পরিবেশ নিয়ে মহানবীর (সা.) ৬ নির্দেশনা

প্রকৃতি ও পরিবেশের বিপর্যয়ের কারণে জলবায়ুর পরিবর্তন হয়। জলবায়ুর পরিবর্তনে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায়। পৃথিবীতে প্রাণের অস্তিত্ব ঠিক রাখার জন্য বৈশ্বিক উষ্ণায়ন হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট বৈশ্বিক উষ্ণায়নের অন্যতম প্রধান কারণ—পরিবেশ দূষণ। পরিবেশ দূষণ রোধ করতে ইসলামের সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা রয়েছে। সাড়ে চৌদ্দশত বছর আগে হজরত মুহাম্মদ (সা.) মানুষকে পরিবেশ নিয়ে সচেতন করেছেন। তিনি তখনই এমন কিছু নির্দেশনা দিয়েছেন, যা আজকের দিনেও প্রাসঙ্গিক।
বায়ু দূষণ প্রতিরোধ
মুক্ত ও পরিচ্ছন্ন বাতাস প্রকৃতি ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে। দূষিত বাতাস স্বল্প সময়ে প্রকৃতির নির্মলতা নষ্ট করে দেয়। বায়ু দূষণে স্বাস্থ্যের ক্ষতি হয়, পরিবেশ ও সম্পদ নষ্ট হয়। এর ফলে বায়ুমণ্ডলে ওজন স্তর পাতলা হয়ে যায়। এসব বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের কারণ হয়। বায়ুকে দূষণ মুক্ত রাখতে ইসলামের যথেষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। যেমন—উন্মুক্ত স্থানে মলমূত্র ত্যাগ না করা: রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা অভিশাপ ডেকে আনে এমন তিনটি কাজ থেকে বিরত থাকো। চলাচলের রাস্তায়, রাস্তার মোড়ে অথবা ছায়াদার স্থানে মলমূত্র ত্যাগ করা থেকে।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ২৬)
রাসুলুল্লাহ (সা.) বর্জ্য মাটিতে পুঁতে ফেলার নির্দেশনা দিয়েছেন। তিনি সুগন্ধি ছড়ানো এবং অন্যকে তা উপহার দেওয়ার কথা বলেছেন।
পানি দূষণ প্রতিরোধ
পানি প্রাকৃতিক পরিবেশের প্রধান উপাদান। পানি ছাড়া প্রাণির অস্তিত্ব কল্পনা করা যায় না। সেজন্য পানিকে নিরাপদ ও দূষণমুক্ত রাখতে হবে। নিজেদের কারণে যেন পানি দূষিত না হয় সে বিষয়ে সচেতন হতে হবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) পানিকে পবিত্র, নিরাপদ ও দূষণমুক্ত রাখতে সবাইকে সচেতন করেছেন। আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের কেউ যেন আবদ্ধ পানিতে প্রসাব করে এরপর সেখানে গোসল না করে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৩৬)
ভূমির পরিকল্পিত ব্যবহার
ভূমির যথাযথ ও পরিকল্পিত ব্যবহার নিশ্চিত হলে পরিবেশের ভারসাম্য সহজেই ফিরে আসবে। এজন্য কৃষি জমিতে চাষাবাদ ও বনায়ন করতে হবে। নিজে আবাদ করতে না পারলে অন্যকে বর্গা অথবা এমনিতেই আবাদ করতে দিতে হবে। অকৃষি জমিতে ঘর-বাড়ি, খামার, বাণিজ্যিক অথবা অবাণিজ্যিক স্থাপনা অথবা অন্য কোনোভাবে ব্যবহার করতে হবে। বাড়ির আশপাশের খালি জায়গা, বাড়ির ছাদ, বাড়ি নির্মাণের জন্য বরাদ্দ পাওয়া ফাঁকা প্লট এবং নিজ নিজ মালিকানাধীন জায়গা-জমির যথার্থ ব্যবহার হলে জাতির অবস্থা কখনোই শোচনীয় হবে না। জমির পরিকল্পিত ব্যবহার নিশ্চিত করতে হাদিসে বারবার বলা হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যার কাছে জমি আছে সে যেন তা (নিজে) চাষাবাদ করে। যদি সে (নিজে) চাষাবাদ না করে, তবে যেন তার কোনো ভাইকে চাষাবাদ করতে দেয়।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৩৭৭৩)
বৃক্ষরোপণ ও বনায়ন
বৃক্ষ-তরুলতা প্রকৃতির প্রাণ এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় অতি প্রয়োজনীয় উপাদান। তাই বৃক্ষরোপণ ও পরিচর্যা করতে হবে। অপ্রয়োজনে বৃক্ষ-তরুলতাকে নষ্ট করা যাবে না। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যদি নিশ্চিতভাবে জান যে কিয়ামত এসে গেছে, তখন হাতে যদি একটি গাছের চারা থাকে, যা রোপণ করা যায়, তবে সেই চারাটি রোপণ করবে।’ (সহিহ বুখারি, আদাবুল মুফরাদ: ৪৭৯)। আরেক হাদিসে এসেছে, ‘যে প্রয়োজন ছাড়া গাছ কাটবে (যে গাছ মানুষের উপকার করত) আল্লাহ তার মাথা আগুনের মধ্যে নিক্ষেপ করবেন।’ (বায়হাকি, হাদিস: ১৪০)
প্রাকৃতিক সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার
জীবন ধারণের মূল উপাদানগুলো মহান আল্লাহ সহজ করে দিয়েছেন। যেমন—পানি, বাতাস ইত্যাদি। এসবের সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। সহজলভ্য বলে অপচয় ও অপব্যবহার করা যাবে না। বর্ষায় চারিদিকে পানি বেড়ে গেলেও পানির অপচয় ও অপব্যবহার রোধ করতে হবে। অপচয় সবসময়ই নিষেধ। আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) থেকে বর্ণিত, ‘একবার রাসুলুল্লাহ (সা.) সাদের (রা.) পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন সাদ অজু করছিলেন। রাসুল (সা.) বললেন, ‘কেন এই অপচয়?’ সাদ (রা.) বললেন, অজুতেও কি অপচয় হয়?’ রাসুল (সা.) বললেন, ‘হ্যাঁ, এমনকি প্রবাহিত নদীতে অজু করলেও।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৪২৫)
জীব-জন্তুর প্রতি নিষ্ঠুরতা পরিহার
জলবায়ু পরিবর্তন বা পরিবেশের ভারসাম্যহীনতার জন্য জীববৈচিত্র ধ্বংস অনেকাংশে দায়ী। এজন্য বন্য ও গৃহপালিত পশু-পাখির প্রতিও ভালোবাসা প্রদর্শন ও দয়াশীল আচরণ করতে হবে। কোনো প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুর অচরণ করা যাবে না। আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, ‘সাহাবিরা জিজ্ঞাসা করলেন, হে আল্লাহর রাসুল, জীব-জন্তুর প্রতি দয়া প্রদর্শনের জন্যও কি আমাদের পুরষ্কার আছে? রাসুল (সা.) বললেন, ‘হ্যাঁ। প্রত্যেক দয়াদ্র হৃদয়ের অধিকারীদের জন্য পুরস্কার আছে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৬৬৩)
লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, আরবি বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
