logo

ছেলেকে দেওয়া বাবার ১০ উপদেশ বর্ণিত হয়েছে কোরআনে

ছেলেকে দেওয়া বাবার ১০ উপদেশ বর্ণিত হয়েছে কোরআনে
ছেলেকে দেওয়া বাবার ১০ উপদেশ বর্ণিত হয়েছে কোরআনে। ছবি: পিন্টারেস্ট

লোকমান হাকিম- এ নামেই পৃথিবীব্যাপী পরিচিত তিনি। তাঁর প্রজ্ঞাপূর্ণ কথা মানুষকে চুম্বকের মতো টানত। কোরআনে তাঁর নামে রয়েছে একটি পূর্ণ সুরা- সুরা লোকমান। এটি কোরআনের ৩১তম সুরা। ৩৪ আয়াত বিশিষ্ট সুরাটি মক্কায় অবতীর্ণ।

লোকমান ছিলেন আফ্রিকার নাওবা গোত্রের কৃষ্ণাঙ্গ, সুদান-মিসরীয় বংশোদ্ভূত। তার নাম লোকমান বিন আনকা বিন সাদুন। আরবে এসেছিলেন ক্রীতদাস হয়ে। জাবের (রা.) বলেন, তিনি ছিলেন খর্বাকৃতির, মোটা ঠোঁটের অধিকারী। পেশায় কাঠমিস্ত্রি হলেও তাঁর কথার জাদুতে দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ ছুটে আসত।

মুহাম্মদ বিন জারির আত-তাবারি (রহ.), ইমামদুদ্দিন বিন কাসির (রহ.) ও আবুল কাসেম আস-সুহাইলি (রহ.) প্রমুখ বিখ্যাত ইতিহাসবেত্তা বলেন, লোকমান হাকিম আফ্রিকার লোক। আরবে এসেছিলেন ক্রীতদাস হয়ে। তাঁর নাম লোকমান বিন আনকা বিন সাদুন।

সাইদ বিন মুসাইয়িব (রা.) বলেন, ‘লোকমান ছিলেন সুদান-মিসরীয় বংশোদ্ভূত কৃষ্ণাঙ্গ। ওষ্ঠাধর ছিল অত্যন্ত পুরু। প্রজ্ঞাবান ছিলেন, তবে নবী নন।’ (আহকামুল কোরআন, মুহাম্মদ বিন আবদুল্লাহ আল-আন্দালুসি, খণ্ড: ৬, পৃষ্ঠা: ২৮৬)

ইবনে আব্বাস (রা.), জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ (রা.) এবং সাইদ ইবনুল মুসাইয়িব (রা.)-এর বর্ণনা উদ্ধৃত করে সুফিয়ান সাওরি (রহ.) বলেন, ‘তিনি নবী নন; বরং আল্লাহর একজন সৎ বান্দা ছিলেন।’ অধিকাংশ আলেম বলেন, ‘লোকমান ছিলেন প্রজ্ঞাবান ও আল্লাহর ওলি। তিনি নবী ছিলেন না।’ (কাসাসুল কোরআন, খণ্ড: ৮, পৃষ্ঠা : ১৬)

একবার এক বিশাল সমাবেশে লোকমান হাকিম জ্ঞানগর্ভ কথা বলছিলেন। একজন প্রশ্ন করলেন, ‘আপনি কি সেই লোক, যিনি আমার সঙ্গে অমুক বনে ছাগল চরাতেন?’ লোকমান হাকিম হেসে বললেন, ‘হ্যাঁ, আমিই সে।’ লোকটি অবাক হয়ে জানতে চাইলেন, ‘তাহলে এত সম্মান কীভাবে পেলেন? সবাই আপনার কথা শুনতে ছুটে আসে!’ লোকমান বললেন, ‘দুটি কাজ- সব সময় সত্য বলা আর অপ্রয়োজনীয় কথা এড়িয়ে চলা।’ আরেক বর্ণনায় তিনি যোগ করেন, ‘দৃষ্টি সংযত রাখা, প্রয়োজনের বাইরে কথা না বলা, হালাল জীবিকায় তুষ্ট থাকা, লজ্জাস্থান সংরক্ষণ করা, সত্যে অটল থাকা, অঙ্গীকার পূর্ণ করা, মেহমানের আপ্যায়ন করা এবং প্রতিবেশীর প্রতি সদাচরণ। তুমিও এগুলো করলে এমন মর্যাদা পাবে।’ (তাফসিরে ইবনে কাসিরের বরাতে তাফসিরে মারেফুল কোরআন, মুফতি শফি মুহাম্মাদ শফি, অনুবাদ: মাওলানা মুহিউদ্দীন খান, পৃষ্ঠা: ১০৫৫)

