ইতেকাফ কী, কেন, কীভাবে করবেন

রমজানের শেষ দশ দিন কিংবা অন্য কোনো সময় আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের মানসিকতা নিয়ে পুরুষরা মসজিদে এবং নারীরা নিজ ঘরে বিশেষ পদ্ধতিতে ইবাদত করাই হলো ইতেকাফ। ইসলামি শরিয়তে রমজান মাসের শেষ দশ দিন ইতেকাফ করা সুন্নত। রমজান ছাড়া অন্য সময় ইতেকাফ করা মুস্তাহাব বা নফল।
ইতেকাফ কী
ইতেকাফ আরবি শব্দ। অর্থ অবস্থান করা, স্থির থাকা, কোনো স্থানে আটকে পড়া বা আবদ্ধ হয়ে থাকা। রমজানের শেষ দশক বা অন্য কোনো সময় জাগতিক কাজকর্ম ও পরিবার-পরিজন থেকে কিছুটা বিচ্ছিন্ন হয়ে আল্লাহকে খুশি করার নিয়তে পুরুষের জন্য মসজিদে এবং নারীর জন্য ঘরে ইবাদত করার উদ্দেশ্যে অবস্থান করা ও স্থির থাকা হলো ইতেকাফ।
রমজানের শেষ দশকে ইতেকাফের জন্য ২০ তারিখের সূর্যাস্তের পর ২১ তারিখের রাতের শুরুতে ইতেকাফগৃহে প্রবেশ করতে হবে। ঈদের চাঁদ দেখার পর ইতেকাফ থেকে বেরোতে হবে। মধ্যবর্তী এ সময়টি শেষ ১০ দিন, যাতে ইতেকাফের বিধান দেওয়া হয়েছে।
ইতেকাফের গুরুত্ব
আত্মার পরিশুদ্ধি অর্জন এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উত্তম পন্থা ইতেকাফ। মানবিক সব চিন্তা-ভাবনার ঊর্ধ্বে অবস্থান করে একজন মানুষ ইতেকাফে একান্তে আল্লাহর ধ্যানে বসার সুযোগ লাভ করেন। এ একান্ত যাপন প্রক্রিয়ার প্রভাব সীমাহীন। ইতেকাফ একজন মানুষের ওপর এমনভাবে নৈতিক ও আধ্যাত্মিক প্রভাব বিস্তার করে, যা তাকে দীর্ঘদিন আল্লাহর পথে পরহেজগারির সঙ্গে পরিচালিত হতে সহযোগিতা করে। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা মসজিদে ইতেকাফকালে স্ত্রীদের সঙ্গে মেলামেশা করো না।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৮৭)
হজরত মুহাম্মদ (সা.) ইতেকাফকে খুব গুরুত্ব দিতেন। আয়েশা (রা.) বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) প্রতি রমজানের শেষ দশক (মসজিদে) ইতেকাফ করতেন। এ আমল তাঁর মৃত্যু পর্যন্ত অব্যাহত ছিল।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২০২৫)
ইতেকাফের ফজিলত
রমজানের শেষ দশ দিন ইতেকাফ করলে দুটি হজ ও দুটি ওমরার সওয়াব পাওয়া যায়। রাসুলুল্লাহস (সা.) বলেছেন, ‘যে রমজানের শেষ দশ দিন ইতেকাফ করবে, সে দুটি হজ ও দুটি ওমরার সমপরিমাণ সওয়াব পাবে।’ (শুআবুল ইমান, বাইহাকি, বর্ণনা: ৩৯৬৬)
ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে ইতেকাফ করবে, আল্লাহ তাআলা তার এবং জাহান্নামের আগুনের মধ্যে তিনটি পরিখার দূরত্ব সৃষ্টি করবেন। প্রত্যেক পরিখার প্রশস্ততা দুই দিগন্তের চেয়েও বেশি।’(শুআবুল ইমান, বাইহাকি, বর্ণনা: ৩৬৭৯)
যেসব কারণে ইতেকাফ করবেন
১. ইসলামের বিধান পালনের মাধ্যমে আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় করা।
২. পাশবিক প্রবণতা ও অহেতুক কাজ থেকে দূরে থাকার চর্চা।
৩. শবে কদরের প্রতীক্ষা।
৪. মসজিদে অবস্থানের অভ্যাস গড়ে তোলা।
৫. দুনিয়ামুখী মানসিকতা ত্যাগ ও বিলাসিতা থেকে দূরে থাকা।
ইতেকাফের প্রকারভেদ
ইতেকাফ করার মানত করলে তা আদায় করা ওয়াজিব। রমজানের শেষ দশ দিনে ইতেকাফ করা সুন্নতে মুয়াক্কাদা (এলাকার সবার পক্ষে অন্তত একজন আদায় করতে হবে। একজনও আদায় না করলে পুরো এলাকাবাসীর গুনাহ হবে)। রমজানের শেষ দশ দিন ছাড়া অন্য সময়ের ইতেকাফ হলো মুস্তাহাব বা নফল।
ইতেকাফে কী করা যাবে, কী করা যাবে না
- ইতেকাফের জন্য নিয়ত করা আবশ্যক। নিয়ত ছাড়া ইতেকাফ বিশুদ্ধ হবে না।
- পুরুষদের জন্য জামে মসজিদে ইতেকাফ করতে হবে। নারীরা নিজ ঘরে নামাজের জায়গায় বা অন্য পবিত্র জায়গায় ইতেকাফ করবে।
- ইতেকাফকারী মুসলিম, অপবিত্রতা এবং হায়েজ ও নেফাস থেকে পবিত্র হতে হবে। অপ্রাপ্তবয়স্করাও ইতেকাফ করতে পারবে।
- নারীর জন্য স্বামীর অনুমতি নিয়ে ইতেকাফ করা জায়েজ। নারীর জন্য মসজিদে ইতেকাফ করা নাজায়েজ।
- প্রয়োজন ছাড়া দিনে বা রাতে সামান্য সময়ের জন্য মসজিদ থেকে বের হলেও ইতেকাফ নষ্ট হয়ে যায়। নারীরা তার ঘরের নির্ধারিত স্থান থেকে বের হবে না। প্রস্রাব-পায়খানা ও জুমা আদায় ইত্যাদি প্রয়োজনের কারণে মসজিদ থেকে বের হওয়া জায়েজ।
- ইতেকাফের স্থানে ঘুমাতে হবে এবং পানাহার করতে হবে।
- ইতেকাফকারী ব্যক্তি মুয়াজ্জিন হোক বা অন্য কেউ হোক, আজানের জন্য মিনারে আরোহণ করলে ইতেকাফ নষ্ট হবে না।
- সহবাস বা সহবাসের দিকে আকৃষ্টকারী কাজ করা হলে ইতেকাফ নষ্ট হয়ে যাবে।
- স্বপ্নদোষে ইতেকাফ নষ্ট হয় না।
- কয়েকদিন পাগল বা বেহুঁশ থাকার ফলে লাগাতার ইতেকাফ করতে না পারলেও ইতেকাফ নষ্ট হয়ে যায়।
- একেবারে চুপ থাকাকে ইবাদত মনে করে সারাক্ষণ চুপ থাকলে ইতেকাফ মাকরুহ হয়।