logo

মুসলমানদের বিস্ময়কর ৮ আবিষ্কার 

মুসলমানদের বিস্ময়কর ৮ আবিষ্কার 

মানবসভ্যতার ইতিহাসে বহুদূর এগিয়েছে বিজ্ঞান—আবিষ্কার করছে নতুন সৃষ্টি ও তথ্য। এর নেপথ্যে মুসলিম বিজ্ঞানীদের অবদান অপরিসীম। বিশ্বব্যাপী আধুনিক সভ্যতার যত বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার আজ দৃশ্যমান, প্রায় সব আবিষ্কারের জনক বা কারিগর মুসলিমরা। বিজ্ঞানের বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাদের নিজস্ব ধ্যান-ধারণা সভ্যতার বিকাশকে করেছে আরও গতিশীল ও বেগবান। রসায়ন, পদার্থ, জীববিজ্ঞান, কৃষি, চিকিৎসা, জ্যোতির্বিজ্ঞান, দর্শন, ইতিহাস—সব জায়গায় ছিল তাদের অগ্রণী পদচারণা। জাবির ইবনে হাইয়ান, ইবনে সিনা, ইবনে রুশদ, আল বিরুনি, মুসা খাওয়ারিজি, আল কিন্দি, ইবনে হাইসাম, আল রাজি, বানু মুসার নাম ইতিহাসের সোনালি অক্ষরে ভাস্বর হয়ে আছ।

আজকের পৃথিবীতে বহুল ব্যবহৃত অনেক কিছুই মুসলিম বিজ্ঞানীদের আবিষ্কার। এখানে বিস্ময়কর আটটি আবিষ্কারের গল্প তুলে ধরা হলো—

হাসপাতাল
মানবজীবনের গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হাসপাতাল। রোগ হলেই শরণাপন্ন হতে হয় চিকিৎসকের। যেতে হয় হাসপাতালে। উন্নত চিকিৎসার জন্য থাকতে হয় সেখানে। পৃথিবীতে এক সময় এমন ব্যবস্থা ছিল না, যেখানে গিয়ে চিকিৎসা নেওয়া যায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) প্রথম হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর হাসপাতাল ছিল অস্থায়ী। যুদ্ধের ময়দানে অসুস্থ বা জখম হওয়া ব্যক্তিদের জন্য তাঁবু করে সেখানে তাদের রোগ নিরাময়ে ওষুধ ব্যবহার ও সেবা-যত্ন করতেন। সাহাবিদের দিয়ে অসুস্থদের সেবা করাতেন।

৮০৫ সালে বাগদাদে প্রতিষ্ঠিত হয় একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র। এটিকে বিশ্বের প্রথম হাসপাতাল বলা হয়। নাম ‘বিমারিস্তান’। এটি আব্বাসীয় খলিফা হারুন আল-রশিদের শাসনামলে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।

৮৭২ সালে মিসরের রাজধানী কায়রোতে প্রথম হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা হয়। নাম রাখা হয় ‘আহমদ ইবনে তুলুন হাসপাতাল’। প্রতিষ্ঠা করেন আহমদ ইবনে তুলুন। তিনি ছিলেন তুলুনিদ সাম্রাজ্যের শাসক। পরে বাগদাদে নতুনভাবে উন্নত ব্যবস্থাপনায় আরও কিছু হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা হয়। এভাবে ধীরে ধীরে গোটা বিশ্বে হাসপাতাল ব্যবস্থা চালু হয়।

আহমদ ইবনে তুলুন মসজিদ, মিশর। ছবি : সংগৃহীত

বিশ্ববিদ্যালয়
পৃথিবীর প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা লাভ এবং সনদ প্রদানের কার্যক্রম সূচিত হয়েছে মুসলিমদের হাত ধরেই। মরক্কোর ফেজে ৮৫৯ সালে ফাতিমা আল-ফিহরিয়া প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করেন। ইতিহাস বলে, সর্বপ্রথম এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সনদ প্রদানের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। পরে তার বোন মরিয়াম বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশেই একটি মসজিদ প্রতিষ্ঠা করেন। এরপর পুরো কমপ্লেক্সটির নাম হয় ‘আল-কারাউইয়িন বিশ্ববিদ্যালয়’। এটি আজও সক্রিয়। 

অস্ত্রোপচার
মুসলিম চিকিৎসক আবুল কাসেম খালাফ ইবনে আল-আব্বাস আল-জাহরাভিকে ‘আধুনিক অস্ত্রোপচারের জনক’ বলা হয়। মধ্যযুগীয় মুসলিম বিশ্বের সবচেয়ে মহৎ শল্যবিদ তিনি। তিনি ২০০টির বেশি অস্ত্রোপচারের যন্ত্র উদ্ভাবন করেন, যার মধ্যে ছিল বিভিন্ন ধরনের স্ক্যালপেল ও রিট্র্যাক্টর। চিকিৎসাবিজ্ঞানের নবদিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে তার লিখিত ‘কিতাবুল তাসরিফের’ (The Method of Medicine) মাধ্যমে। এটি ছিল চিকিৎসাসংক্রান্ত ৩০ খণ্ডের বিশ্বকোষ।

