কতটা ধৈর্য ধরেন আইয়ুব (আ.), বিনিময়ে কী পেয়েছিলেন

পবিত্র কোরআনের চারটি সুরার আটটি আয়াতে আইয়ুব (আ.)-এর কথা পাওয়া যায়। আইয়ুব (আ.) আল্লাহর প্রিয় বান্দা ও নবী। অর্থনীতিতে বেশ স্বচ্ছল ছিলেন তিনি। আর্থিক সংকট ও শারীরিক অসুস্থতায় পড়ে অভূতপূর্ব ধৈর্য ধরেছিলেন তিনি। ধৈর্যের পুরস্কার পেয়েছিলেন সব কিছুতে দ্বিগুণ করে।
আইয়ুব (আ.) ইয়াকুব (আ.)-এর বংশধর। আল্লামা ইবনে জারির বলেন, তাঁর বংশ পরম্পরা হলো, আইয়ুব বিন আমুস বিন রুম বিন আইস বিন ইসহাক (আ.) বিন ইয়াকুব (আ.)। কোরআনে আছে, ‘আমি তাকে (ইবরাহিম) দান করেছিলাম ইসহাক আর ইয়াকুব; তাদের প্রত্যেককে সৎ পথ দেখিয়েছিলাম, আর এর আগে নুহকে সৎ পথ দেখিয়েছিলাম। আর তার বংশধর থেকে দাউদ, সুলাইমান, আইয়ুব, ইউসুফ, মুসা ও হারুনকে (সৎ পথ দেখিয়েছিলাম)। সৎ কর্মশীলদের আমি এভাবেই পুরস্কৃত করে থাকি।’ (সুরা আনয়াম, আয়াত: ৮৪)
ইবনে আসাকিরের মতে, তাঁর মা ছিলেন লুত (আ.)-এর মেয়ে। তাঁর পিতা ইবরাহিম (আ.)-এর ওপর ঈমান এনেছিলেন। এ হিসেবে তিনি মুসা (আ.)-এর আগে পৃথিবীতে এসেছিলেন। ইবনে জারিরের মতে, শুয়াইব (আ.)-এর পর তিনি দুনিয়ায় আসেন। সুলাইমান (আ.)-এর পর দুনিয়াতে এসেছেন বলে কেউ কেউ মত দিয়েছেন। (তাফসিরে রুহুল মাআনিতে সুরা আনয়ামের ৮৪ নম্বর আয়াতের ব্যাখ্যা দ্রষ্টব্দ)
সাইয়েদ সুলাইমান নদভি বলেন, ‘সাবার সমৃদ্ধির যুগ ছিল ১০০০ খিষ্টপূর্বাব্দ এবং কালদানের সমাপ্তির যুগ ছিল ৭০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ। এ দুটি যুগের মধ্যবর্তী যুগ হলো ১০০০ থেকে ৭০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ। এই মধ্যবর্তী যুগ ছিল আইয়ুব (আ.)-এর যুগ। (আল কুরআনের ভৌগোলিক ইতিহাস, অনুবাদ: আবদুস সাত্তার আইনী, খণ্ড: ২, পৃষ্ঠা: ৭৮)। তাওরাতের বর্ণনা মতে, তিনি থাকতেন আরবের উত্তরাঞ্চলে ফিলিস্তিনের পাশের শহর বুসরায়। (ইশইয়া, খণ্ড: ৬৩, পৃষ্ঠা: ১)
আইয়ুব (আ.)-এর দখলে ছিল গোটা শাম অঞ্চল—এর সমতলভূমি ও পাহাড়ি অঞ্চল। তাঁর ছিল অগাধ ধন-দৌলত। সুরম্য দালান-কোঠার বাসস্থান ছিল। হরেক রকম ফলমূলের বাগান চোখ জুড়িয়ে দিত। দৃষ্টি ছাড়িয়ে যেত খেত-খামারের সীমানা। চতুষ্পদ জন্তুতে পূর্ণ থাকত আস্তাবল। নেক সন্তানের কোলাহল তাঁর জীবন করেছিল মধুর। মহিয়সী স্ত্রীর আনুগত্য, যত্ন আর ভালোবাসা বিপুল পরিতৃপ্ত করেছিল জীবন। স্বচ্ছল পরিতৃপ্ত জীবনে তিনি সবসময় আল্লাহর কৃতজ্ঞতা আদায় করে চলতেন। আল্লাহর নির্দেশমতো জীবন পরিচালনা