মহানবী (সা.)-এর ১০ অনন্য বৈশিষ্ট্য

হজরত মুহাম্মদ (সা.) উত্তম চরিত্রের বাতিঘর। তাঁর জীবনে কোনো কলুষতা নেই। অপরাধ নেই। নেই অন্ধকারের কালিমা। তাঁর জীবন ছিল পুণ্য ও কল্যাণের আলোয় সমুজ্জ্বল। পাপ-পঙ্কিলতা তাঁকে স্পর্শও করতে পারেনি। এমন সুমহান চরিত্রের মানুষ পৃথিবী কখনও দেখেনি, ভবিষ্যতে দেখবেও না। তাঁর আলো জীবনে ধারণ করে অন্ধাকারাচ্ছন্ন মানুষ হয়েছে সভ্যতার রাজপুত্র। তাঁর আদর্শের জামা পরে সভ্যতাবিচ্ছিন্ন পথভোলারা হয়েছে আদর্শবান ও প্রকৃত মানুষ। ভ্রষ্টতায় নিমজ্জিতরা পেয়েছে সুশোভিত জান্নাতের সন্ধান। তাঁর সলোকে প্রতিভাস্বর হয়েছে দিগ-দিগন্ত। আল্লাহ তাআলা তাঁর চারিত্রিক সুষমা ঘোষণা করেছেন এভাবে, ‘তোমাদের মধ্যে যারা আল্লাহ ও আখেরাতকে ভয় করে এবং আল্লাহকে অধিকতর স্মরণ করে তাদের জন্যে রাসুলুল্লাহর মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ।’ (সুরা আহজাব, আয়াত: ২১)
আরেক আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয় তুমি মহান চরিত্রে অধিষ্ঠিত।’ (সুরা কলাম, আয়াত: ৪)। মহানবী (সা.) মুসলমানদের জন্য উত্তম আদর্শ। তাঁর জীবনজুড়ে রয়েছে আমাদের জন্য জান্নাতে যাওয়ার পাথেয়। তাঁর অনেক বৈশিষ্ট্য আছে। এখানে ১০টি বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করা হলো—
কোমল হৃদয়
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হৃদয় ছিল ভালোবাসায় আকীর্ণ। তিনি হৃদয়জুড়ে মানুষের জন্য ভালোবাসা পুষতেন, উদার চিত্তে ভালোবাসা বিলি করতেন। সৃষ্টিকুলের প্রতি তাঁর অপরিসীম দয়া। তাঁর দয়ার পরিধি সমস্ত সৃষ্টির ওপর সমান বিস্তৃত ছিল। তাঁর দয়াশীল আচরণ শত্রুর হৃদয়েও ঝড় তুলতো। কেড়ে নিতো চোখের ঘুম। সাহাবি আবু সুলাইমান মালিক ইবনে হুওয়ায়রিস (রা.) বলেন, ‘নবী (সা.) ছিলেন কোমল হৃদয় ও দয়ার্দ্র।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬০০৮)
সহনশীলতা
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ব্যবহার ছিল প্রভাতে ফোটা গোলাপের নরম কুসুমের মতো কোমল। তাঁর হৃদয় আকাশের মতো উন্মুক্ত ছিল সব মানুষের জন্য। দাস-দাসী, কৃষ্ণাঙ্গ, খর্বাকায়, কৃশকায়সহ সকলেই তাঁর কাছে সমান মর্যাদা পেত। তাঁর দরাজ দিল ছিল মানুষের জন্য ভালোবাসায় পূর্ণ। আনাস (রা.) বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) চরিত্রের দিক থেকে সর্বোত্তম ব্যক্তি ছিলেন। একদিন তিনি আমাকে কোনো কাজে পাঠালেন। আমি বললাম, ‘আল্লাহর কসম! আমি যাব না। কিন্তু আমার অন্তরে ছিল, নবি (সা.) আমাকে যে কাজে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন, সেখানে যাব। আমি বাজারে যাচ্ছিলাম। পথে খেলাধুলায় মত্ত ছেলেদের পেয়ে খেলায় মজে গেলাম। পেছন দিক থেকে রাসুল (সা.) এসে আমার ঘাড়ে হাত রাখলেন। পেছনে ফিরে দেখি তিনি হাসছেন। বললেন, ‘হে উনাইস, আমি তোমাকে যেখানে যেতে বলেছি, সেখানে যাও।’ আমি বললাম, ‘হে আল্লাহর রাসুল, হ্যাঁ, আমি এক্ষুণি যাচ্ছি।