ক্যামেরা
বর্তমানে ক্যামেরা বহুল ব্যবহৃত এবং জনপ্রিয়। মধ্যযুগীয় গণিতজ্ঞ হাসান ইবনে আল-হায়সাম বিশ্বে প্রথম ক্যামেরার ধারণা দেন। তিনি প্রথম সঠিকভাবে ব্যাখ্যা করেন, দৃষ্টি মস্তিষ্কে সংঘটিত হয় এবং আলো বস্তু থেকে চোখে আসে, চোখ থেকে আলো বের হয় না। সূর্যগ্রহণ পর্যবেক্ষণের জন্য স্ক্রিন ব্যবহার করে এর প্রথম প্রযুক্তিগত প্রয়োগ করেন তিনি। তবে তখনো পূর্ণাঙ্গ ক্যামেরা আবিষ্কার হয়নি। কেটে যায় বহু বছর। বিজ্ঞানীরা ক্যামেরায় নিয়ে আসেন নতুন নতুন ফিচার। ১৯৭৫ সালে কোডাকের স্টিভেন স্যাসোন প্রথম ডিজিটাল ক্যামেরা সামনে নিয়ে আসেন। 

কফি
কফি ছাড়া অনেকের সকাল হয় না। কারও আবার কাজে মন বসে না কফি ছাড়া। অনেকের চিন্তার উন্নয়ন বা আইডিয়া তৈরির সঙ্গী কফি। এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, সারা বিশ্বে প্রতিদিন প্রায় ১৬০ কোটিরও বেশি কাপ কফি বিক্রি হয়। নবম শতকের দিকে ইয়েমেনের মুসলিমরা প্রথম কফি চাষ ও উৎপাদন শুরু করেন। 

আধ্যাত্মিক সাধনায় নিমগ্ন সুফিরা রাত জেগে ইবাদত করতেন। ঘুম কাটাতে তারা কফি পান করতেন। এরপর একদল শিক্ষার্থীর মাধ্যমে মিসরের রাজধানী কায়রোতে কফি পৌঁছায়। সেখানে শুরু হয় কফি চাষ। পরে ধীরে ধীরে সমগ্র বিশ্বে কফি উৎপাদন ছড়িয়ে পড়ে।

bigStoryContent
ছবি : সংগৃহীত

মিসওয়াক
দাঁতের যথাযথ যত্ন ও পরিচর্যা না নিলে মুখে যেমন দুর্গন্ধের সৃষ্টি হয়, তেমনি অসময়ে পড়ে যাওয়ার শঙ্কা থাকে। দাঁতের পরিচর্যায় মিসওয়াক ব্যবহারের প্রথম ধারণা দিয়েছেন প্রিয় নবী মুহাম্মদ (সা.)। তিনি গাছের ডাল দিয়ে মিসওয়াক করে দাঁত পরিষ্কার রাখতেন। সাহাবিদেরও মিসওয়াক করতে বলতেন। তাঁর সেই আবিষ্কারের ওপর নির্ভর করে মিসওয়াক আজ রূপ নিয়েছে ব্রাশে। 

 

চশমায় পরিবর্তন
চশমার ক্ষেত্রেও বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছেন মুসলিমরা। বসরা নগরীর বিখ্যাত মুসলিম পণ্ডিত আলহাজেন প্রথম চোখের গঠন প্রণালি এবং চোখের কাজ নিয়ে বর্ণনা করেন। চোখের দৃষ্টি রশ্মির সঙ্গে পারিপার্শ্বিক অনুভূতি নেই বলে তিনিই প্রথম পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে প্রমাণ করেন। বাঁকানো কাচের পৃষ্ঠতল চোখের দৃষ্টি সহায়ক হিসেবে বিবর্ধনের জন্য ব্যবহার করা যেতে পারে, এর ধারণা তিনি দেন। 

bigStoryContent
ছবি : সংগৃহীত

বীজগণিত
বিজ্ঞানের মূলকাঠি হলো গণিত। সর্বপ্রথম গণিতের ধারণা দেন হজরত দাউদ (আ.)। এক, দুইয়ের গণনা তাঁরই চিন্তার ফসল। বীজগণিতের প্রথম আবিষ্কারক পার্সিয়ার বিখ্যাত মুসলিম গণিতবিদ আবু আবদুল্লাহ মুহাম্মদ ইবনে মুসা আল খাওয়ারিজি। প্রথম তিনি বীজগণিতের ওপর একটি বই লিখেন। এরপর সপ্তম শতকে তিনি রচনা করেন দ্বিতীয় গ্রন্থ ‘আল-জাবর ওয়াল মুকাবলা’। তার রচিত এই বইটি থেকেই মূলত এই শাস্ত্রের নাম হয় অ্যালজেবরা বা বীজগণিত।