিছু স্টলের বিক্রয়কর্মী একা বসে পার করছেন অলস সময়। কোথাও দুয়েকজন পাঠক বই নেড়ে দেখছেন।
শুরু থেকেই মেলায় পাঠকের উপস্থিতি কম বলে জানান বিক্রয়কর্মীরা। সারাদিনে বইয়ের বিক্রিবাট্টা ৫ থেকে ২০টি। প্রতি বছর মেলার শেষদিকে থাকে পাঠকের উপচেপড়া ভিড়, এবারে পুরোই উল্টো। মেলা যত শেষের দিকে, দর্শনার্থী আরও কমছে। গার্ডিয়ান পাবলিকেশনসের বিক্রয়কর্মী জাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘ইসলামি প্রকাশনা অঙ্গনে বড় প্রতিষ্ঠান হিসেবে আমাদের সুনাম আছে। আমাদেরও এবার নতুন বই আসেনি। বিগত বছরের তুলনায় বই বিক্রির অবস্থা খুবই নাজুক।’ মাকতাবাতুল ইসলামের বিক্রয়কর্মী আব্দুর রউফ বলেন, ‘মেলায় পাঠকের খরা চলছে। বই বিক্রির এত মন্দা অবস্থা এর আগে বোধহয় হয়নি।’
সুকুন পাবলিশিং লেখক আরিফ আজাদের একটি নতুন বই এনেছে ‘আজি হতে হাজার বছর আগে’। এ বইটিসহ আরিফ আজাদের কয়েকটি বই তাদের ভালো বিক্রি হচ্ছে। অন্য বইয়ের তেমন বিক্রি নেই। ‘গত বছর শুরু থেকেই পাঠকের সমাগম ছিল। গত বছর অন্য দিনগুলোতে যেমন পাঠক ছিল, এবার ছুটির দিনেও তেমন পাঠক নেই’, বললেন প্রকাশনীর বিক্রয়কর্মী হাফিজুর রহমান।
কেন এমন পরিস্থিতি
জাতীয় নির্বাচন ও রমজান মাসের কারণে এবারের বইমেলা নিয়ে অনেক ধরনের জটিলতা ছিল আগে থেকেই। সাধারণত ফেব্রুয়ারি মাসের পুরোটা জুড়ে বইমেলা হয়। কিন্তু নির্বাচন এবং তার পরে মেলার সময়সীমা নিয়ে বিবিধ জটিলতর পর মেলা শুরু হয় ২৬ ফেব্রুয়ারি। রোজার মাসে মেলায় অংশ নেওয়া নিয়ে প্রতিষ্ঠিত প্রকাশনীগুলো শুরুতেই আপত্তি জানালেও, শেষদিকে সেই জটিলতা নিরসন হয়। তবে আশঙ্কা বদলে যায়নি, মেলায় পাঠক-দর্শনার্থীর সংখ্যা শুরু থেকেই পড়তির দিকে থেকেছে। মাসব্যাপী মেলা নেমে এসেছে ১৮ দিনে। রোজা, ইফতার, তারাবি নামাজ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ও ঈদুল ফিতরের কারণে পাঠক-ক্রেতার সমাগমের এ অবস্থা বলে মতামত দিয়েছেন অনেকে।
বইমেলা-২০২৬ এর সদস্যসচিব ড. মো. সেলিম রেজা এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘স্বাভাবিকভাবেই অন্যান্য বছরের মতো লোক সমাগম এবার হয়নি। বিকালের দিকে পাঠক কিছুটা কম থাকলেও সন্ধ্যার দিকে প্রচুর পরিমাণ পাঠকের সমাগম ঘটছে। তারা বই কিনছে। অন্যবারের চেয়ে অবশ্যই কম, তবে নিরাশ হওয়ার মতো নয়।’
গার্ডিয়ান পাবলিকেশনসের উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মাহমুদুল হাসান এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘নানা কারণে মেলার তারিখ বারবার পেছানোর ফলে পাঠকের মধ্যে মেলাকেন্দ্রিক উৎসাহ-উদ্দীপনা নেই। রমজান মাস, প্রকাশকরা সিরিয়াস নন, বাংলা একাডেমিকেও তেমন সহযোগিতপূর্ণ মনে হয়নি, সব মিলিয়ে এ অবস্থার মধ্যে মেলা চলছে। ফলে মেলায় পাঠকের আনাগোনা আশঙ্কাজনক হারে কমে গেছে। বিগত দিনের মেলাগুলোর তুলনায় এবার সাড়া খুবই কম।’ যেহেতু আগামী বছরেও ফেব্রুয়ারি মাসেই রোজা শুরু হবে, সে জন্য সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় ও বাংলা একাডেমির এখন থেকেই এ বিষয়ে ভিন্ন পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনা গ্রহণ করা উচিত বলে মতামত দেন তিনি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ড. মো. সেলিম রেজা বলেন, ‘যথাসময়ে পরিকল্পনা নেওয়া হবে। রমজান মাথায় রেখে পরিকল্পনা করা হবে। এবারও পরিকল্পনা ছিল। নির্বাচন এবং রোজার কারণে ২০ ডিসেম্বর থেকে ২০ জানুয়ারি পর্যন্ত মেলা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। পরে সরকারের সিদ্ধান্তে নির্বাচনের আগে মেলা করা যায়নি। সরকার সাপোর্ট না দিলে তো আমরা মেলা করতে পারি না। আগামী বছর বিচার-বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত নেব।’
