নারীর সুরক্ষায় যে নির্দেশনা দিয়েছে ইসলাম

ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে নারী যেখানে শোষণ, বঞ্চনা ও নিরাপত্তাহীনতার শিকার হয়েছে, সেখানে ইসলাম নারীকে মা, স্ত্রী, কন্যা ও বোন—প্রতিটি পরিচয়ে সম্মান ও অধিকার দিয়েছে। একইসঙ্গে নারী যেন সামাজিক, পারিবারিক ও নৈতিকভাবে নিরাপদ জীবনযাপন করতে পারে, সে লক্ষ্যে এমন সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা দিয়েছে, যা ইসলামের নারীবান্ধব ও কল্যাণকর দৃষ্টিভঙ্গিই স্পষ্ট করে।
ইসলামে নারীর মর্যাদা রক্ষার পাশাপাশি তার শারীরিক, নৈতিক ও সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ইসলামের নারীর সুরক্ষা-ভাবনা কোনো সীমাবদ্ধতা আরোপের উদ্দেশ্যে নয়; বরং নারী যেন সম্ভাব্য অনাচার, নিপীড়ন ও অবক্ষয় থেকে নিরাপদ থাকতে পারে, সেই কল্যাণমুখী লক্ষ্যেই এসব বিধান প্রণীত।
নিজ ঘরই সর্বোত্তম মসজিদ
নারীদের জন্য ঘরের অভ্যন্তরে নামাজ আদায় করাই উত্তম। ঘরই তাদের সর্বোত্তম মসজিদ। নারীদের ওপর জুমা ও ঈদের নামাজ অপরিহার্য নয়। মসজিদে গিয়ে জামাতে নামাজ আদায় করাও তাদের জন্য জরুরি নয়। তবে মসজিদে গিয়ে নামাজ আদায় করতে কোনো অসুবিধে নেই। নিরাপত্তার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা থাকলে মসজিদে জামাতের সঙ্গে নামাজ আদায় করা যেতে পারে। উম্মে সালমা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘নারীদের সর্বোত্তম মসজিদ তাদের ঘরের একান্ত জায়গা।’ (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস : ২৬৫৮৪)। তবে পর্দার সঙ্গে মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়তে কোনো অসুবিধে নেই।
আবৃত হয়ে বের হওয়া
মানুষের নানারকম প্রয়োজন থাকে। চাইলেই সারাক্ষণ ঘরে থাকা যায় না। প্রয়োজনে বের হতেই হয়। সেক্ষেত্রে ঢিলেঢালা ও শালীন পোশাক পরে আবৃত হয়ে বের হতে হবে। এটিই ইমানের পরিচায়ক এবং সুরক্ষার অন্যতম সহায়ক। আল্লাহ বলেন, ‘হে নবী, তুমি তোমার স্ত্রীদের, মেয়েদের ও মুমিন নারীদের বলো, তারা যেন তাদের চাদরের কিছু অংশ নিজেদের ওপর টেনে দেয়। এতে তাদেরকে চেনা সহজতর হবে, ফলে তাদের উত্ত্যক্ত করা হবে না। আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ (সুরা আহজাব, আয়াত : ৫)। আরেক জায়গায় বলেন, ‘তারা যেন যা সাধারণত প্রকাশ থাকে, তা ছাড়া তাদের সৌন্দর্য প্রদর্শন না করে। তাদের গলা ও বুক যেন মাথার কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখে।’ (সুরা নুর, আয়াত : ৩১)
মাহরাম ছাড়া ভ্রমণ না করা
ভ্রমণকালে সুরক্ষা নিশ্চিতে ভ্রমণে নারীর সঙ্গে মাহরাম (যাদের সঙ্গে বিয়ে নিষিদ্ধ) থাকা অপরিহার্য করেছে ইসলাম। যেন সফরে মাহরাম পুরুষ নারীকে দুশ্চরিত্র লোকদের থেকে নিরাপদ রাখতে পারে এবং নারীর প্রয়োজনে তাকে সহযোগিতা করতে পারে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে নারী আল্লাহ ও আখেরাতের প্রতি ইমান রাখে, তার জন্য বৈধ নয়, মাহরাম ছাড়া এক দিন ও এক রাতের দূরত্ব সফর করা।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১০৮৮)
পর-পুরুষের সঙ্গে অবস্থান না করা
