কন্যাসন্তান আল্লাহর রহমত ও পুরস্কারপ্রাপ্ত বান্দা যারা

আজ খতমে তারাবিতে পবিত্র কোরআনের ২৫তম পারা তেলাওয়াত করা হবে। সুরা হামিম সিজদার ৪৭ থেকে সুরা শুরা, সুরা জুখরুফ, সুরা দুখান ও সুরা জাসিয়া পড়া হবে। আজকের তারাবিতে গুনাহের কারণে বিপদ, অবাধ্য জাতির পরিণতি, আল্লাহর অনুগ্রহ, জান্নাত-জাহান্নাম, মানুষের অকৃতজ্ঞতা, সৃষ্টি জগতে আল্লাহর নিদর্শন, নারীর সম্মান এবং কন্যা সন্তান আল্লাহর নেয়ামত, আল্লাহর ইচ্ছায় মানুষের সন্তান লাভ, আল্লাহর ওয়াদা, সব নবী-রাসুলের ধর্ম ইসলাম, জাহেলি যুগের ঘৃণ্য প্রথা, আল্লাহর রহমত, আরবি ভাষায় কোরআন নাজিল ইত্যাদি বিষয় আলোচিত হয়েছে।
সৃষ্টির মধ্যে স্রষ্টার পরিচয়
সুরা হামিম সেজদার ৫৩ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আমি তাদের আমার নিদর্শনাবলি দেখাব দূর-দিগন্তে (অর্থাৎ দূর পর্যন্ত ইসলামের আলো বিচ্ছুরিত হবে) আর তাদের নিজেদের মধ্যেও (অর্থাৎ কাফেররা নতজানু হয়ে ইসলাম কবুল করবে) যখন তাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে যাবে যে, এ কোরআন সত্য। এটা কি যথেষ্ট নয় যে, তোমার প্রতিপালক সব কিছুরই সাক্ষী।’ এই আয়াতের উদ্দেশ্য হচ্ছে, বিশ্বজগতের ছোট-বড় সৃষ্টি তথা আকাশ, পৃথিবী ও এতদুভয়ের মধ্যবর্তী যে কোনো বস্তুর প্রতি তাকালে তা আল্লাহর অস্তিত্ব, তাঁর সর্বব্যাপী জ্ঞান ও কুদরত এবং তাঁর একত্বের সাক্ষ্য দেয়। এর চেয়ে আরও নিকটবর্তী বস্তু স্বয়ং মানুষের প্রাণ ও দেহ। তার একেকটি অঙ্গ এবং তাতে কর্মরত সূক্ষ্ম ও স্পর্শকাতর যন্ত্রপাতির মধ্যে তার আরাম ও সুখের বিস্ময়কর ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এসব যন্ত্রপাতিকে এমন মজবুত করা হয়েছে, ৭০-৮০ বছর পর্যন্তও ক্ষয়প্রাপ্ত হয় না। মানুষের গ্রন্থিসমূহে যে স্প্রিং লাগানো হয়েছে, তা মানুষের তৈরি হলে ইস্পাত-নির্মিত স্প্রিংও ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে খতম হয়ে যেত। মানুষের হাতের চামড়া এবং তাতে অঙ্কিত রেখাও সারাজীবনে ক্ষয়প্রাপ্ত হয় না। এসব ব্যাপারে যদি সামান্য জ্ঞান-বুদ্ধিসম্পন্ন ব্যক্তিও চিন্তাভাবনা করে, তবে সে এ বিশ্বাসী হতে বাধ্য হবে যে, তার অবশ্যই একজন স্রষ্টা ও প্রতিষ্ঠাতা আছেন। যার জ্ঞান ও কুদরত অসীম এবং যার কোনো সমকক্ষ হতে পারে না। (৩০ মজলিসে কোরআনের সারনির্যাস, পৃষ্ঠা: ২৬৭)
যারা পাবেন আল্লাহর পুরস্কার
মক্কায় অবতীর্ণ সুরা শুরার আয়াত সংখ্যা ৫৩। এটি কোরআনের ৪২তম সুরা। এ সুরার ৩৬ থেকে ৪০ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা এমন কিছু গুণের কথা বলেছেন, যাদের মধ্যে এ গুণগুলো থাকবে, তাদের তিনি বিশেষ পুরস্কার দেবেন। যেমন—
আল্লাহর সেরা উপহার সন্তান
