বিশ্বাসীদের ৫ গুণ ও হারুত-মারুতের কাহিনি

দেশের আকাশে পবিত্র রমজান মাসের চাঁদ দেখা গেছে আজ বুধবার। বৃহস্পতিবার (১৯ ফেব্রুয়ারি) রোজা শুরু। আজ প্রথম তারাবি। অনেক মসজিদে তারাবির নামাজে পবিত্র কোরআন পুরোটা পড়া হয়। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের পদ্ধতি অনুসরণ করলে খতমে তারাবি শেষ হবে ২৬ রমজান। সে হিসেবে আজ কোরআনুল কারিমের প্রথম দেড় পারা তেলাওয়াত করা হবে। সুরা ফাতিহা ও সুরা বাকারার ১ থেকে ২০৩ নম্বর আয়াত পড়া পর্যন্ত। ইসলামের বহু গুরুত্বপূর্ণ বিধানের আলোচনা রয়েছে এই অংশে। কোরআনের বৈশিষ্ট্য, বিশ্বাসী-অবিশ্বাসী এবং মুনাফিকদের পরিচয়, ইবরাহিম (আ.)-এর কোরবানি, কাবাঘর নির্মাণ, মহানবী (সা.)-এর যুগে কিবলা পরিবর্তনের কারণ ও যৌক্তিকতা, পৃথিবীতে মানুষের আগমন, ফেরেশতাদের সিজদা, ইবলিশের সিজদায় অস্বীকৃতি ও অহংকার, হালাল-হারামের নীতিমালা, অবৈধ পন্থায় সম্পদ উপার্জন, হত্যার অপরাধে হত্যা ও ক্ষমার বিধান, রমজানের রোজা, হজ, খুন, চান্দ্র তারিখ ব্যবহারের প্রতি উৎসাহ, গাভি নিয়ে বনি ইসরাইলের বাড়াবাড়ি, হারুত-মারুতের কাহিনিসহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের আলোচনা হয়েছে।
সুরা ফাতিহা কোরআনের নির্যাস
সুরা ফাতিহা কোরআনের প্রথম সুরা। ফাতিহা মানে প্রারম্ভিকা। এ সুরার মাধ্যমে কোরআনের শুরু হয়েছে, তাই এর নাম রাখা হয়েছে ফাতিহা। এ সুরাকে ‘ফাতিহাতুল কিতাব বা কোরআনের মুখবন্ধ, ‘কোরআনের গুপ্তভান্ডার’, ‘কোরআনে মা’ ও ‘কোরআনের সার’ বলা হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘এটাই উম্মুল কোরআন, এটাই সাবআ মাসানি এবং এটাই কোরআনুল আজিম।’ নবীজি (সা.)-এর ওপর নাজিলকৃত প্রথম পূর্ণাঙ্গ সুরা এটি। মোট দুবার এই সুরা নাজিল হয়েছে; একবার মক্কায় ও আরেকবার মদিনায়। নামাজে এ সুরা পড়া আবশ্যক। (জামে তিরমিজি, হাদিস : ১৮৭৫)। সাত আয়াতের ছোট্ট এ সুরায় ফুটে উঠেছে কোরআনের সারসংক্ষেপ। এ সুরায় সমগ্র কোরআনের সার নির্যাস সংক্ষিপ্তাকারে বলে দেওয়া হয়েছে। কোরআনের অন্য সুরাগুলো প্রকারান্তরে সুরা ফাতিহারই বিস্তৃত ব্যাখ্যা।
কোনো কোনো কোরআনের ব্যাখ্যাবিদ বলেছেন, সুরা ফাতিহায় দশটি বিষয়ের উল্লেখ রয়েছে। পাঁচটি বিষয় আল্লাহ সম্পর্কিত আর পাঁচটি বিষয় বান্দা সম্পর্কিত। আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্কিত পাঁচটি বিষয় হলো—এক. তিনি একমাত্র উপাসক, দুই. জগতসমূহের পালনকর্তা, তিন. জগতবাসীর প্রতি সীমাহীন মেহেরবান, চার. মুমিনদের প্রতি অসীম দয়াময় ও পাঁচ. কর্মফল দিবসের অধিপতি। বান্দার সঙ্গে সম্পর্কিত পাঁচটি বিষয় হলো—এক. ইবাদত, দুই. সাহায্য প্রার্থনা, তিন. হেদায়াত প্রার্থনা, চার. ইসতিকামাত প্রার্থনা ও পাঁচ. নেয়ামত প্রার্থনা। (তাফসিরে কাবির, ১/১৫১)
