অনুমতি ছাড়া অন্যের ঘরে প্রবেশ, ইসলাম কী বলে

ঘর আল্লাহর পক্ষ থেকে মানুষের জন্য বিশেষ নেয়ামত। মানুষের শান্তির আলয়। নিরাপদে থাকার জায়গা। ঘর না থাকলে মানুষের আর ফেরার জায়গা থাকে না। এই ঘরেই মানুষ তার একান্ত জীবনটি যাপন করেন। এই যাপন নির্বিঘ্ন ও নিরুপদ্রব করতে ইসলাম কিছু দিকনির্দেশনা দিয়েছে।
ঘরে প্রবেশের আগে ঘরের মালিককে জানাতে হবে। ঘরের মালিকের অনুমতি নিতে হবে। নিজের ঘরের ক্ষেত্রে স্ত্রী ভেতরে থাকলে তার অনুমতি নিতে হবে। মা-বাবার ঘরে প্রবেশেও অনুমতি লাগবে। মেস কিংবা হোস্টেলেও রুমে প্রবেশের আগে যে ভেতরে আছে, তাকে আগে জানান দিতে হবে। কারও ঘরে বিনা অনুমতিতে প্রবেশ করলে বিব্রতকর ও বিরক্তিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে হতে পারে।
ঘরে ব্যক্তি নিজের মতো করে আরাম-আয়েশে অবস্থান করেন। এটা একান্তই ব্যক্তিগত অবস্থা। ঘরে হয়তো পরনের কাপড় থাকে এলোমেলো। কখনও সে অপ্রস্তুত হয়ে কাপড় ছাড়তে যায়, কখনও সে নীরবে কোনো কিছু নিয়ে চিন্তায় মগ্ন থাকেন। ব্যক্তিগত সময় এক্সপ্লেইন করেন, সেসময় অনুমতিবিহীন কারও প্রবেশ বা হুট করে ঢুকে যাওয়া বিড়ম্বনা ও বিব্রতকর পরিস্থিতির তৈরি করেত পারে। হঠাৎ প্রবেশে পর্দানশিন নারী-পুরুষের অনেক সমস্যা হয়।
মোটকথা, ঘরে প্রবেশের ক্ষেত্রে অবশ্যই অনুমতি নিতে হবে। অনুমতি ছাড়া ঘরে প্রবেশ অপরাধ। আল্লাহতাআলা ঘরে প্রবেশে অনুমতি নেওয়া আবশ্যক করেছেন। পবিত্র কোরআনে এরশাদ হয়েছে, ‘হে ইমানদাররা, তোমরা নিজেদের ঘর ছাড়া অন্যের ঘরে প্রবেশ করো না, অনুমতি প্রার্থনা এবং ঘরের অধিবাসীদের সালাম দেওয়া ছাড়া। এটাই তোমাদের জন্য কল্যাণকর যাতে তোমরা উপদেশ লাভ করো।’ (সুরা নুর, আয়াত: ২৭)
উল্লিখিত আয়াত থেকে বোঝা যায়, কারও ঘরে প্রবেশের সময় দুটি কাজ করতে হবে। এক. ঘরে প্রবেশে অনুমতি নিতে হবে। দুই. গৃহবাসীকে সালাম দিতে হবে। কোরআনের এই শিক্ষা হজরত মুহাম্মদ (সা.) সাহাবিদের হাতে-কলমে শিখিয়েছেন। সাহাবি কালাদা ইবনে হাম্বল (রা.) সাফওয়ান ইবনে উমাইয়া (রা.)-এর দেওয়া দুধ, হরিণের বাচ্চা ও দুগবুস (এক প্রকার শসা) নিয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে আসেন। অনুমতি না নিয়ে ও সালাম না দিয়ে তিনি তাঁর কাছে চলে আসেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, ‘তুমি বেরিয়ে সালাম দাও; তারপর বলো, আমি কি প্রবেশ করব?’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৭১০)