দাউদ (আ.)-এর আগে লোকমান হাকিম মানুষকে আল্লাহর পথে ডাকতেন, প্রয়োজনীয় মাসয়ালা শেখাতেন। দাউদ (আ.) নবী হওয়ার পর তিনি এই কাজ বন্ধ করে দেন।

লোকমান হাকিম তাঁর ছেলেকে যে উপদেশ দিয়েছিলেন, তা আল্লাহর এত পছন্দ হয় যে, সেগুলো কোরআনে স্থান পায়। সুরা লোকমানে বর্ণিত ১০টি উপদেশ হলো-

  • আল্লাহর সঙ্গে শরিক না করা: ‘হে ছেলে, আল্লাহর সঙ্গে শরিক কোরো না। নিশ্চয়ই আল্লাহর সঙ্গে শরিক করা মহা অন্যায়।’ (সুরা লোকমান, আয়াত: ১৩)

  • মা-বাবার সঙ্গে ভালো আচরণ: ‘আর আমি মানুষকে তার মা-বাবার সঙ্গে সদ্ব্যবহারের জোর নির্দেশ দিয়েছি।’ (সুরা লোকমান, আয়াত: ১৪)

  • অন্যায় থেকে বিরত থাকা: ‘হে ছেলে, কোনো বস্তু যদি সরিষার দানা পরিমাণও হয়, আল্লাহ তাও উপস্থিত করবেন।’ (সুরা লোকমান, আয়াত: ১৬)

  • নামাজ আদায়: ‘হে ছেলে, নামাজ কায়েম করো।’ (সুরা লোকমান, আয়াত: ১৭)

  • সৎ কাজের আদেশ, মন্দ কাজের নিষেধ: ‘সৎ কাজে আদেশ দাও, মন্দ কাজে নিষেধ করো।’ (সুরা লোকমান, আয়াত: ১৭)

  • বিপদে ধৈর্য: ‘বিপদ-আপদে ধৈর্য ধরো। নিশ্চয়ই এটা সাহসিকতার কাজ।’ (সুরা লোকমান, আয়াত: ১৭)

  • মানুষকে অবজ্ঞা না করা: ‘অহংকারবশে তুমি মানুষকে অবজ্ঞা কোরো না।’ (সুরা লোকমান, আয়াত: ১৮)

  • অহংকার না করা: ‘পৃথিবীতে গর্বভরে পদচারণ কোরো না।’ (সুরা লোকমান, আয়াত: ১৮)

  • বিনয়ী হওয়া: ‘পদচারণে মধ্যবর্তিতা অবলম্বন করো।’ (সুরা লোকমান, আয়াত: ১৮)

  • নিচু কণ্ঠে কথা বলা: ‘কণ্ঠ নিচু করো। নিঃসন্দেহে গাধার স্বরই সর্বাপেক্ষা অপ্রীতিকর।’ (সুরা লোকমান, আয়াত: ১৮)

লোকমান হাকিমের এই উপদেশগুলো শুধু তাঁর ছেলের জন্য নয়, সব মানুষের জন্য পথপ্রদর্শক। তাঁর জীবন আমাদের শেখায়- সত্য আর সংযমই মানুষকে মর্যাদার শিখরে নিয়ে যায়।