গাভির নামে কোরআনের দীর্ঘতম সুরা
সুরা বাকারার আয়াত সংখ্যা ২৮৬টি। এটি মদিনায় অবতীর্ণ। কোরআনের দীর্ঘতম সুরা এটি। বাকারা অর্থ গাভি। এ সুরায় একাধিক স্থানে বাকারা শব্দ এসেছে এবং গাভি জবাইয়ের ঘটনা রয়েছে, এ জন্য এর নাম রাখা হয়েছে সুরা বাকারা। ইসলামের মৌলিক নীতি, বিশ্বাস ও শরিয়তের বিধিবিধানের যতটুকু বিস্তারিত বর্ণনা এই সুরায় করা হয়েছে, ততটুকু অন্য কোনো সুরায় করা হয়নি। এটি কোরআনের শিখর বা চূড়া।
এ সুরায় এক হাজার আদেশ, এক হাজার নিষেধ, এক হাজার হেকমত এবং এক হাজার সংবাদ ও কাহিনি রয়েছে। (তাফসিরে মারেফুল কোরআন, পৃষ্ঠা : ১১)
কোরআনের বিচ্ছিন্ন অক্ষরমালা
সুরা বাকারার প্রথম অক্ষরগুলো ‘আলিফ, লাম, মিম’। এগুলোকে হুরুফে মুকাত্তায়াত (রহস্যময় অক্ষরমালা) বলা হয়। কোরআনের আরও কয়েকটি সুরার শুরুতে এ রকম হরফ রয়েছে। অধিকাংশ সাহাবি, তাবেয়ি এবং আলেমদের মধ্যে সর্বাধিক প্রচলিত মত হলো, হুরুফে মুকাত্তায়াতগুলো রহস্যপূর্ণ, যার মর্ম ও মাহাত্ম্য একমাত্র আল্লাহ তাআলা জানেন। অন্য কাউকে এ বিষয়ে জ্ঞান দেওয়া হয়নি। (তাফসিরে ইবনে কাসির, ১/১৭৮-১৭৯)
মুত্তাকির পাঁচ গুণ
মুত্তাকি মানে আল্লাহভীরু। যাদের অন্তরে আল্লাহর ভয় আছে এবং যারা আল্লাহর ভয়ের কারণে গুনাহ থেকে বেঁচে থাকে তারা মুত্তাকি। এ সুরার ৩ ও ৪ নম্বর আয়াতে মুত্তাকিদের পাঁচটি গুণের কথা বলা আছে।
ক. ওই সমস্ত বাস্তব সত্য বিষয়ের ওপর ইমান আনা, যেগুলো ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য নয়। যেমন জান্নাত, জাহান্নাম, হাশর ইত্যাদি।
খ. নামাজ কায়েম করা।
গ. জাকাত দেওয়া।
ঘ. ওই সমস্ত আসমানি কিতাবের ওপর বিশ্বাস রাখা, যেগুলো যুগে যুগে বিভিন্ন নবী-রাসুলের ওপর অবতীর্ণ হয়েছে।
ঙ. পরকাল বিশ্বাস করা।
মুনাফিকের ১২ চিহ্ন
মুনাফিক বা কপটের ১২টি চিহ্ন বা আলামতের বিবরণ রয়েছে এ সুরার ৮ থেকে ২০ নম্বর আয়াতে। যেমন:
১. মিথ্যা বলা।
২. ধোঁকা দেওয়া।
৩. অন্তরে কপটতা ও বক্রতা থাকা।
৪. সমাজে অশান্তি সৃষ্টি করে নিজেকে শান্তিকামী দাবি করা।
৫. নির্বুদ্ধিতা।
৬. আল্লাহ-প্রদত্ত বিধিবিধান নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করা।
৭. ফিতনা-ফ্যাসাদ সৃষ্টি করা।
৮. বিশ্বাসীদের বন্ধু দাবি করলেও অবিশ্বাসীদের সঙ্গে গোপন আঁতাত করা।