আহ, কত সুন্দরের ধর্ম ইসলাম! ইসলাম ঘরে প্রবেশের অনুমতির বিধান নিশ্চিত করেছে শুধু মানুষের সম্মানের নিরাপত্তার জন্য। তাদের গোপনীয়তা রক্ষার জন্য।
তিন সময়ে বিশেষ অনুমতি
অনুমতি ছাড়া কারও ঘরে প্রবেশ করা যাবে না—এটা ইসলামের অকাট্য বিধান। কিন্তু মাহরাম (যাদের সঙ্গে বিয়ে হারাম) ও শিশু—যারা সবসময় ঘরে বিচরণ করে, যেমন—এক ছাদের নিচে মা-বাবা, ভাইবোন, সন্তান, দাদা-দাদি ও শিশুরা থাকে। তারাও কি ঘরে প্রবেশে অনুমতি নেবে? ইসলামের বিধান হলো, প্রাপ্তবয়স্ক মাহরামরা ঘরে প্রবেশে সবসময় অনুমতি নেবে। মা-বাবা, ভাইবোন ও সন্তান, সবার ক্ষেত্রে এ বিধান প্রযোজ্য।
কিশোররা ঘরে প্রবেশের ক্ষেত্রে তিন সময়ে অনুমতি নেবে—
- ফজর নামাজের আগে।
- দুপুরে ঘুমানোর সময়।
- এশার নামাজের পর।
এ সময়গুলোতে স্বামী-স্ত্রীর নির্জনে সময় কাটানোর সম্ভাবনা বেশি থাকে। মানুষ তখন নিজের মতো করে ঘুমোতে যায়। ঘুমানোর আয়োজনে থাকে নিজের মতো করে আরাম-আয়েশের পোশাক। কিশোরদেরও এ সময়গুলোতে অনুমতি নেওয়ার শিক্ষা দিতে হবে। আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনরা, তোমাদের ডানহাত যার মালিক হয়েছে এবং তোমাদের মধ্যে যারা প্রাপ্তবয়স্ক হয়নি, তারা যেন অবশ্যই তিন সময়ে অনুমতি গ্রহণ করে। ফজরের নামাজের আগে, দুপুরে যখন তোমরা তোমাদের পোশাক খুলে রাখ এবং ইশার নামাজের পর; এই তিনটি তোমাদের (গোপনীয়তার) সময়। এই তিন সময়ের পর তোমাদের এবং তাদের কোনো দোষ নেই। তোমাদের একে অন্যের কাছে যাতায়াত করতেই হয়। এভাবে আল্লাহ তোমাদের উদ্দেশ্যে তাঁর আয়াতসমূহ বর্ণনা করেন। আল্লাহ মহাজ্ঞানী, প্রজ্ঞাময়।’ (সুরা নুর, আয়াত: ৫৮)
তিনবার অনুমতি
ঘরে প্রবেশের সময় তিনবার অনুমতি নিতে হবে। প্রথমবার অনুমতি চেয়ে ভেতরে প্রবেশ করবে না বা চলেও আসবে না। তিনবার বলে অপেক্ষা করবে। অনুমতি না পেলে চলে আসবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘ঘরে প্রবেশের ক্ষেত্রে অনুমতি তিনবার চাইবে। অনুমতি দিলে প্রবেশ করবে, অন্যথায় ফিরে যাবে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬২৪৫)
আবু সাইদ (রা.) বলেন, ‘আবু মুসা (রা.) উমর (রা.)-এর কাছে অনুমতি চেয়ে বলেন—আসসালামু আলাইকুম, আমি কি আসতে পারি? উমর (রা.) বলেন, এক। আবু মুসা (রা.) কিছুক্ষণ চুপ থেকে সালাম দিয়ে বলেন, আমি কি ভেতরে আসতে পারি? উমর (রা.) বলেন, দুই। এরপর আবু মুসা (রা.) অল্প সময় নীরবতা অবলম্বন করে বলেন—আসসালামু আলাইকুম। আমি কি আসতে পারি? উমর (রা.) বলেন, তিন। এবার তিনি চলে যেতে লাগলেন...।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৬৯০)
