হজযাত্রায় মক্কার যেসব দর্শনীয় জায়গা দেখতে পাবেন

মক্কা পৃথিবীর প্রথম ও প্রাচীন নগরী। কাবাঘরকে ঘিরে গড়ে উঠেছে মক্কানগরী। এখানে জন্মগ্রহণ করেছেন হজরত মুহাম্মদ (সা.)। তাঁর বংশের পূর্বপুরুষরা শত শত বছর ধরে এখানে বসবাস করতেন। এখানে আছে ইসলাম ধর্মের অনেক নিদর্শন।
পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে হজ পালন করতে সৌদি আরবের মক্কায় যাচ্ছেন মুসলিমরা। এর মধ্যে অনেকেই সেখানে অবস্থান করছেন। প্রায় হজযাত্রী মক্কার বিভিন্ন দর্শনীয় জায়গা ঘুরে দেখতে চান। এখানে মক্কায় কয়েকটি দর্শনীয় জায়গার পরিচিত তুলে ধরা হলো—
কাবাঘর: পৃথিবীর প্রথম ঘর। এই ঘরকে ঘিরে মক্কা নগরী গড়ে উঠেছে। হজ-ওমরাহর মূল আকর্ষণ বায়তুল্লাহ বা কাবাঘর। এ কাবাঘর প্রথম ফেরেশতারা নির্মাণ করেন। পরবর্তীতে আদম (আ.) আবার নির্মাণ করেন। নুহের (আ.) যুগে বন্যার সময় তা ধ্বংস হয়ে গেলে আল্লাহর নির্দেশে হজরত ইবরাহিম (আ.) তার পুত্র হজরত ইসমাইলকে সঙ্গে নিয়ে তা পুনঃনির্মাণ করেন। ইসলাম আবির্ভাবের কিছু পূর্বে এটি আরেকবার কুরাইশদের মাধ্যমে পুনর্নির্মাণ করা হয়। সে সময় হজরত মুহাম্মদও (সা.) এতে অংশ নিয়ে ছিলেন। সবশেষ কাবাঘর নির্মাণ পুনর্নির্মাণ করা হয়েছে আবদুল্লাহ ইবনে জুবায়েরের (রা.) শাসনামলে। এরপর থেকে এ পর্যন্ত বড় ধরনের কোনো পরিবর্তন না হলেও ছোটখাট নানা সংস্কারের কাজ হয়েছে।
সাফা-মারওয়া পাহাড়: মক্কা পাহাড়ের শহর। কাবাঘর থেকে পূর্ব দিকে দুটি উঁচু পাহাড় পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে। পূর্বদিকে দাঁড়িয়ে কাবার দিকে তাকালে বামের পাহাড়টি সাফা আর ডানেরটি মারওয়া পাহাড়। হাজেরা (আ.) তাঁর ছেলে ইসমাইলকে (আ.) রেখে পানির সন্ধানে সাফা ও মারওয়া পাহাড় দুটিতে দৌড়াদৌড়ি করেছিলেন।
মাকামে ইবরাহিম: ইবরাহিম (আ.) ও তাঁর ছেলে ইসমাইল (আ.) আল্লাহর নির্দেশে কাবাঘর নির্মাণ শুরু করেন। স্বাভাবিকভাবে মাটিতে দাঁড়িয়ে কাবার দেওয়াল যে পর্যন্ত নির্মাণ করা যাচ্ছিল ইবরাহিম (আ.) তা করলেন। এবার দরকার হলো উঁচুতে দাঁড়াবার। তখন ইসমাইল (আ.) একটি পাথর নিয়ে এলেন—যেটি ছিল আশ্চর্য এক পাথর। এ পাথরটিতে দাঁড়িয়ে ইবরাহিম (আ.) কাবাঘরের উঁচু দেওয়ালগুলো নির্মাণ করতে লাগলেন। আল্লাহর কুদরতে এ পাথরটিতে দাঁড়ানোর পর কাজের সুবিধা মতো এটি উঁচু-নিচু হতে থাকল। অনেকটা বর্তমান যুগের লিফটের মতো। দীর্ঘ সময় কাজ করায় ইবরাহিম (আ.)-এর পায়ের দাগ পড়ে যায় এতে। কাবা নির্মাণের এই খেদমত আল্লাহ পাক এতটাই পছন্দ করেন যে, ইবরাহিমের (আ.) পায়ের ছাপসংবলিত সেই পাথরখণ্ড কেয়ামত পর্যন্ত দর্শনার্থীদের জন্য রেখে দিয়েছেন।
