আয়াতুল কুরসির উচ্চারণ, অর্থ ও ফজিলত

মানুষ হিসেবে আমরা নানা রকম সমস্যায় জর্জরিত। আমরা দুনিয়া নিয়ে এত ব্যস্ত হয়ে পড়ি যে, আখেরাত ভুলে যায়। আল্লাহকে ভুলে যায়। নামাজ তেমন পড়া হয় না। অন্যান্য ইবাদতও তেমন করা হয় না। আমাদেরকে সবচেয়ে বেশি কুমন্ত্রণা দেয় শয়তান। শয়তানই ভালো কাজ থেকে আমাদের দূরে রাখে। এদিকে আবার দুষ্ট জিন আমাদের ক্ষতি করতে চায়। শারীরিকভাবে অসুস্থ করে ফেলতে চায়। কারও কারও জীবনকে একবারে ভেঙেচুরে ফেলে।
অপরদিকে আবার আমরা মুসলিম হিসেবে জান্নাতে যেতে যায়। জান্নাতই তো আমাদের আসল ঠিকানা। শয়নতান ও জিনের কুমন্ত্রণা থেকে বেঁচে থাকা এবং জান্নাতে যাওয়ার সহজ একটি আমল হলো আয়াতুল কুরসি পড়া।
কী আছে আয়াতুল কুরসিতে
সুরা বাকারার ২৫৫ নম্বর আয়াতের নাম আয়াতুল কুরসি। এটি কোরআনের সর্বশ্রেষ্ঠ আয়াত। এর মধ্যে ৫০টি শব্দ ও ১০টি বাক্য আছে। এ আয়াতে আল্লাহর একত্ববাদ, মর্যাদা ও গুণের বর্ণনা রয়েছে। এ আয়াত পাঠে অনেক ফজিলত আছে। আছে জান্নাতে যাওয়ার সুসংবাদ। এটি অভাব দূর হওয়ার পাথেয়। শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে বেঁচে থাকার পথ্য। হজরত মুহাম্মদ (সা.) একে কোরআনের শ্রেষ্ঠ আয়াত বলেছেন। তিনি এই আয়াত দিনে-রাতে পড়ার নির্দেশ দিয়েছেন।
আল্লামা ইবনে কাসির (রহ.)-এর বক্তব্য অনুসারে এই মহিমান্বিত আয়াতে দশটি স্বয়ংসম্পূর্ণ বাক্য রয়েছে। এই দশ বাক্যের মূল বিষয়বস্তু তাওহিদ বা একত্ববাদ। আল্লাহ তাআলার মহান গুণাবলি এ আয়াতে এমনভাবে বর্ণিত হয়েছে যে, তা উপলব্ধি করার পর মুমিনের সর্বসত্তা থেকে ওই পরম সত্যের ঘোষণাই উৎসারিত হয়, যার মাধ্যমে এই মহিমান্বিত আয়াতের সূচনা- اَللهُ لَاۤ اِلٰهَ اِلَّا هُوَ বা আল্লাহ-তিনি ছাড়া কোনো উপাসক নেই।
আয়াতুল কুরসি
ٱللَّهُ لَآ إِلَٰهَ إِلَّا هُوَ ٱلۡحَيُّ ٱلۡقَيُّومُۚ لَا تَأۡخُذُهُۥ سِنَةٞ وَلَا نَوۡمٞۚ لَّهُۥ مَا فِي ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَمَا فِي ٱلۡأَرۡضِۗ مَن ذَا ٱلَّذِي يَشۡفَعُ عِندَهُۥٓ إِلَّا بِإِذۡنِهِۦۚ يَعۡلَمُ مَا بَيۡنَ أَيۡدِيهِمۡ وَمَا خَلۡفَهُمۡۖ وَلَا يُحِيطُونَ بِشَيۡءٖ مِّنۡ عِلۡمِهِۦٓ إِلَّا بِمَا شَآءَۚ وَسِعَ كُرۡسِيُّهُ ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلۡأَرۡضَۖ وَلَا ئَُودُهُۥ حِفۡظُهُمَاۚ وَهُوَ ٱلۡعَلِيُّ ٱلۡعَظِيمُ
আয়াতুল কুরসির উচ্চারণ
আল্লাহু লা ইলাহা ইল্লা হুয়াল হাইয়ুল কাইয়ুম, তা তাখুজুহু সিনাতুও ওয়ালা নাওম। লাহু মা ফিস-সামা ওয়াতি ওয়া মা ফিল আরজ। মান জাল্লাজি ইয়াশফাউ ইনদাহু ইল্লা বি ইজনিহ, ইয়ালামু মা বাইনা আইদিহিম ওয়া মা খালফাহুম, ওয়া লা ইউহিতুনা বি শাইইম মিন ইলমিহি ইল্লা বিমা শাআ। ওয়া সিয়া কুরসিইহুস্ সামা ওয়াতি ওয়াল আরজ। ওয়া লা ইয়াউদুহ হিফজুহুমা ওয়া হুয়াল আলিইয়ুল আজিম।