আনাস (রা.) আরও বলেন, ‘আল্লাহর কসম! আমি সাত বছর অথবা নয় বছর তাঁর খেদমত করেছি! কিন্তু আমার মনে পড়ছে না, তিনি আমার কোনো কাজের জন্য আমাকে বলেছেন, তুমি এটা কেন করলে? অথবা কোনো কাজ না করলে তিনি আমার কৈফিয়ত তালাশ করেননি—এ কাজ কেন করলে না।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৪৭৭৩)
নম্রতা অবলম্বন
মুহাম্মদ (সা.) সব কাজে নম্রতা অবলম্বন করতেন। ধর্মের মৌলিক বিষয়াদি ছাড়া কোনো ব্যাপারেই কঠোরতা দেখাতেন না। এমনকি অমুসলিমদের সঙ্গেও কোমল আচরণ করতেন। নম্রতার পাঠ দিতেন সাহাবিদেরও।
আয়েশা (রা.) বলেন, ‘ইহুদিদের একটি দল রাসুল (সা.)-এর কাছে এসে বলল, ‘আসসামু আলাইকুম’ (তোমার মৃত্যু হোক)। আমি জবাবে বললাম, ‘ওয়ালাইকুমুসসামু ওয়া লানাতু’ (তোমাদের ওপরও মৃত্যু এবং অভিসম্পাত)। রাসুল (সা.) বলেন, ‘হে আয়েশা, থামো। আল্লাহ সব কাজে নম্রতা পছন্দ করেন।’ আমি বললাম, ‘হে আল্লাহর রাসুল, আপনি কি শোনেননি, তারা কী বলেছে?’ তিনি বলেন, ‘আমি তো বলেছি, ‘আলাইকুম’।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬০২৪)
রহমতের নবী
আল্লাহ তাআলা মুহাম্মদ (সা.)-কে সমগ্র বিশ্বের জন্য রহমত হিসেবে পাঠিয়েছেন। বিশ্বমানবতার পরিপূর্ণ কল্যাণের জন্যই তাঁর আগমন। আগমন করেছেন মানুষের মুক্তির জন্য। তিনি মুক্তির দীপক সনদ বুকে ধারণ করে শান্তি-সম্প্রীতি ও সুখের বাতাস বইয়ে দিয়েছেন পৃথিবীর ঘরে ঘরে। তাঁর আগে কেউ এমন বিপুল রহমত নিয়ে জগতে আগমন করেনি। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে নবী, আমি তোমাকে সারা বিশ্বের জন্য রহমত হিসেবে পাঠিয়েছি।’ (সুরা আম্বিয়া, আয়াত: ১০৭)
গাম্ভীর্যপূর্ণ উত্তম আচরণ
রাসুলুল্লাহ (সা.) মানুষের সঙ্গে উত্তম আচরণ করতেন। তাঁর গাম্ভীর্যের প্রভাব এতটাই গভীর ছিল, অপরিচিত কেউ তাঁর কাছে আসতে ভয় পেতেন। তাঁর ব্যক্তিতের প্রবল স্ফুরণ দেখে ভড়কে যেতেন। কিন্তু সান্নিধ্যে এলেই দেখতে পেতেন, তাঁর চেয়ে প্রেমময় অন্তরঙ্গ মানুষ এই জগতে আর দ্বিতীয়টি নেই। নবী (সা.) বলেছেন, ‘উত্তম পথ, গাম্ভীর্যপূর্ণ উত্তম আচরণ এবং পরিমিতিবোধ নবুওয়াতের পঁচিশ ভাগের এক ভাগ।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৪৭৭৬)
সবাইকে গুরুত্ব দিতেন
রাসুল (সা.)-এর কাছে কোনো ব্যক্তি প্রয়োজন নিয়ে এলে গুরুত্ব সহকারে তার কথা শোনতেন। অভিযোগ-অনুযোগ শোনার সময় হতেন পূর্ণ মনোযোগী। ব্যক্তির কথা শেষ না হলে তিনি মনোযোগ সরাতেন না। ব্যক্তির মুখ না সরানো পর্যন্ত তিনি নিজের কান সরাতেন না। অথচ তিনি তখনকার মদিনার অধিপতি। মসজিদে নববির ইমাম। সাহাবিদের শিক্ষক। দ্বীনের দাওয়াত নিয়ে ছুটে চলেন দিগ্বিদিক। বিভিন্ন রাষ্ট্রনায়কের কাছে চিঠি লিখেন। যুদ্ধে যান। যুদ্ধের ছক আঁকেন। পৃথিবীর সমস্ত মানুষ এবং অনাগত মানুষদের নিয়ে চিন্তা করেন। ঘরে দশজন স্ত্রীকে সময় দেন। কত ব্যস্ততা তাঁর। আনাস (রা.) বলেন, ‘নবী (সা.)