মক্কার কাবাঘরের চাবি কার কাছে থাকে?

পৃথিবীর প্রথম ঘর কাবা। এটি সৌদি আরবের মক্কায় অবস্থিত। কাবাঘরের দিকে মুখ করে পৃথিবীর সব মুসলমান নামাজ পড়েন। তারা প্রতি বছর হজ এবং ওমরাহ করতে এখানে আসেন। এটি আল্লাহর ঘর।
কাবা ঘরে প্রবেশের জন্য একটি মাত্র দরজা আছে, যাকে বাবে কাবা বা কাবার দরজা বলা হয়। মেঝে থেকে দুই দশমিক ১৩ মিটার উচ্চতায় থাকা এই দরজা কাবার উত্তর-পূর্ব দেয়ালের কাছে এবং হাজরে আসওয়াদ নামের কালো পাথরের খুব কাছাকাছি অবস্থিত, যেখান থেকে তাওয়াফ শুরু হয়।
কাবাঘরের দরজার চাবি ইসলামপূর্ব যুগ থেকে বংশানুক্রমিকভাবে আল-শাইবা পরিবারের হাতে রক্ষিত আছে। প্রায় ১৬০০ বছর ধরে এই পরিবার কাবাঘরের চাবির রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পালন করে আসছে।
তখনও হজরত মুহাম্মদ (সা.) মদিনায় হিজরত করেননি। মক্কায় কিছুটা গোপনে কিছুটা প্রকাশ্যে ইসলামের দাওয়াত দিচ্ছেন মানুষকে। সেসময় প্রতি সোম ও বৃহস্পতিবার কাবার দরজা খোলা হতো। এ দুদিন লোকেরা আল্লাহর ঘরে প্রবেশের সৌভাগ্য লাভ করত। একদিন রাসুলুল্লাহ (সা.) কয়েকজন সাহাবিকে নিয়ে কাবাঘরে প্রবেশ করতে চাইলেন। কিন্তু কাবার চাবির দায়িত্ব পালন করা উসমান ইবনে তালহা সেদিন মহানবীকে চাবি দেননি। উসমান তখনও মুসলমান হননি।
রাসুলুল্লাহ (সা.) ধৈর্য ধরলেন। বাধা মেনে নিলেন। শুধু বললেন, ‘উসামন, একদিন তুমি এই চাবি আমার হাতে দেখতে পাবে। আমি তখন যাকে ইচ্ছা চাবিটি দেব।’
হিজরতের অষ্টম বছর। মুসলমানরা মক্কা বিজয় করলেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) কাবাঘরে প্রবেশ করতে চাইলেন। কিন্তু দরজা বন্ধ। লোকেরা নবীজিকে জানালেন, ‘চাবি উসমান ইবনে তালহার কাছে আছে, তিনি কাবার চূড়ায় লুকিয়ে ছিলেন।’
রাসুলুল্লাহ (সা.) আলি ইবনে তালিব (রা.)-কে উসমানের কাছে পাঠালেন। আলি (রা.) তার কাছে চাবি চাইলেন। তিনি দিতি অস্বীকৃত জানালেন। আলি (রা.) জোর করে চাবি নিয়ে এলেন। খোলা হলো কাবাঘরের দরজা। নবী (সা.) প্রবেশ করে নামাজ আদায় করছিলেন। এ সময় আল্লাহ কোরআনের এ আয়াত নাজিল করেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দিচ্ছেন, হকদারদের হক তাদের কাছে পৌঁছে দিতে। তোমরা যখন মানুষের মাঝে বিচার করবে তখন ন্যায়পরায়ণতার সঙ্গে বিচার করবে। আল্লাহ তোমাদেরকে কত উত্তম উপদেশই না দিচ্ছেন; নিশ্চয়ই আল্লাহ সবকিছু শোনেন, সবকিছু দেখেন।’ (সুরা নিসা, আয়াত: ৫৮)
এ আয়াত শোনার সঙ্গে সঙ্গে আলি (রা.)-কে ডাকলেন মহানবী (সা.)। উসমান ইবনে তালহার কাছে চাবি ফিরিয়ে দিয়ে তার কাছে ক্ষমা চাইতে আলি (রা.)-কে নির্দেশ দিলেন। আলি (রা.) তাই করলেন। উসমান বেশ হতবাক হলেন। তিনি বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না, যিনি মক্কা জয় করেছেন, সেই নবী (সা.) তাকে চাবি ফিরিয়ে দিচ্ছেন। পরে, আলী (রা.) ব্যাখ্যা করলেন যে, আল্লাহ চেয়েছিলেন যেন কাবাঘরের চাবিগুলো উসমান ইবনে তালহার কাছেই থাকে। তখন উসমান ইসলাম গ্রহণ করলেন। পড়লেন কালিমা—আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, নিশ্চয়ই আল্লাহ এক এবং মুহাম্মদ (সা.) আল্লাহর রাসুল।
উসমান ইবনে তালহা (রা.) ইসলাম গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গে জিবরাইল (আ.) আল্লাহর পক্ষ থেকে এ বার্তা নিয়ে পুনরায় এসে বললেন, কেয়ামতের দিন পর্যন্ত কাবাঘরের চাবি উসমান ইবনে তালহার পরিবারের কাছেই থাকবে।
মহানবী (সা.) উসমানকে (রা.) ডাকলেন। বললেন, ‘এখন থেকে কেয়ামত পর্যন্ত এ চাবি তোমার বংশধরের হাতেই থাকবে।’ সেই ধারা এখনও চলমান। ইসলামপূর্ব জাহেলি যুগ ও ইসলাম পরবর্তী যুগে কাবার চাবির রক্ষক উসমান ইবনে তালহার (রা.) বংশধররা। তাদের কাছ থেকে চাবি নিয়েই বিভিন্ন সময় সৌদি আরবের বাদশাহ এবং গণমান্য ব্যক্তিরা কাবাঘরে প্রবেশ করেন। তারাই কাবার দরজা খুলে দেন।
বর্তমানে চাবির দায়িত্বে রয়েছেন শায়েখ আবদুল ওয়াহাব বিন জাইন আল-আবিদিন আল-শাইবি, যিনি হজরত উসমান (রা.)-এর ১১০তম উত্তরসূরি।
চাবির উপাদান
কাবাঘরের বর্তমান তালা ও চাবি ১৮ ক্যারেট সোনার নিকেল দিয়ে তৈরি। তালা ও চাবিতে কোরআনের আয়াত খোদিত রয়েছে। চাবি সংরক্ষণের জন্য ব্যবহৃত ব্যাগেও কোরআনের আয়াতের নকশা করা থাকে। তুরস্কের জাদুঘরে অটোমান আমলের ৪৮টি চাবি সংরক্ষিত আছে, যা কাবার দরজা খোলার জন্য ব্যবহৃত হতো। সৌদি আরবে এই চাবির যে অনুলিপি আছে, তা খাঁটি সোনা দিয়ে তৈরি।