করতেন। মানুষকে আল্লাহর পথে দাওয়াত দিতেন। একাত্ববাদের কথা শোনাতেন। দরিদ্র ও নিঃস্বদের সাহায্য করতেন। এতিম-বিধবাদের প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়াতেন। নির্যাতিতদের পাশে দাঁড়াতেন। এর মধ্যে মহান আল্লাহ তাঁকে পরীক্ষায় ফেললেন একবার। ভয়াবহ রোগ ব্যাধিতে আক্রান্ত হলেন তিনি। তাঁর ধন-সম্পদ, বাগ-বাগিচা, খেত-খামার নষ্ট হয়ে গেল। সন্তানরা মারা পড়ল। আত্মীয়-স্বজনরা অপরিচিতি হয়ে উঠল। বন্ধুরা তাঁকে বেমালুম ভুলে গেল। জীবনের এই ভয়াবহ সংকটে কাছে রইলেন একমাত্র স্ত্রী। পরম মমতায় স্বামী আইয়ুবের যত্ন নিলেন তিনি। শেষ দিকে তিনিও ঘাবড়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু এক মুহূর্তের জন্যও ঘাবড়ে যাননি আইয়ুব (আ.)। তিনি সংযম করলেন। ধৈর্য ধরলেন। সুস্থতায় যেভাবে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করতেন, ঠিক তেমনি শুকরিয়া আদায় করে চললেন। কারও প্রতি তাঁর অভিযোগ-অনুযোগ নেই। হারিয়ে ফেলা পরিতৃপ্ত জীবনের জন্য আফসোস নেই। পবিত্রতার এ জীবনে আছে শুধু আল্লাহর আনুগত্য ও কৃতজ্ঞতা। আছে ‘আল্লাহ খুশি হয়ে যান’ এমন ধৈর্য। (তাফসিরে মাআরিফুল কোরআন, মাওলানা মুহাম্মাদ ইদরিস কান্ধলভি, অনুবাদ: আবদুল্লাহ আল ফারুক, খণ্ড: ৫, পৃষ্ঠা: ৪৫৭)
ইবনে কাসিরে আছে, আইয়ুব (আ.)-এর স্ত্রী ছিলেন ইউসুফ (আ.)-এর মেয়ে বা পৌত্রী। তাঁর নাম ছিল লাইয়া বিনতে মেশা ইবনে ইউসুফ (আ.)। (তাফসিরে মাআরেফুল কোরআন, মুফতি মুহাম্মাদ শফি, অনুবাদ: মাওলানা মুহিউদ্দিন খান, পৃষ্ঠা: ৮৮৭)
সীমাহীন দারিদ্রের মধ্যে পড়ে গেলেন আইয়ুব (আ.)। অর্থাভাব তাঁকে চারদিক থেকে ঘিরে ধরল। চিকিৎসা খরচও নেই তাঁর কাছে। পরিবারের খরচ মেটাতে একপর্যায়ে স্ত্রী মানুষের বাসায় কাজ শুরু করলেন। এদিকে দুঃখ-কষ্ট ও রোগ-ব্যাধি বাড়তে থাকে নবী আইয়ুবের। যত দুঃখ বা রোগ বাড়ে তাঁর, তত ধৈর্যশীল হন তিনি। তাঁর পবিত্র মোহন ধৈর্যের কাছে দুঃখ-কষ্ট বা রোগ-বালাই যেন কিছুই নয়। তাঁর ধৈর্য দেখে আল্লাহ বলেন, ‘আমি তাঁকে (আইয়ুব) ধৈর্যশীল হিসেবে পেয়েছি।’ (সুরা সোয়াদ, আয়াত: ৪৪)
ইয়াজিদ ইবনে মায়সারা বলেন, ‘আল্লাহ যখন আইয়ুব (আ.)-কে অর্থকড়ি, সন্তান-সন্ততি ইত্যাদি জাগতিক নেয়ামত থেকে মুক্ত করে পরীক্ষা করেন, তখন তিনি মুক্ত মনে আল্লাহর স্মরণ ও ইবাদতে আরও বেশি আত্মনিয়োগ করেন। আল্লাহর কাছে আরজ করেন, হে আল্লাহ, আমি তোমার কৃতজ্ঞতা আদায় করি এ কারণে যে, তুমি আমাকে সহায়-সম্পত্তি ও সন্তান-সন্ততি দান করেছ। এদের ভালোবাসা আমার অন্তরকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল। এরপর এ কারণেও কৃতজ্ঞতা আদায় করি, তুমি আমাকে এসব বস্তু থেকে মুক্তি দিয়েছ। এখান আমার ও তোমার মধ্যে কোনো অন্তরায় অবশিষ্ট নেই।’ (তাফসিরে মাআরেফুল কোরআন, মুফতি মুহাম্মাদ শফি, অনুবাদ : মাওলানা মুহিউদ্দিন খান, পৃষ্ঠা : ৮৮৭)
আইয়ুব নবীর স্ত্রীর চিন্তায় সারাক্ষণ থাকে প্রিয় স্বামীর সুকল্যাণ আর রোগমুক্তি। দিবানিশি ভাবেন, কীভাবে সেরে উঠবেন হৃদয়ের মানুষ। একবার পেরাশানি নিয়ে ঘুরাফেরা করছিলেন এদিক-সেদিক। চিকিৎসকের আকৃতিতে শয়তান এলো তাঁর কাছে। তিনি শয়তানকে চিকিৎসার আবেদন জানালেন। শয়তান বলল, ‘তার রোগ সারলে বলতে হবে, তুমি এ রোগ সারিয়েছ। এটা বললে আমাকে কোনো ফি দিতে হবে না।’ তিনি স্বামীকে ঘটনা শোনালেন। আইয়ুব (আ.) বুঝলেন, এটি শয়তানের কাজ। তিনি স্ত্রীর সঙ্গে রাগ করলেন। বললেন, ‘আল্লাহ আমাকে আরোগ্য দিলে তোমাকে শাস্তিস্বরূপ একশ চাবুক মারব।’ (তাফসিরে মাআরিফুল কোরআন, মাওলানা মুহাম্মাদ ইদরিস কান্ধলভি, অনুবাদ: মুফতি মুহাম্মাদ আব্দুল হালীম, খণ্ড: ৭, পৃষ্ঠা: ৬২)
এভাবে কয়েক বছর অসুস্থ শরীর নিয়ে সন্তানহীন, সঙ্গীহীন ও সম্পদহীন দুর্ভোগ জীবন কাটাতে হলো আইয়ুব (আ.)-এর। কারও মতে, দীর্ঘ আঠারো বছর কাটাতে হলো। যন্ত্রণায় দগ্ধ হতে হতে একদিন তিনি আল্লাহকে বললেন, ‘কষ্ট আমাকে স্পর্শ করেছে। আপনি তো দয়াবান।’ পবিত্র কোরআনে বাঙময় হয়েছে এভাবে—‘আমি দুঃখ কষ্টে নিপতিত হয়েছি, তুমি তো দয়ালুদের সর্বশ্রেষ্ঠ দয়ালু।’ (সুরা আম্বিয়া, আয়াত: ৮৩)
আহ্, এত দুঃখ-কষ্ট-যন্ত্রণার পরও নবী আইয়ুবের কোনো অভিযোগ নেই। অনুযোগ নেই। কত মধুময় আবেদন। কত মার্জিত, কত নমনীয় দোয়া। নিজের কষ্টের কথা বলেছেন। কিন্তু আবদার করেননি, কোনো কিছু প্রার্থনা করেননি, কোনো নালিশ করেননি। অক্ষমতা ও অসহায়ত্বের কথা বলেছেন শুধু। বলেছেন, ‘আপনি রহমান, দয়াবান। আপনি যা ইচ্ছে করুন। আমি তো আপনার বান্দা।’ আইয়ুব (আ.) কষ্টের সঙ্গে ধৈর্য ধরে প্রভুকে খুঁজে পান। প্রভুর প্রেম পান।
তাঁর মধুময় নমনীয় আবেদনে আল্লাহ খুশি হন। তাঁর দোয়া কবুল করেন। আল্লাহ বলেন, ‘তখন আমি তার ডাকে সাড়া দিলাম এবং তার যে দুঃখ-কষ্ট ছিল তা দূর করে দিলাম।’ (সুরা আম্বিয়া, আয়াত: ৮৪)