-এর কাছে এসে কেউ কানে কানে কথা বললে সে তার মুখ না সরানোর আগে তাঁকে কখনো নিজের কান সরাতে দেখিনি। কেউ তাঁর হাত ধরলে যতক্ষণ সে হাত না ছাড়ত, ততক্ষণ তিনি (রাসুল সা.) তাঁর হাত সরাতেন না।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৪৭৯৩)
মানুষকে সম্পর্কে ভালো কথা বলতেন
আয়েশা (রা.) বলেন, নবী (সা.)-কে কোনো ব্যক্তির কোনো বিষয়ে জানানো হলে তিনি এভাবে বলতেন না—‘তার কি হলো যে সে একথা বলে’; বরং তিনি বলতেন, ‘লোকদের কি হলো; তারা এই কথা বলে।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৪৭৮৮)। আরেক হাদিসে আছে, আনাস (রা.) বলেন, ‘এক ব্যক্তি রাসুল (সা.)-এর কাছে শরীরে হলুদ রং মেখে এলেন। নবী কারও মুখের ওপর তার দোষত্রুটি নির্দেশ করতে সংকোচবোধ করতেন। লোকটি চলে যেতে লাগলে তিনি বলেন, ‘তোমরা যদি এই ব্যক্তিকে তার চেহারার ওই রং ধুয়ে ফেলতে বলতে!’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৪৭৮৯)
নিরহংকারী জীবনযাপন
রাসুল (সা.) সাধারণ জীবনযাপন করতেন। দম্ভ, অহংকার তাঁর মধ্যে ছিল না। কারও সঙ্গে অহংকার দেখাতেন না। মদিনার দাস-দাসীও তাঁকে সঙ্গে নিয়ে হাঁটতে বের হতেন। একসঙ্গে হাঁটতেন। গল্প করতেন। আনাস ইবনে মালিক (রা.) বলেন, ‘মদিনাবাসীর কোনো দাসীও রাসুল (সা.)-এর হাত ধরে যেখানে ইচ্ছে নিয়ে যেতে পারত। তিনিও যেতেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬০৭২)
অসহায়ের প্রতি সহমর্মিতা
নবী (সা.) সবাইকে মায়া করতেন। দয়া করতেন। অসহায়ের পাশে দাঁড়াতেন। গরিবকে সাহায্য করতেন। এতিমের দায়িত্ব নিতেন। আশ্রয়হীনকে আশ্রয় দিতেন। বিধবার কল্যাণের ব্যবস্থা করতেন। দুর্গতের প্রয়োজন মেটাতেন। আপনিও মানুষের দুঃখ-দুর্দশা ও প্রয়োজন বুঝে মানুষের পাশে দাঁড়ান। মানুষকে সহযোগিতা করুন সাধ্যমতো। মানুষের মাথায় ভালোবাসার হাত রাখুন। মানুষকে অভয় দিন। আপনার সহযোগিতা, ভালোবাসা আর অভয় বদলে দিতে পারে অনেকের জীবন।
লজ্জাশীল
মুহাম্মদ (সা.) ছিলেন পৃথিবীর সবচেয়ে লজ্জাশীল মানুষ। তাঁর স্ত্রী আয়েশা (রা.) কোনো দিন তাঁর লজ্জাস্থান দেখেননি। আয়েশা (রা.)-এর জবানিতে পাওয়া যায়, তিনিও কখনো আয়েশার লজ্জাস্থানের দিকে তাকাননি। যৌবনে কাবাঘর নির্মাণের সময় চাচার পরামর্শে ইট বহনের জন্য লুঙ্গি খোলে মাথায় দিতেই তিনি অজ্ঞান হয়ে যান। রাসুল (সা.) সবসময় পূর্ণ শরীর ঢেকে চলাফেরা করতেন। আবু সাইদ খুদরি (রা.) বলেন, ‘রাসুল (সা.) অন্তঃপুরের কুমারী মেয়ের চেয়েও অধিক লজ্জাশীল ছিলেন। কোনো অপছন্দনীয় জিনিস তাঁর চোখে পড়লে ব্যাপারটি আমরা তাঁর চেহারা দেখেই বুঝতে পারতাম।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬১০২)