ঘরে উঁকি দেওয়া
ঘরের বাইরে থেকে অনুমতি প্রার্থনা করবে। তিনবার অনুমতি চাওয়ার পরও ভেতর থেকে সাড়া না পেলে চলে যেতে হবে। কারণ, ঘরের মালিক হয়তো ভেতরে নেই বা ভেতরে থাকলেও কোনো কাজে ব্যস্ত; ফলে অনুমতি দিতে চাচ্ছে না। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা যদি তাতে কাউকে না পাও, তবু যতক্ষণ না তোমাদের অনুমতি দেওয়া হয়, তাতে প্রবেশ করো না। তোমাদের যদি বলা হয়, ফিরে যাও, তবে ফিরে যাও। এটাই তোমাদের জন্য উৎকৃষ্ট পন্থা। তোমরা যা কিছু করো, আল্লাহ সে সম্পর্কে পরিপূর্ণ জ্ঞাত।’ (সুরা নুর, আয়াত: ২৮)
সাড়া-শব্দ না পেয়ে ঘরের ভেতরে তাকানো যাবে না। উঁকি দিয়ে দেখা যাবে না ভেতরে কেউ আছে কি না। ঘরের ভেতর উঁকি দিয়ে দেখতে রাসুলুল্লাহ (সা.) কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন। অনুমতিবিহীন উঁকি দেওয়ার কারণে চোখ ফুঁড়ে দেওয়ার অনুমতি রয়েছে ইসলামে। এতে কোনো ধরনের ক্ষতিপূরণ ধার্য হবে না। আবু হুরায়রা (রা.) রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনেছেন, ‘কেউ কোনো গোত্রের ঘরে তাদের অনুমতি ছাড়া উঁকি দিলে তারা যদি তার চোখ ফুঁড়ে দেয়, এর কোনো ক্ষতিপূরণ নেই।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৫১৭২)
এই হাদিস থেকে বুঝা যায়, মানুষের ব্যক্তিগত গাড়ি, বসার জায়গা, বারান্দা—এসবের দিকে উঁকি দেওয়া যাবে না। অন্যের এসএমএস, ফেসবুক, ইমু, হোয়াটসঅ্যাপ ও টুইটারের ম্যাসেজ লুকিয়ে দেখাও অপরাধ। কারও নামে আসা কোনো পার্শ্বেল, চিঠি বা ডকুমেন্ট পেপার বিনা অনুমতিতে খোলা নিষেধ। কেউ ইলেক্ট্রনিক ডিভাইসের পাসওয়ার্ড ইন করার সময় নিজ দায়িত্ব চোখ অন্যদিকে সরিয়ে নিতে হবে।
বর্তমানে অনেক বাসায় কলিংবেল থাকে, সেক্ষেত্রে অনুমতির জন্য কলিংবেল চাপ দেওয়া যেতে পারে। একবার, দুইবার থেকে তিনবার চাপ দেবে। এর মধ্যে অনুমতি এলে ঘরে প্রবেশ করবে, অন্যথায় চলে আসতে হবে। মুহূর্মুহূ কলিংবেল বাজানো যাবে না।
ঘরে প্রবেশে অনুমতি চেয়ে নাম বলা
পরিচয় দেওয়ার সময় স্পষ্টভাবে নাম বলতে হবে। অস্পষ্ট পরিচয় দেওয়া রাসুলুল্লাহ (সা.) অপছন্দ করতেন। জাবের (রা.) থেকে বর্ণিত, ‘তিনি একবার বাবার রেখে যাওয়া ঋণ সম্পর্কে আলোচনার জন্য মহানবী (সা.)-এর কাছে যান। আমি (জাবের) দরজা খটখট করলে তিনি বললেন, কে? আমি বললাম, আমি। তিনি বলেন, আমি! আমি! তখন আমার মনে হলো, তিনি এমন বলা অপছন্দ করেছেন ‘ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৫১৮৭)
.png)