হাতিমে কাবা: কাবাঘরের পাশে ধনুকের মতো যে জায়গাটি রয়েছে, এর নাম হাতিমে কাবা। একে হিজরও বলা হয়ে থাকে। এ জায়গাটুকু কাবাঘরের অংশ ছিল। কুরাইশরা যখন কাবাঘর পুনর্নির্মাণ করছিলেন, তখন অর্থ সংকটের কারণে তারা এ জায়গাটুকু বাদ দিয়ে কাবাঘর পুনর্নির্মাণ করল। এ অংশটুকু বাদ পড়ায় নাম হলো হিজর বা হাতিমে কাবা।
হাজরে আসওয়াদ: কাবার কোণে লাগানো জান্নাতি পাথরের নাম ‘আল হাজরুল আসওয়াদ’। বাংলায় বলা হয় কালো পাথর। তাওয়াফ করার সময় এই পাথরকে স্পর্শ করা ও চুমো দেওয়ার প্রতি উৎসাহ প্রদান করা হয়েছে হাদিসে। এই পাথরটি জান্নাত থেকে নেমে আসে। তখন এটি সাদা পাথর ছিল। পরবর্তীতে রং বদলে কালো হয়ে যায়।
জমজম কূপ: জমজম কূপ পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ কূপ। শিশু ইসমাইলের (আ.) পায়ের আঘাতে তৈরি হওয়া পানির এই ফল্গুধারা ধীরে ধীরে কূপে রূপান্তরিত হয়। এই কূপ কাবাঘরের পূর্ব-দক্ষিণে অবস্থিত। হাজরে আসওয়াদ থেকে পূর্ব দিকে আর মাকামে ইবরাহিম থেকে দক্ষিণ দিকে। সাম্প্রতিক সময়ে তাওয়াফের সুবিধার্থে, জমজম পাড়ে লোকদের ভিড় ঠেকাতে কূপটির ওপর দিক থেকে ছাদ করে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এখন এটি মাতাফের অংশ হয়ে গেছে।
জান্নাতুল মোয়াল্লা: জান্নাতুল মোয়াল্লা মক্কার ঐতিহাসিক ও প্রাচীন একটি কবরস্থান। এর অবস্থান মসজিদুল হারামের পূর্ব দিকে। ঐতিহাসিকদের ভাষ্য অনুযায়ী, এখানেই শুয়ে আছেন প্রিয় নবীর (সা.) প্রিয় স্ত্রী সাইয়েদা খাদিজাতুল কোবরা (রা.)।
মিজাবে রহমত: বায়তুল্লাহর উত্তর দিকের ছাদে (হাতিমের মাঝ বরাবর) যে নালা বসানো আছে, তাকে ‘মিজাবে রহমত’ বলা হয়। এই নালা দিয়ে ছাদের বৃষ্টির পানি পড়ে।
জাবালে নুর: মক্কায় কাবা শরিফের কাছেই জাবালে নুর বা হেরা পর্বত। এ পর্বতে ওঠানামা বেশ কঠিন। রাসুলুল্লাহ (সা.) নিয়মিত এ পর্বতে ওঠানামা করতেন। তিনি এ পাহাড়ে ধ্যান করতেন। পবিত্র কোরআন প্রথম নাজিল হয়েছিল এখানে। পাহাড়ে কিছু অংশে পাকা সড়ক রয়েছে। গাড়ি সে পর্যন্ত যায়। এরপর শুরু হয়েছে পাহাড় কেটে তৈরি সিঁড়ি। জাবালে নুরের উচ্চতা ৫৬৫ মিটার বা আধা কিলোমিটারের বেশি। পাকা সড়ক পর্যন্ত দুপাশে দোকানপাট ও বাড়িঘর গড়ে উঠেছে।
জাবালে সাওর: জাবালে সাওর কাবা শরিফ থেকে প্রায় তিন মাইল দূরে। মক্কা থেকে মদিনায় যাওয়ার পথে শত্রুর হাত থেকে বাঁচতে হজরত আবু বকরকে (রা.) নিয়ে এই পাহাড়ের গুহায় আশ্রয় নিয়েছিলেন রাসুলুল্লাহ (সা.)।
