হজের যে পরিভাষাগুলো জানা জরুরি

আর্থিক ও দৈহিকভাবে সামর্থ্যবান নারী-পুরুষের ওপর জীবনে একবার হজ করা ফরজ। হজ মুসলমানদের বিশ্ব সম্মেলন। হজকে কেন্দ্র করে পৃথিবীর সামর্থ্যবান মুসলমানরা মক্কায় জড়ো হন। নির্দিষ্ট দিনে নির্ধারিত নিয়মে সবাই একসঙ্গে হজের আমল করেন। আল্লাহ বলেন, ‘মানুষের মধ্যে হজের ঘোষণা দিন। তারা আপনার কাছে আসবে হেঁটে ও সর্বপ্রকার ক্ষীণকায় উটসমূহের পিঠে (আরোহণ করে), তারা আসবে দূর-দূরান্তের পথ অতিক্রম করে।’ (সুরা হজ, আয়াত: ২৭)
হজসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু আরবি পরিভাষা রয়েছে। সেগুলো জেনে নিলে হজের আমলগুলো আদায় করা সহজ হয়। এখানে প্রয়োজনীয় কিছু পরিভাষার সংক্ষিপ্ত পরিচিতি তুলে ধরা হলো—
ইহরাম: হজ বা ওমরাহর নিয়ত করে তালবিয়া পড়া। অনেকে সেলাইবিহীন কাপড় পরিধান করাকেই ইহরাম মনে করেন। কাপড় পরা মূলত ইহরামের প্রস্তুতি গ্রহণ। ইহরাম হলো সুনির্দিষ্ট কিছু কথা ও কাজ নিজের ওপর নিষিদ্ধ করে নেওয়ার ইচ্ছা করা।
তালবিয়া: হজ ও ওমরাহ পালনার্থীরা ইহরাম গ্রহণের পর থেকেই ‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক...’ বলে যে পবিত্র ধ্বনি উচ্চারণ করেন, সেটাই তালবিয়া।
মিকাত: হজরত মুহাম্মদ (সা.) বায়তুল্লাহর চারদিকে সীমানা নির্ধারণ করে দিয়েছেন, এগুলোকে মিকাত বলে। মক্কাগামী বা হজ-ওমরাহ আদায়কারীর জন্য ইহরাম ছাড়া মিকাত অতিক্রম করা জায়েজ নয়। বাংলাদেশ থেকে বিমানের যাত্রীদের জন্য মিকাত হলো ‘কারনুল মানাজিল’ ও ‘যাতু ইরক’ এর মধ্যবর্তী স্থান। বর্তমানে বিমান জিদ্দা এয়ারপোর্টে অবতরণের প্রায় আধঘণ্টা আগে মিকাতের এ স্থানটি অতিক্রম করে থাকে।
মসজিদে হারাম: বায়তুল্লাহ শরিফকে চতুর্দিক থেকে যে বিশাল মসজিদ ঘিরে রেখেছে এটিই মসজিদে হারাম। অনেকে এই মসজিদকে ‘হারাম শরিফ’ও বলেন।
হারাম: হারাম হচ্ছে মক্কা মুকাররমার ওই বিস্তীর্ণ এলাকা, যার কিছু বিশেষ আহকাম ও আদাব রয়েছে। হারামের সীমানা বায়তুল্লাহর পূর্ব দিকে আরাফা পর্যন্ত, পশ্চিমে হুদাইবিয়া (শুমাইসি) পর্যন্ত, উত্তরে জিরানা ও ওয়ারদিয়ে নাখলা পর্যন্ত এবং দক্ষিণে ওবাইকা পর্যন্ত বিস্তৃত। চতুর্দিকের সীমানায় চিহ্ন ও ফলক লাগানো আছে।
হিল: হারামের সীমানার বাইরে মিকাতের আগ পর্যন্ত স্থানকে হিল বলে ।
মাতাফ: কাবাঘরের চারদিকে অবস্থিত তাওয়াফের স্থানকে মাতাফ বা চত্বর বলা হয়।
তাওয়াফ: হাজরে আসওয়াদের কোণ থেকে শুরু করে পুরো কাবাঘর বিশেষ নিয়মে সাতবার চক্কর দেওয়া।
হাজরে আসওয়াদ: হাজরে আসওয়াদ হলো একটি কালো রঙের প্রাচীন পাথর—যা কাবা শরিফের দক্ষিণ-পূর্ব কোণে মাতাফ থেকে দেড় মিটার (চার ফুট) উঁচুতে অবস্থিত। বর্তমানে এর বরাবর মসজিদে হারামের দেয়ালে সবুজ বাতি লাগানো আছে, যা দেখে সহজেই হাজরে আসওয়াদের স্থানটি চেনা যায়।
রুকনে ইয়ামানি: বাইতুল্লাহর দক্ষিণ-পশ্চিম কোণ ।
হাতিম: বায়তুল্লাহ শরিফ সংলগ্ন উত্তর দিকে মানুষ সমান প্রাচীর দিয়ে ঘেরা অংশ। এটি মূলত কাবাঘরেরই অংশ।