আয়াতুল কুরসির অর্থ
আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো উপাস্য নেই। তিনি জীবিত, সবকিছুর ধারক। তাঁকে তন্দ্রাও স্পর্শ করতে পারে না এবং নিদ্রাও নয়। আসমান ও জমিন যা কিছু রয়েছে, সবই তাঁর। কে আছ এমন যে সুপারিশ করবে তাঁর কাছে তাঁর অনুমিত ছাড়া? দৃষ্টির সামনে কিংবা পেছনে যা কিছু রয়েছে, সে সবই তিনি জানেন। তাঁর জ্ঞানসীমা থেকে তারা কোনো কিছুকেই পরিবেষ্টিত করতে পারে না, কিন্তু যতটুকু তিনি ইচ্ছা করেন। তাঁর কুরসি (সিংহাসন) সমস্ত আসমান ও জমিনকে পরিবেষ্টিত করে আছে। আর সেগুলোকে ধারণ করা তাঁর পক্ষে কঠিন নয়। তিনিই সর্বোচ্চ এবং সর্বাপেক্ষা মহান।
শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে বাঁচা যায়
রাতে ঘুমানোর আগে আয়াতুল কুরসি পড়লে শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে বেঁচে থাকা যায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কেউ যদি রাতে শোয়ার সময় আয়াতুল কুরসি পাঠ করে, তাহলে সকাল পর্যন্ত আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে তার জন্য একজন হেফাজতকারী থাকে এবং শয়তান তার কাছে যেতে পারে না।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫০১০)
নিশ্চিত জান্নাত
ফরজ নামাজের পর আয়াতুল কুরসি পড়লে নিশ্চিত জান্নাতে প্রবেশ করা যায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে প্রত্যেক ফরজ নামাজের পর আয়াতুল কুরসি পাঠ করবে, তার জান্নাতে প্রবেশের পথে মৃত্যু ছাড়া আর কোনো অন্তরায় থাকবে না।’ (সুনানে নাসায়ি, হাদিস: ১৪৪৩)
জিন ক্ষতি করতে পারে না
সকাল ও সন্ধ্যায় আয়াতুল কুরসি পাঠ করলে জিনের ক্ষতি থেকে নিরাপদ থাকা যায়। হাদিসে আছে, ‘যে সকালে আয়াতুল কুরসি পাঠ করবে, সে সন্ধ্যা পর্যন্ত জিনের ক্ষতি থেকে হেফাজতে থাকবে। যে সন্ধ্যায় আয়াতুল কুরসি পাঠ করবে, সে সকাল পর্যন্ত জিনের ক্ষতি থেকে হেফাজতে থাকবে।’ (মুসতাদরাকে হাকিম, খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ৭৪৯)
আয়াতুল কুরসি পড়ার সময়
আয়াতুল কুরসি পাঠ করা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ আমল। এটি যেকোনো সময় পড়া যায়। তবে হাদিসে তিন সময়ে পাঠ করার বিষয়ে অধিক ফজিলতের কথা বর্ণিত হয়েছে। যেমন- ১. সকাল-সন্ধ্যায় পড়া। ২. ফরজ নামাজের পর পাঠ করা এবং ৩. রাতে ঘুমানোর আগে পড়া।
আয়াতুল কুরসি এত তাৎপর্যপূর্ণ কেন
- এতে আছে তাওহিদ বা একাত্ববাদের ঘোষণা, যা আল্লাহর একত্ববাদ প্রতিষ্ঠা করে।
- আল্লাহর হেফাজতের প্রতিশ্রুতি আছে, যা শয়তান ও অশুভ শক্তি থেকে মানুষকে রক্ষা করে।
- এটি পাঠ করলে আত্মার প্রশান্তি লাভ হয় এবং হৃদয়ে সান্তনা আসে।
- এটি পাঠকারীর জন্য জান্নাতের সুসংবাদ আছে।