মসজিদে জিন: জান্নাতুল মুয়াল্লা কবরস্থানের কাছে মসজিদে জিন। সহিহ হাদিস থেকে জানা যায়, জিনরা এখানে রাসুলুল্লাহর (সা.) কাছে একাধিকবার এসেছেন। তাঁর কণ্ঠে পবিত্র কোরআনের তেলাওয়াত শুনে তাঁর প্রতি ইমান এনেছেন।
জিরানা মসজিদ: মসজিদে হারাম থেকে ১৬ কিলোমিটার পূর্বে হুনায়েনের পথে অবস্থিত জিরানা উপত্যকায়। ৮ হিজরির জিলকদ মাসে হুনায়েনের যুদ্ধে বিজয় লাভের পর এ স্থানে রাসুলুল্লাহ (সা.) যুদ্ধলব্ধ গনিমতের মালামাল বণ্টন করেছিলেন।
মসজিদে আয়েশা: এটিকে মসজিদে তানয়িমও বলা হয়। কাবা শরিফ থেকে ৬ কিলোমিটার উত্তরে মক্কা-মদিনা রোডে (আল-হিজরাহ রোড) অবস্থিত এ মসজিদটি।
আরাফার ময়দান: আদম (আ.) ও হাওয়ার (আ.) স্মৃতিবিজড়িত স্থান আরাফাতের ময়দান। মক্কা থেকে ১৫ কিলোমিটার নিকটবর্তী সুবিশাল আরাফার ময়দান মুখরিত ও প্রকম্পিত করে বিশ্বের লাখ লাখ মুমিন বান্দা পবিত্র হজ পালন করেন।
জাবালে রহমত: আরাফার ময়দানে অবস্থিত। এ পাহাড়ে সর্বপ্রথম নবী আদমের (আ.) দোয়া কবুল হয়। এখানে তিনি হাওয়ার (আ.) সাক্ষাৎ পান। নবী (সা.) বিদায় হজের ভাষণ এখান থেকেই দিয়েছিলেন।
মুজদালিফা: মুজদালিফায় অবস্থান করা হাজির জন্য ওয়াজিব। ৯ জিলহজ রাতে আরাফা ময়দান থেকে ফিরে মুজদালিফায় অবস্থান করা আবশ্যক। এখানে রয়েছে ঐতিহাসিক ও তাৎপর্যময় মসজিদ। যার নাম মসজিদে মাশআরে হারাম।
মসজিদে নামিরা: আরাফার ময়দানের পশ্চিম সীমানায় অবস্থিত মসজিদে নামিরা। রাসুলুল্লাহ (সা.) হজ পালনের সময় মসজিদের এ স্থানেই নামাজের ইমামতি করেন। মসজিদটির বর্তমান আয়তন ১ লাখ ১০ হাজার বর্গমিটার। এ মসজিদের প্রান্তে এসেই শেষ হয়েছে আরাফার পশ্চিম সীমানা।
মিনা প্রান্তর: মক্কা থেকে ৫-৬ কিলোমিটার দূরের খোলা ময়দান হলো মিনা প্রান্তর। এখানে অবস্থানের মাধ্যমে হজ কার্যক্রম শুরু হয়। এখানে অবস্থান করেই শয়তানকে উদ্দেশ্য করে কঙ্কর নিক্ষেপ করতে হয়।
মসজিদে খায়েফ: মসজিদে খায়েফ তাঁবুর শহর মিনার অন্যতম আকর্ষণ ও বরকতের জায়গা। অধিকাংশ ইসলামি চিন্তাবিদদের মতে, এ মসজিদে ৭০ জন নবী নামাজ আদায় করেছেন।
মক্কা জাদুঘর: মক্কার প্রাচীন চিত্র ও অবস্থান সম্পর্কে সঠিক ধারণা পেতে মক্কা জাদুঘর পরিদর্শন করা জরুরি। হারাম শরিফ থেকে অল্প দূরে আন্তর্জাতিক ইসলামি সংস্থা ‘রাবেতায়ে আলমে ইসলামি’র কেন্দ্রীয় অফিসের বিপরীতে এই জাদুঘরটি অবস্থিত। জাদুঘরে মক্কা নগরীর ঐতিহাসিক ও প্রাচীন নানা ধরনের জিনিসপত্র রয়েছে।


