মৃতের বাড়িতে কি তিন দিন চুলা জ্বালানো নিষেধ, যা বলছে ইসলাম

মানুষের বেঁচে থাকাটা অস্বাভাবিক, কিন্তু মৃত্যু খুবই স্বাভাবিক। পৃথিবীর প্রথম মানুষ থেকে শুরু করে নির্ধারিত জীবনযাপনের পর কেউ আর বেঁচে নেই। প্রত্যেক প্রাণীকে মরতে হবে। মৃত্যুর কবল থেকে জগতের কোনো তাবৎ পরাশক্তি, কোনো প্রযুক্তি কাউকে বাঁচাতে পারবে না। মৃত্যুর কাছে সবাই অক্ষম। মৃত্যুর অনিবার্য স্বাদ প্রত্যেক প্রাণীকে গ্রহণ করতে হবে। আল্লাহ বলেন, ‘প্রত্যেক প্রাণীকেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে।’ (সুরা আনয়াম, আয়াত: ১৮৫)
আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা যেখানেই থাক (একদিন না একদিন) মৃত্যু তোমাদের নাগাল পাবেই, চাই তোমরা সুরক্ষিত কোনোও দুর্গেই থাক না কেন।’ (সুরা নিসা, আয়াত: ৭৮)
মৃত্যু কোনো সংবাদপত্র নয়। ডাকপিয়নও নয়। সে সংবাদ না দিয়ে না জানিয়ে আসে। মুমিনের উচিত, মৃত্যুর জন্য সবসময় প্রস্তত থাকা। আল্লাহ বলেন, ‘প্রত্যেক সম্প্রদায়ের জন্য এক নির্দিষ্ট সময় আছে। যখন তাদের সেই নির্দিষ্ট সময় এসে পড়ে, তখন তারা এক মুহূর্তও বিলম্ব করতে পারবে না এবং এগিয়েও আনতে পারবে না।’ (সুরা আরাফ, আয়াত: ৩৪)
দেশের কোনো কোনো অঞ্চলের মানুষ মনে করেন, মৃতের বাড়িতে তিন দিন পর্যন্ত চুলা জ্বালানো নিষেধ। তাদের মতে, এতে অশুভ ও অকল্যাণ হতে পারে। প্রশ্ন হলো, ইসলামে এর কোনো ভিত্তি আছে কি না?
ইসলামি বিশেষজ্ঞদের মতে, ইসলামে কোনো কিছু থেকে কুলক্ষণ গ্রহণের সুযোগ নেই। স্বাভাবিক গৃহকর্মে আগুন জ্বালালে এতে কুলক্ষণের তো প্রশ্নই আসে না। মৃতের বাড়িতে মৃত্যুর দিন এবং পরের দুই দিন আগুন জ্বালানো যাবে না- এ ধারণা ঠিক নয়। এটি কুসংস্কার। ইসলামের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই।
মৃত ব্যক্তিকে গোসল দেওয়ার জন্য সাধারণত পানি গরম করা প্রয়োজন হয়। আগুন জ্বালানো নিষিদ্ধ হলে এই প্রয়োজন মেটানো অসম্ভব হতো। এতে বোঝা যায়, এ ধরনের কুসংস্কার কোনো ধর্মীয় ভিত্তি রাখে না।
কারও মৃত্যুতে ব্যক্তির পরিবার শোকাহত থাকে। সাধারণত পরিবারের সদস্যরা রান্না-বান্না করার মতো মানসিক অবস্থায় থাকে না। প্রতিবেশী এবং নিকটাত্মীদের উচিত, তাদের জন্য খাবারের ব্যবস্থা করা। তাদের পাশে দাঁড়ানো। হজরত মুহাম্মদ (সা.) মৃতের পরিবারের সদস্যদের জন্য খাবারের ব্যবস্থা করতে নির্দেশনা দিয়েছিলেন।
জাফর ইবনে আবু তালিব (রা.) মুতার যুদ্ধে শহীদ হন। এ সংবাদ মদিনায় পৌঁছালে হজরত মুহাম্মদ (সা.) বললেন, ‘তোমরা জাফরের পরিবারের জন্য খাবার রান্না করো। কেননা এ মুহূর্তে তারা এদিকে মনোযোগ দিতে পারবে না।’ (মুসনাদে আহমাদ, খণ্ড: ২, পৃষ্ঠা: ২০৫)
ঢাকা থেকে প্রকাশিত আবুল হাসান মুহাম্মাদ আবদুল্লাহ সম্পাদিত মাসিক আল-কাউসারে ‘প্রচলিত ভুল’ সাব-হেডের এক শিরোনামে লেখা হয়েছে, ‘মৃতের বাড়িতে মৃত্যুর দিন এবং পরবর্তী আরও দুই দিন আগুন জ্বালানো যাবে না- এ ধারণা ঠিক নয়। প্রয়োজনে যে কোনো সময় আগুন জ্বালানো যাবে। তা ছাড়া মৃতকে গোসল দেওয়ার জন্য সব অঞ্চলেই পানি গরম করার নিয়ম আছে। তখন এ কুলক্ষণের বিষয়টি কোথায় যাবে? এ কথা ঠিক যে, মৃতের পরিবার স্বজন হারানোর বেদনায় শোকাহত থাকার কারণে রান্নাবান্নার দিকে মনোযোগ দিতে পারে না। এ জন্য পাড়া-পড়শী ও দূর সম্পর্কের আত্মীয়-স্বজনকে পরিবারটির এক দিন একরাতের খাবারের আয়োজন করতে বলা হয়েছে।’ (রদ্দুল মুহতার, খণ্ড: ২, পৃষ্ঠা: ২৪০)
আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান শায়খ আহমাদুল্লাহ ইউটিউবে এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘মৃতের বাড়িতে তিন দিনের ভেতর চুলায় আগুন ধরানো যায় না- এটা কুসংস্কার। এ কথার কোনো ভিত্তি নেই। মৃতের বাড়িতে তিন দিন আগুন ধরানো যাবে না- ইসলামে এমন বাধ্যবাধকতা নেই। তবে এ সময় যেহেতু মৃতের পরিবার শোকার্ত থাকে, প্রতিবেশীদের কর্তব্য তাদের জন্য খাবার পাঠানো। শোকের দিনে তাদের পাশে দাঁড়ানো।’