আইয়ুব (আ.) স্ত্রীর সাহায্যে প্রাকৃতিক কাজ সারতে বের হতেন। স্ত্রী তাঁকে হাত ধরে নিয়ে যেতেন। কাজ শেষ হলে আবার নিয়ে আসতেন। একদিন তিনি প্রাকৃতিক কাজ থেকে ফিরতে দেরি করছিলেন। স্ত্রী চিন্তায় পড়ে যান। এগিয়ে যান কিছুটা পথ। এদিকে আইয়ুব (আ.) অলৌলিক ঝরনায় গোসল করে ও পানি পান করে পরিপূর্ণ সুস্থ ও সুন্দর হয়ে যান। স্ত্রী তাঁকে দেখে চিনতে পারেননি। তাঁর কাছেই তাঁর খবর জানতে চান। আইয়ুব নবী বললেন, ‘আমি আইয়ুব।’ তাঁর সুস্থ হওয়ার বর্ণনা কোরআনে এসেছে এভাবে, ‘আপনি নিজের পা দিয়ে আঘাত করুন। এই তো গোসল ও পান করার ঠান্ডা পানির ঝরনা নির্গত হলো।’ (সুরা সোয়াদ, আয়াত: ৪২)
আল্লাহ তাঁকে আরোগ্য করার সঙ্গে সঙ্গে আগের সব কিছু—সন্তান, ধন-সম্পদ, বাগান, খেত-খামার ও চতুষ্পদ জন্তু—দ্বিগুণ করে দান করেন। কোরআনে আছে, ‘তাকে দান করলাম পরিবার-পরিজন এবং তাদের সঙ্গে তাদের সমপরিমাণ আরও দিলাম আমার পক্ষ থেকে রহমতস্বরূপ।’ (সুরা আম্বিয়া, আয়াত: ৮৪)
আরেক আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘আমি তাকে দান করলাম তাঁর পরিবার-পরিজন আর তাদের সঙ্গে তাদের মতো আরও, আমার রহমত স্বরূপ আর জ্ঞান-বুদ্ধিসম্পন্ন লোকেদের জন্য উপদেশ স্বরূপ।’ (সুরা সোয়াদ, আয়াত: ৪৩)
আইয়ুব (আ.)-এর একটি গম শুকানোর এবং একটি যব শুকানোর উঠোন ছিল। মহান আল্লাহ সে দুটির ওপর দুই খণ্ড মেঘ পাঠালেন। এক খণ্ড মেঘ গমের উঠানে এমনভাবে স্বর্ণ ফেলল, সেটি পূর্ণ হয়ে গেল। অন্য মেঘ খণ্ডটি যবের উঠানে এমনভাবে রৌপ্য ফেলল, সেটাও পূর্ণ হয়ে গেল। (সহিহ ইবনে হিব্বান, হাদিস : ২৮৯৮; মুসতাদরাকে হাকিম, হাদিস : ৪১১৫)
আল্লাহর পক্ষ থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে স্বর্ণের পঙ্গপাল আসে আইয়ুব (আ.)-এর কাছে। তিনি সেগুলো সংগ্রহ করেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘একবার আইয়ুব (আ.) কাপড় খুলে (অর্থাৎ বাথরুম ছাড়াই খোলা জায়গায়) গোসল করছিলেন, এ সময় একঝাঁক স্বর্ণের পঙ্গপাল তাঁর ওপর পড়তে শুরু করলে তিনি সেগুলো মুঠি মুঠি কাপড়ে জমা করছিলেন। তখন আল্লাহ তাঁকে ডাক দিয়ে বলেন, হে আইয়ুব, আমি কি তোমাকে যা দেখছ তা থেকেও বেশি দিয়ে ধনী বানাইনি? আইয়ুব (আ.) বললেন, ‘হে আমার প্রভু, তবে আপনার দেওয়া বরকত থেকে আমি কখনো মুখাপেক্ষীহীন হব না।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৭৪৯৩)
নিরোগ হলে স্ত্রীকে শাস্তি দেওয়ার কসম করেছিলেন আইয়ুব (আ.)। এ ব্যাপারে আল্লাহ তাকে নির্দেশ দিয়ে বলেন, ‘(আমি তাকে বললাম) কিছু ঘাস লও আর তা দিয়ে আঘাত করো, (আর তোমার স্ত্রীকে একশত বেত্রাঘাত করার শপথ) ভঙ্গ করো না।’ (সুরা সোয়াদ, আয়াত: ৪৪)