সন্তান আল্লাহর সেরা উপহার। কারও একসঙ্গে দুই সন্তান হচ্ছে। কারও ছেলে, কারও মেয়ে। কারও উভয়টিই ছেলে কিংবা বিপরীত। কেউ আবার নিঃসন্তান। মানুষের মধ্যে এই পার্থক্য আল্লাহর নিদর্শন। আল্লাহর নির্ধারিত এই বৈচিত্র্য পরিবর্তনের ক্ষমতা কারও নেই। আল্লাহ বলেন, ‘তিনি যাকে ইচ্ছা সৃষ্টি করেন, যাকে ইচ্ছা কন্যাসন্তান এবং যাকে ইচ্ছা পুত্রসন্তান দান করেন। অথবা তাদের দান করেন পুত্র ও কন্যা উভয়ই এবং যাকে ইচ্ছা বন্ধ্যা করে দেন।’ (সুরা শুরা, আয়াত : ৪৯-৫০)
কন্যাসন্তান আল্লাহর রহমত
জাহেলি যুগে মেয়ে হলে বাবাদের মুখ কালো হয়ে যেত। মেয়েকে জীবত পুঁতে ফেলত। ইসলাম এমন ঘৃণ্য কাজকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। নারীকে সম্মানের আসনে বসিয়েছে। মেয়েসন্তানের বাবা-মার জন্য অসংখ্য ফজিলতের ঘোষণা করা হয়েছে।
এখনও দেখা যায়, মেয়ে হলে অনেকেই মন খারাপ করে। ছেলে না হওয়ায় স্ত্রীকে নানা কথা শোনায়। বিপরীতে ছেলে হলে আনন্দের মিছিল পড়ে যায়। এই বৈষম্য স্পষ্ট গুনাহ। মেয়েসন্তান আল্লাহর অনন্য নেয়ামত। হজরত মুহাম্মদ (সা.) মেয়েদের অনেক বেশি ভালোবাসতেন। আল্লাহ বলেন, ‘তাদের কাউকে যখন সংবাদ দেওয়া হয় সেই সন্তানের (মেয়ে), যা তারা দয়াময় আল্লাহর প্রতি আরোপ করে, তখন তার মুখমণ্ডলে কালিমা ছেয়ে যায়, আর মন দুঃখ-বেদনায় ভরে যায়।’ (সুরা জুখরুফ, আয়াত: ১৭)
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে দুটি মেয়েকে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া পর্যন্ত লালন-পালন করবে, কিয়ামতের দিন আমি এবং সে এ দুটি আঙুলের মতো পাশাপাশি আসব (অতঃপর তিনি তার আঙুলগুলো মিলিত করে দেখালেন)।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৬৩১)
সুরা দুখানের বিষয়বস্তু
৫৩ আয়াত বিশিষ্ট সুরা দুখান মক্কায় অবতীর্ণ। এটি কোরআনের ৪৪তম সুরা। দুখান অর্থ ধোঁয়া। মক্কার মুশরিকরা দুর্ভিক্ষের দিনে যে ধোঁয়াচ্ছন্ন অবস্থা দেখতে পেয়েছিল, ১০ নম্বর আয়াতে তার বিবরণ রয়েছে। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে এটিকে সুরা দুখান বলা হয়।
এ সুরায় কোরআন নাজিলের ঘটনা, কোরআনের মহত্ত্ব, আল্লাহর একত্ববাদ ও সৃষ্টি জগতে আল্লাহর মহত্ত্বের নানা নিদর্শন, মুসা (আ.)-এর বিরুদ্ধাচরণে বনি ইসরাইলের পরিণাম, কাফেরদের পরিণতি ও শাস্তি, সৃষ্টি জগতের অস্তিত্ব উদ্দেশ্যবিহীন না হওয়া, কিয়ামতের দিন বন্ধু বন্ধুর উপকারে না আসা, কোরআন ও পুনরুত্থান দিবস সম্পর্কে কাফেরদের সন্দেহ, দোজখবাসীর শাস্তি এবং খোদাভীরুদের পুরস্কার বেহেশত সম্পর্কে আলোচনা রয়েছে।
ভয়ে হাঁটু গেড়ে বসে থাকা
সুরা জাসিয়া মক্কায় অবতীর্ণ। এর আয়াত সংখ্যা ৩৭টি। ‘জাসিয়া’ শব্দের অর্থ হাঁটু গেড়ে বসা। কিয়ামতের দিন মানুষ ভয়ে আল্লাহর দরবারে হাঁটু গেড়ে বসে পড়বে। সুরায় এ ভয়ানক অবস্থার বর্ণনা থাকার কারণে এটিকে জাসিয়া বলা হয়।
কাফেরদের পরিণাম, সৃষ্টিজগতের নিদর্শন, বনি ইসরাইলকে দেওয়া আল্লাহর নেয়ামত, নেয়ামতের কদর না করায় তাদের ওপর শাস্তি ও কিয়ামত ইত্যাদি বিষয়ের আলোচনা রয়েছে এ সুরায়।