৯. মূর্খতা।
১০. গোমরাহি ও ভ্রষ্টতা।
১১. হেদায়তের মর্ম বুঝতে না পারা।
১২. ইমানদারদের নিয়ে উপহাস করা।
বনি ইসরাইলের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ
আল্লাহ তাআলা কোরআনের বিভিন্ন জায়গায় নানা প্রসঙ্গে বনি ইসরাইলের আলোচনা করেছেন। এ সুরার ৪০-১০৩ নম্বর আয়াতে বনি ইসরায়েলের প্রতি পরিপূর্ণ ইমান আনার নির্দেশনা, তাদের ওপর আল্লাহ কী কী অনুগ্রহ করেছেন, আল্লাহ বিশেষ নেয়ামত পেয়েও তারা কী কী নাফরমানি করেছে, তাদের কাছে সবচেয়ে বেশি নবী-রাসুল প্রেরণ, খাবার হিসেবে মান্না ও সালওয়া, ছায়া হিসেবে শীতল মেঘমালা প্রদান এবং পানির প্রয়োজন মেটাতে পাথরের বুক চিরে ১২টি নদীর প্রকাশ, ফেরাউনের অত্যাচার থেকে নিষ্কৃতি দান, ফেরাউনকে তার বাহিনীসমেত সমুদ্রে নিমজ্জিত, তাদের গো-পূজায় লিপ্ত হওয়া এবং সম্পদের লোভে একজন আরেকজনকে হত্যা ইত্যাদি অপকর্মের কথা আলোচিত হয়েছে। যে ঘটনার কারণে সুরা বাকারাকে বাকারা নামকরণ করা হয়েছে, সেটিও এখানে আলোচনা করা হয়েছে।
খুনের রহস্য উন্মোচন
বনি ইসরায়েলের এক ধনী লোক, তার সন্তান ছিল না। তার উত্তরাধিকারী ছিল এক ভ্রাতুষ্পুত্র। সম্পত্তির লোভে সে চাচাকে হত্যা করে বসে। রাতে গ্রামের এক লোকের দরজায় মরদেহ রেখে আসে এবং সকালে ওই লোকের ওপর হত্যার অপবাদ দেয়। দুই দলের মধ্যে বিবাদ বেঁধে যায়। মুসা (আ.)-এর কাছে বিচার আসে। আল্লাহর নির্দেশে মুসা (আ.) তাদের একটি গাভি জবাই করে হত্যার রহস্য উদ্ঘাটনের আদেশ দেন। তারা ব্যাপারটাকে ঠাট্টা মনে করল। মুসা (আ.) তাদের সতর্ক করলেন। তারা নবীর কথা মেনে নিল। গাভির রং কেমন হবে জানতে চাইল। অথচ আল্লাহর প্রথম নির্দেশে গরুর কোনো নির্দিষ্ট রঙের কথা উল্লেখ ছিল না। তাদের বাড়াবাড়িতে মুসা (আ.) আল্লাহর নির্দেশে রঙের কথা বলে দিলেন। তারপর তারা গরুর ব্যাপারে আরও বিস্তারিত জানতে চাইল। মুসা (আ.) তা-ও বলে দিলেন। শুরুতে তারা যে কোনো একটি গরু জবাই করলেই হয়ে যেত। তারা প্রশ্ন করে বিষয়টি জটিল করে তুলেছে। (সুরা বাকারা, আয়াত : ৬৭)
তারা আল্লাহ বিশ্বাসী ও মা ভক্ত এক যুবকের কাছে বর্ণনাকৃত গাভিটি পেল। যুবকের চাহিদা মতো গরুর চামড়াপূর্ণ স্বর্ণের দামে তারা কিনল। তারা গাভিটি জবাই করল। আল্লাহর নির্দেশ মতো মাংসের একটি অংশ খুন হওয়া মানুষটির দেহে স্পর্শ করলে মৃত মানুষটি জীবিত হয়ে যে মানুষটি বিচার নিয়ে গিয়েছিল, তার নাম বলে দেয়। (সুরা বাকারা, আয়াত : ৭২)
হারুত-মারুতের কাহিনি