ইজতিবা: পুরুষের জন্য তাওয়াফের শুরুতে ইহরামের চাদর ডান বগলের নিচ দিয়ে বের করে বাম কাঁধের ওপর রাখাকে ইজতিবা বলে। যে তাওয়াফের পর সাই আছে, সে তাওয়াফ অবস্থায় ইজতিবা করতে হয়।
ইসতিলাম: সরাসরি হাজরে আসওয়াদে চুমু দেওয়া অথবা হাত দিয়ে স্পর্শ করে হাতে চুমু দেওয়া কিংবা দূর থেকে হাত দিয়ে ইশারা করা। রুকনে ইয়ামানি হাত দিয়ে স্পর্শ করাকেও ইসতিলাম বলা হয়।
রমল: যে তাওয়াফের পর সাই আছে, সে তাওয়াফের প্রথম তিন চক্কর কাঁধ হেলিয়ে-দুলিয়ে ছোট ছোট পদে একটু দ্রুত ও বীরদর্পে হাঁটা। এ বিধান শুধু পুরুষের জন্য।
মুলতাজাম: হাজরে আসওয়াদ এবং বায়তুল্লাহ শরিফের দরজার মধ্যবর্তী দেয়াল।
মিজাব: বায়তুল্লাহ শরিফের ছাদ থেকে পানি পড়ার যে নালা রয়েছে, এটিকে মিজাব বলে।
মাকামে ইবরাহিম: কাবার পূর্ব দিকে অর্থাৎ হাজরে আসওয়াদ ও রুকনে ইরাকির মাঝ বরাবর কাঁচে ঘেরা একটি পাথর। যার ওপর হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর পদচিহ্ন রয়েছে।
সাফা-মারওয়া: সাফা ও মারওয়া মসজিদুল হারাম সংলগ্ন মক্কার ছোট দুটি পাহাড়ের নাম। এ দুটি পাহাড়ের মধ্যবর্তী স্থানে ‘সাই’ করা হজ-ওমরাহর জন্য ওয়াজিব। বর্তমানে পাহাড় দুটির অংশবিশেষ কাঁচ দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে।
রমি: রমি অর্থ নিক্ষেপ করা। মিনায় শয়তানকে পাথর মারাকে রমি বলে।
সাই: তাওয়াফ সম্পন্ন করার পর সাফা ও মারওয়ার মাঝে বিশেষ নিয়মে সাতবার চক্কর দেওয়া।
দম: ওমরাহ ও হজের আমলে বিশেষ ত্রুটি হলে কিংবা ইহরাম অবস্থায় নিষিদ্ধ কোনো কাজ করে ফেললে হারামের এলাকায় ক্ষতিপূরণ হিসেবে একটি ছাগল-দুম্বা বা উট-গরুর সাত ভাগের এক ভাগ জবাই করাকে দম বলে।
বাদানা: ওমরাহ ও হজের আমলে কোনো কোনো ভুলের কারণে পুরো একটি গরু বা উট জবাই করতে হয়, একে বাদানা বলে।
আশহুরে হজ: হজের মাস অর্থ্যাৎ শাওয়াল, জিলকদ ও জিলহজের অর্ধমাস।
আইয়ামে তাশরিক: ৯ জিলহজ থেকে ১৩ জিলহজ পর্যন্ত যেসব দিনে তাকবিরে তাশরিক পাঠ করা হয়।
মিনা: মক্কা থেকে দক্ষিণ-পূর্ব দিকে পাঁচ মাইল দূরের একটি প্রান্তর। এখানে সব হাজিকেই ৮ জিলহজ পৌঁছতে হয়। এখান থেকে ৯ জিলহজ আরাফার দিকে যেতে হয়। ৯ জিলহজ দিবাগত রাত ছাড়া ১৩ তারিখ পর্যন্ত হাজিদের এখানেই থাকতে হয়। এটি শয়তানকে পাথর মারার জায়গাও।
আরাফা: মক্কা থেকে পূর্ব দিকে প্রায় ১৪-১৫ মাইল দূরে পর্বতবেষ্টিত এক বালুকাময় প্রান্তরের নাম আরাফা। এখানেই ৯ জিলহজ জোহর নামাজের পর অবস্থান করার মাধ্যমেই হজের প্রধান কাজ শেষ করতে হয়।
মুজদালিফা: মিনা থেকে পাঁচ কিলোমিটার দূরে, মিনা ও আরাফার মাঝখানের একটি জায়গার নাম মুজদালিফা। আরাফা থেকে ফিরে এখানে রাত যাপন করতে হয়।
জাবালে রহমত: আরাফার মাঠের একটি পাহাড় এটি। হজের সময় এরই কাছে অবস্থান করতে হয়। এর পাদদেশে থেকেই হজরত মুহাম্মদ (সা.) বিদায় হজের ঐতিহাসিক ভাষণ দিয়েছেন।