রোজা নিয়ে প্রচলিত ৯ ভুল ধারণা

রমজান মাসে আমল-ইবাদতের প্রতি মুমিন-মুসলমানদের আগ্রহ তুলনামূলক বেশি থাকে। আমল করতে গিয়ে অনেকে নানাবিধ ভুল করে ফেলেন। এদিকে রমজান ও রোজা নিয়ে সমাজে আমল-ইবাদতগত নানা শুদ্ধ প্রথা ও রীতি-রেওয়াজ প্রচলিত আছে। পাশাপাশি কিছু ভুল প্রচলনও রয়েছে। এখানে রমজান ও রোজা নিয়ে মুসলিম সমাজে প্রচলিত কিছু ভুল ও এর সঠিক সমাধান তুলে ধরা হলো—
রোজার নিয়ত মুখে উচ্চারণ করা জরুরি
অনেকেই মনে করেন, রোজার নিয়ত মুখে উচ্চারণ করতে হয়। সমাজে যে আরবি নিয়ত প্রচলিত আছে, তা বলতে হয়, অন্যথায় কমপক্ষে মুখে এতটুকু বলতে হয়, ‘আমি আগামীকাল রোজা রাখার নিয়ত করছি’। অন্যথায় রোজা সহিহ হবে না—এ ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। রোজার জন্য মৌখিক নিয়ত জরুরি নয়; বরং অন্তরে রোজার সংকল্প করাই যথেষ্ট। (ফাতাওয়া হিন্দিয়াদ, খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ১৯; বাদায়েউস সানায়ে, খণ্ড: ২, পৃষ্ঠা : ২২৫)
রোজাদারের খাবারের হিসাব হবে না
কোনো কোনো মানুষকে বলতে শোনা যায়, ‘রোজাদারের খাবারের হিসাব হবে না’—এটি ভুল কথা। খাবারের হিসাব বলতে সাধারণত খাবারের অপচয় বোঝায়। আর কোরআন-হাদিসে এমন কথা নেই, রোজাদার যদি খাবারের অপচয় করে, তাহলে তার কোনো হিসাব হবে না। খাবার বা যে কোনো বস্তুই অপচয় করলে আল্লাহর কাছে তাকে এর হিসাব দিতে হবে। (আলবাহরুর রায়েক, খণ্ড: ২, পৃষ্ঠা: ২২১)
জাকাত আদায় করতে হয় শুধু রমজান মাসে
অনেকে মনে করেন, জাকাত শুধু রমজান মাসে আদায়যোগ্য আমল। এ ধারণা ঠিক নয়। নেসাব পরিমাণ সম্পদের ওপর এক চান্দ্রবৎসর অতিবাহিত হলেই জাকাত দেওয়া ফরজ। জাকাত ফরজ হওয়ার পর দ্রুত আদায় করতে হবে। কোনো কোনো ব্যক্তিকে দেখা যায়, তাদের জাকাতবর্ষ রমজান মাসের আগে, এমনকি ৪-৫ মাস আগে হয়ে যায়, এরপরও তারা তখন জাকাত আদায় করেন না; বরং রমজানের অপেক্ষা করতে থাকেন। এমন করা উচিত নয়।
তাড়াতাড়ি সাহরি ও দেরিতে ইফতার করা
মধ্যরাতে বা সময় শেষ হওয়ার অনেক আগে সাহরি খাওয়া, সাহরি না খেয়ে রোজা রাখা এবং দেরি করে ইফতার করা অনেকে উত্তম কাজ মনে করেন। এসব কাজ রাসুল (সা.)-এর দিকনির্দেশনার পরিপন্থি। মুস্তাহাব হলো, রোজাদার সাহরি খাবে দেরি করে, একবারে শেষ সময়ে। ইফতারের নিয়ম হচ্ছে, সূর্যাস্তের সঙ্গে সঙ্গে ইফতার করা। নবুয়তের চরিত্রের তিনটি আদর্শ হলো, তাড়াতাড়ি ইফতার করা, সাহরি বিলম্বিত করা এবং নামাজে ডান হাত বাম হাতের ওপর রাখা।
রোগীর কষ্ট হওয়া সত্ত্বেও রোজা রাখা
রোজার কারণে অসুস্থ ব্যক্তির কষ্ট বা অসুখ বেড়ে যাওয়ার শঙ্কা থাকলে রোজা রাখার প্রয়োজন নেই। এ রকম অসুস্থতায় রোজা রাখা ভুল। আল্লাহ তাআলা অসুস্থের জন্য রোজা ভাঙা ও পরবর্তীতে তা কাজা করার অনুমতি দিয়েছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘কাজেই তোমাদের মধ্যে যে এ মাস পাবে, সে যেন এ মাসে রোজা রাখে। তবে তোমাদের কেউ অসুস্থ থাকলে বা সফরে থাকলে অন্য দিনগুলোতে এ সংখ্যা পূরণ করবে।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ১৮৫)
সাহরিকে ‘সেহরি’ বলা
সেহরি হলো জাদু বা ম্যাজিক, আর সাহরি হলো রোজা রাখার জন্য সুবহে সাদিকের আগে কিছু খাওয়া বা পান করা। সাহরি সম্পর্কে কোরআনে আছে, ‘তোমরা পানাহার করো যতক্ষণ না ফজরের সাদা রেখা কালো রেখা থেকে স্পষ্ট হয়। অতপর রাত পর্যন্ত রোজা পূর্ণ করো।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ১৮৭)
ইফতারির সময় আজানের উত্তর না দিয়ে ইফতার করা
আজানের উত্তর দেওয়া জরুরি। রোজাদারদের কেউ কেউ মাগরিবের আজান অনুসরণ (উত্তর না দিয়ে) না করে ইফতারে ব্যস্ত হয়ে যায়। এটি ভুল; কেননা রোজাদার এবং রোজাদার ছাড়াও সবার জন্যই সুন্নত আজানের জবাব দেওয়া। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যদি তোমরা ডাক (আজান) শোনো, তবে তোমরা বলো যেমন মুয়াজ্জিন বলেন।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৩৮৩)। ইফতারের সঙ্গে সঙ্গে আজানের জবাবও দেওয়া উত্তম। ইফতার করা অবস্থায় আজানের জবাব দেওয়া যাবে না, এমন কথা কোরআন-হাদিসে নেই।
পানীয় দিয়ে ইফতার শুরু করা জরুরি
ইফতারিতে সুন্নত হলো, খেজুর দিয়ে শুরু করা। কেননা তা বরকতময়। খেজুর না থাকলে পানি দিয়ে ইফতার করা যাবে। তবে পানি দিয়েই ইফতার করতে হবে, এমনটা মনে করা ভুল।
রমজানের ২৭তম রাতই শবেকদর
প্রায় মুসলমানই রমজানের ২৭তম রাতকে নির্দিষ্টভাবে লাইলাতুল কদর বা শবেকদর মনে করেন। এমন ধারণা করা ভুল। রমজানের শেষে দশ রাতের বিজোড় রাতে কদরের রাত তালাশ করতে হবে।