মাহরাম নয়—এমন নারী-পুরুষ নির্জন জায়গায় একান্তে অবস্থান করা নিষেধ। অল্প সময়ের জন্য হলেও এমন অবস্থান থেকে বিরত থাকতে হবে। নিজের সুরক্ষার জন্যই এসব পরিবেশ এড়িয়ে চলতে হবে। উকবা ইবনে আমের (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা নারীদের কাছে প্রবেশ করা থেকে বিরত থাকো। এক আনসারি সাহাবি বলল, হে আল্লাহর রাসুল, দেবরের বিষয়ে কী বলেন। তিনি বললেন, দেবর তো মরণ। আরেক হাদিসে নবী (সা.) বলেছেন, ‘যখনই কোনো পুরুষ কোনো নারীর সঙ্গে একান্তে গোপনে অবস্থান করে, তখনই শয়তান তাদের সঙ্গী হয়।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস : ১১৭১)
পর-পুরুষের কাছে সৌন্দর্য প্রকাশ না করা
নারীর সৌন্দর্যের প্রতি পুরুষ আকর্ষিত হয়। তাই মাহরাম ছাড়া অন্য পুরুষের কাছে নিজের সৌন্দর্য প্রকাশ করা যাবে না। আল্লাহ বলেন, ‘তারা যেন তাদের স্বামী, পিতা, শ্বশুর, ছেলে, স্বামীর ছেলে, ভাই, ভাইয়ের ছেলে, বোনের ছেলে, আপন নারীরা, তাদের মালিকানাধীন দাসী, পুরুষদের মধ্যে যৌন কামনাছাড়া পুরুষ এবং নারীদের গোপন অঙ্গ সম্পর্কে অজ্ঞ বালক ছাড়া কারও কাছে তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে। তারা যেন তাদের গোপন সৌন্দর্য প্রকাশের উদ্দেশ্যে সজোরে পদক্ষেপ না করে।’ (সুরা নুর, আয়াত : ৩১)
আকর্ষণীয় ভঙ্গিমায় কথা না বলা
পর-পুরুষের সঙ্গে আকর্ষণীয় ভঙ্গিমায় কথা বলা যাবে না। আল্লাহ বলেন, ‘যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় করো তবে পর-পুরুষের সঙ্গে কোমল কণ্ঠে এমনভাবে কথা বলো না, যাতে অন্তরে যার ব্যাধি আছে, সে প্রলুদ্ধ হয়। তোমরা ন্যায়সংগত কথা বলবে।’ (সুরা আহজাব, আয়াত : ৩২)
দৃষ্টি সংযত রাখা
মহান আল্লাহ নারী-পুরুষ সবাইকে দৃষ্টি সংযত রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। দৃষ্টি থেকেই শুরু হয় হৃদয়ের গুপ্ত প্রণয়। নারী-পুরুষ সবাই দৃষ্টি সংযত রাখলে অনেক অশ্লীলতা ও সামাজিক অপরাধ কমে যাবে। আল্লাহ বলেন, ‘মুমিনদেরকে বলো, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে সংযত করে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে; এটাই তাদের জন্য উত্তম। তারা যা করে নিশ্চয় আল্লাহ সে বিষয়ে সম্যক অবহিত। আর মুমিন নারীদের বলো, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে সংযত করে ও এবং তাদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে।’ (সুরা নুর, আয়াত : ৩০-৩১)
ইসলামে নারীর মর্যাদা ও সুরক্ষা কোনো বিচ্ছিন্ন বা খণ্ডিত বিষয় নয়; বরং তা একটি সমন্বিত ও ভারসাম্যপূর্ণ ব্যবস্থার অংশ। মা হিসেবে নারী সর্বোচ্চ সম্মান লাভ করে, স্ত্রী হিসেবে ভালোবাসা ও দায়িত্বের কেন্দ্রবিন্দু হয়, কন্যা ও বোন হিসেবে পুণ্য ও জান্নাতের সুসংবাদ লাভ করে। পাশাপাশি নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ঘরে অবস্থান, শালীন পোশাক, দৃষ্টি সংযম, মাহরাম ছাড়া ভ্রমণ নিষেধ, পর-পুরুষের সঙ্গে একান্তে অবস্থান পরিহার ও শালীন আচরণের মতো বিধান প্রণয়ন করা হয়েছে—যা নারীর মর্যাদা সংরক্ষণ ও তাকে সম্ভাব্য অনাচার ও নিপীড়ন থেকে রক্ষা করে।
লেখক : অধ্যাপক, আরবি বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়