সোলায়মান (আ.)-এর সময়ে দুই ফেরেশতা বাবেল শহরে অবতীর্ণ হয়েছিলেন। তাদের নাম হারুত-মারুত। হারুত-মারুত কিছু লোককে জাদু শিখিয়েছিলেন। শেখানোর শর্ত ছিল, সেই জাদু কারও ওপর প্রয়োগ করা যাবে না। জাদুবিদ্যা যে আসলে মন্দ, জাদু ও মুজিজার মধ্যে যে পার্থক্য আছে, সবাইকে এটা শেখানোর জন্যই তাঁরা এসেছিলেন। কিন্তু তারা ফেরেশতাদের কথা রাখল না। জাদুর চর্চা করে ভয়ংকর কুফরিতে লিপ্ত হলো। আল্লাহ বলেন, ‘সুলায়মানের রাজত্বকালে শয়তানরা যা পাঠ করত, তারা তা অনুসরণ করত। মূলত সুলায়মান কুফরি করেনি; বরং শয়তানরাই কুফরি করেছিল, তারা মানুষকে জাদু শিক্ষা দিত এবং যা বাবেলের দুজন ফেরেশতা হারুত ও মারুতের ওপর পৌঁছানো হয়েছিল এবং ফেরেশতাদ্বয় কাউকেও (তা) শিখাত না যে পর্যন্ত না বলত, আমরা পরীক্ষাস্বরূপ, কাজেই তুমি কুফরি করো না। এতদসত্ত্বেও তারা উভয়ের কাছ থেকে এমন জিনিস শিক্ষা করতো, যা দিয়ে তারা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ সৃষ্টি করতো...।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ১০২)
ইবরাহিম (আ.)-এর আলোচনা
এ সুরার ১২৪ থেকে ১৪১ নম্বর আয়াতে ইবরাহিম (আ.)-এর মর্যাদা ও ব্যক্তিত্ব, তাকে নানা রকমের পরীক্ষায় ফেলানো, সব পরীক্ষায় সর্বোত্তমভাবে কৃতকার্য হওয়া, পিতার মূর্তিপূজা থেকে তার সম্পর্কহীনতা, সম্প্রদায়ের অত্যাচার, নমরুদের সঙ্গে বিতর্ক, অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপের ঘটনা, নিজ ভূমি থেকে হিজরত, স্ত্রী ও নবজাতক ছেলেকে খাদ্য ও পানিশূন্য বিরান এলাকায় রেখে আসার নির্দেশনা, নিজের আদরের একমাত্র পুত্র-সন্তানকে নিজ হাতে জবাই করার হুকুম এবং তার হাত ধরে কাবাঘর নির্মাণের বিবরণ রয়েছে।
কিছু সৎকাজ ও সত্যাশ্রয়ী যারা
এ সুরার ১৭৭ নম্বর আয়াতে কয়েকটি সৎকাজ ও সত্যাশ্রয়ী পরহেজগার মানুষের বৈশিষ্ট্যের বিবরণ রয়েছে। সৎকাজ হলো আল্লাহ, কিয়ামত দিবস, ফেরেশতা ও সমস্ত নবী-রাসুলদের প্রতি ইমান আনা, আত্মীয়স্বজন, এতিম-মিসকিন, মুসাফির-ভিক্ষুক ও মুক্তিকামী ক্রীতদাসের জন্য সম্পদ ব্যয় করা। সত্যাশ্রয়ী পরহেজগার ব্যক্তি হলেন, নামাজ প্রতিষ্ঠাকারী, জাকাত আদায়কারী, ওয়াদা পালনকারী এবং অভাবে, রোগে-শোকে ও যুদ্ধের সময় ধৈর্যশীল।
অবৈধ পন্থায় সম্পদ অর্জন হারাম
এ সুরার ১৮৮ নম্বর আয়াতে অন্যায়ভাবে অন্যের সম্পদ ভোগ করতে নিষেধ করা হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ তাআলা পবিত্রতা ছাড়া কোনো নামাজ কবুল করেন না এবং অবৈধভাবে অর্জিত সম্পদ সদকা গ্রহণ করেন না।’ (সুনানে নাসায়ি, হাদিস : ১৩৯)