logo

‘কেয়ামত কাছাকাছি’ বলে কী বোঝানো হয়েছে

‘কেয়ামত কাছাকাছি’ বলে কী বোঝানো হয়েছে

কোরআনের বিভিন্ন আয়াত ও হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর হাদিসে ‘কেয়ামত অত্যন্ত সন্নিকটে’ বা ‘কেয়ামত কাছাকাছি’ বলা হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সময় কিছু নিদর্শন প্রকাশিত হওয়ার পর বলা হয়েছে ‘কেয়ামত খুবই কাছে’। কোনো হাদিসে বলা হয়েছে ‘কেয়ামত এসে গেছে’। আল্লাহ বলেন, ‘কেয়ামত অত্যাসন্ন। চাঁদ বিদীর্ণ হয়ে গেছে।’ (সুরা কামার, আয়াত: ১)। আল্লাহ আরও বলেন, ‘মানুষের হিসাব কাছাকাছি এসে গেছে। অথচ তারা উদাসীন, বিমুখ হয়ে আছে।’ (সুরা আম্বিয়া, আয়াত: ১)  

দেড় হাজার বছর আগে রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর আগমন ও কেয়ামতকে হাতের দুই আঙুলের মতো কাছাকাছি বলেছেন। প্রশ্ন হতে পারে—দেড় হাজার বছর পার হলো, অথচ এখনও কেয়ামত হয়নি। তাহলে এটা কেমন বক্তব্য হলো?

এই প্রশ্ন তৈরি হয়েছে মূলত তাঁর বক্তব্য না বোঝার কারণে। বিষয়টি কয়েকভাবে স্পষ্ট করা যায়—

‘কাছাকাছি’ বলে দুই আঙুল মিলিত করে দেখানোর উদ্দেশ্য হলো, তিনি শেষ নবী এবং তাঁর উম্মতের মাঝেই কেয়ামত সংঘটিত হবে। অর্থাৎ শাহাদাত ও মধ্যমা আঙুলের মাঝে যেমন অন্য কোনো আঙুল নেই, একইভাবে তাঁর মাঝে ও কেয়ামতের মাঝে আর কোনো নবী আসবেন না। অন্য নবীরাও নিশ্চিতভাবেই জানতেন, তাঁদের উম্মতের মাঝে কেয়ামত হবে না। কারণ, শেষ নবী তখনো আসেননি। 

রাসুলুল্লাহ (সা.) শেষ নবী। তাঁর পর পৃথিবীতে কোনো নবী আসবে না। সুতরাং পৃথিবীর সময় যে শেষ হয়ে আসছে, কেয়ামত যে ঘনিয়ে আসছে—সেটা স্পষ্ট। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘...আমি কেয়ামতের মৃদুমন্দ বায়ু প্রবাহের মাঝে প্রেরিত হয়েছি।’ (আল-মাতালিবুল আলিয়া, ইবনে হাজার আসকালানি, খণ্ড: ১৮, পৃষ্ঠা: ৪১০)

আরবিতে বাতাসের প্রথম প্রবাহকে ‘নাসাম’ বলা হয়। সে হিসেবে উক্ত হাদিসের অর্থ হলো, ‘বাতাসের প্রবাহের মতো কেয়ামতের নিদর্শনগুলো প্রকাশের একবারে শুরুতে আমি প্রেরিত হয়েছি।’ অন্য কথায়, তাঁর আগমন কেয়ামতের নিদর্শনসমূহের সমাপ্তি নয়, বরং সূচনা। ফলে অন্যান্য নিদর্শন প্রকাশ পাওয়ার পরই কেয়ামত আসবে। তাঁর আগমনের কয়েক বছরের মাঝেই কেয়ামত হয়ে যাবে—এমন নয়। 

হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর আগমন ও কেয়ামতকে যদি হাতের দুই আঙুলের মতো কাছাকাছি মনে করা হয়, তবুও হাদিসের অর্থ বিশুদ্ধ। কারণ, কাছাকাছি বিষয়টা আপেক্ষিক। নবী (সা.)-এর আগমনের পর যদিও দেড় হাজার বছর অতিক্রান্ত হয়ে গেছে এবং আরও হয়তো শত শত বছর যাবে, কিন্তু তাতে ‘কাছাকাছি’ হওয়ার বক্তব্য লঙ্ঘিত হবে না। কারণ, পৃথিবীর বয়সের তুলনায় কয়েক হাজার বছর কিছুই নয়। এটা নবী (সা.)-এর একাধিক হাদিস দিয়ে প্রমাণিত। 

আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) বলেন, ‘আমরা একদিন আসরের নামাজের পর নবী (সা.)-এর সঙ্গে বসা ছিলাম। সূর্য তখন কুআইকিয়ান পাহাড়ের ওপর ছিল। তিনি বললেন, ‘অন্যান্য উম্মতের তুলনায় তোমাদের জীবনকাল হলো পুরো দিনের তুলনায় অবশিষ্ট সময়ের মতো।’ (মুসনাদে আহমদ, হাদিস: ৬০৭৪)

 

এক হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘পূর্ববর্তী উম্মতগুলোর তুলনায় এ উম্মতের সময় হচ্ছে আসর ও মাগরিবের মাঝামাঝি সময়ের মতো।’ তাঁর এ বক্তব্য ইতিহাস ও বিজ্ঞান—সবকিছুর আলোকে উত্তীর্ণ। পৃথিবীতে মানবসভ্যতার ইতিহাস সুদীর্ঘ। সেটা লাখো বছরের। কত প্রাচীন ও পুরোনো যুগ কেটে গেছে। কত শত জাতি এসেছে ও বিলুপ্ত হয়ে গেছে। কত সভ্যতার উত্থান-পতন ঘটেছে। এই পুরোটো সময় সূর্যোদয় থেকে আসর পর্যন্ত সময়ের সঙ্গে তুলনা করা হলে, আসর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত সময়টা শুধু দেড় হাজার বছরে কিছুই নয়। ফলে কেয়ামত আসার পথ যে দীর্ঘ, সেটা বোঝা যায়। 

কেয়ামত কখন হবে, এটা শুধু আল্লাহই জানেন। আল্লাহ ছাড়া কেউ কেয়ামত হওয়ার দিন-তারিখ জানেন না। তবে কোরআন-হাদিসে কেয়ামত সংঘটিত হওয়ার কিছু আলামতের কথা বলা হয়েছে। কোরআনে আছ, ‘কিয়ামতের জ্ঞান শুধু আল্লাহর কাছে আছে।’ (সুরা লুকমান, আয়াত: ৩৪)