মুসা ও খিজির (আ.)-এর চমকপ্রদ কাহিনি

আজ খতমে তারাবিতে কোরআনের ১৬তম পারা তেলাওয়াত করা হবে। সুরা কাহাফের ৭৫ নম্বর আয়াত থেকে সুরা মরিয়ম ও সুরা তহা। এই অংশে জাকারিয়া (আ.)-এর সন্তান লাভ, ইবরাহিম (আ.)-এর একত্ববাদের ঘোষণা ও তাঁর বাবার অস্বীকার, আল্লাহর সাক্ষাৎ, তাঁর সঙ্গে শরিক করা, মুসা (আ.) ও খিজির (আ.)-এর ঘটনা, জুলকারনাইনের ঘটনা, ইয়াজুজ-মাজুজের ফেতনা, মরিয়ম ও ইসা (আ.)-এর বর্ণনা, বুড়ো বয়সে মুমিনের প্রতি আল্লাহর ভালোবাসা, মহানবীকে সান্ত্বনা, পুনরুত্থান, হিসাব-নিকাশ, তওবা, আল্লাহর অস্তিত্ব, মানুষের কাজ এবং অবিশ্বাসীদের শাস্তি ইত্যাদি বিষয়ের বিবরণ রয়েছে।
মুসা (আ.) ও খিজির (আ.)-এর চমকপ্রদ ঘটনা
গতকাল তারাবির শেষের দিকে মুসা (আ.) ও খিজির (আ.)-এর চমকপ্রদ ঘটনার কিছু অংশ পড়া হয়েছে। আজকের তারাবিতে সুরা কাহাফের ৮২ নম্বর আয়াত পর্যন্ত তাদের ঘটনার পরের অংশ তেলাওয়াত করা হবে। একদিন সভায় ভাষণ দিচ্ছিলেন মুসা (আ.)। একজন জিজ্ঞেস করলেন, ‘পৃথিবীতে সবচেয়ে জ্ঞানী কে?’ তিনি বললেন, ‘আমি।’ মুসা নবীর উত্তর আল্লাহর পছন্দ হয়নি। আল্লাহ মুসাকে বললেন, ‘দুই নদীর মোহনায় আমার এক বান্দা আছে, তোমার চেয়ে জ্ঞানী।’ তার নাম খিজির (আ.)। মুসা নবী তাঁর সাক্ষাৎ কামনা করে তাঁর কাছে গেলেন। দেখা হলো তাঁদের। একাধিক শর্ত মানার অঙ্গীকারে পথ চললেন তাঁরা। তাঁদের সফরে তিনটি ঘটনা ঘটে।
- মুসা (আ.) ও খিজির (আ.) নৌকায় করে নদী পার হন। মাঝি তাদের ভাড়া নেননি। কিন্তু খিজির (আ.) নৌকাটি ছিদ্র করে ফেলেন।
- খিজির (আ.) একটি নিষ্পাপ শিশুকে হত্যা করেন।
- তিনি একজনের দেয়াল মেরামত করে দেন। অথচ তাদের কাছে খাবার চাইলে তারা দেয়নি।
মুসা (আ.) এ তিন ঘটনায় চুপ থাকতে পারেননি। বাহ্যত তিনটি ঘটনায় ছিল অন্যায়। তিনি এর কারণ জানতে চান। খিজির (আ.) তিনটি ঘটনার ব্যাখ্যা দেন এভাবে—
- নৌকাটি কয়েকজন গরিবের ছিল। তারা এটা দিয়ে সংসার চালাত। ওই দেশে ছিল এক জালিম বাদশাহ। সে বলপ্রয়োগে মানুষের নৌকা ছিনিয়ে নিত। তবে ছিদ্র নৌকা নিত না।
- শিশুটির মা-বাবা ইমানদার। কিন্তু সে বড় হয়ে কাফের হবে। এটা তার মা-বাবার জন্য আজাবের কারণ হয়ে দাঁড়াবে।
- দেয়ালটি ছিল দুজন বাবা হারানো বালকের। দেয়ালের নিচে তাদের নেককার বাবার রক্ষিত গুপ্তধন ছিল। মহান আল্লাহ চেয়েছেন যে তারা যৌবনে পদার্পণ করুক এবং নিজেদের গুপ্তধন উদ্ধার করুক। কোরআনে আছে, খিজির বললেন, ‘আমি এসবের কিছুই নিজ থেকে করিনি।’ (সুরা কাহাফ, আয়াত: ৮২)
জুলকারনাইনের গল্প
জুলকারনাইনের প্রকৃত নাম সিকান্দার। তিনি ন্যায়পরায়ণ ও সৎ বাদশাহ ছিলেন। পশ্চিম থেকে পূর্ব পর্যন্ত সফর করেছিলেন। সফরকালে নির্যাতিত, বঞ্চিত, শাসকের হাতে শোষিত লোকদের মুক্তি দিতেন। দুই পর্বতের মাঝে তিনি এক জনগোষ্ঠীকে খুঁজে পেয়েছিলেন। তারা তার কাছে ইয়াজুজ ও মাজুজ জনগোষ্ঠীর হাত থেকে রক্ষা পেতে একটি দেয়াল নির্মাণের আবেদন জানিয়েছিল। তিনি তাদের জন্য একটি শক্তিশালী প্রাচীর নির্মাণ করে দেন। তবে কিয়ামতের আগে জুলকারনাইন-নির্মিত সেই প্রাচীর ভেঙে খানখান হয়ে যাবে। এ সুরার ৮৩ থেকে ১০১ নম্বর আয়াতে জুলকারনাইনের ঘটনা বর্ণিত হয়েছে।
মরিয়ম (আ.)-এর গল্প আছে সুরা মরিয়মে
সুরা মরিয়ম মক্কায় অবতীর্ণ। এটি কোরআনের ১৯তম সুরা। এর আয়াত সংখ্যা ৯৮। এ সুরায় মরিয়ম (আ.)-এর আলোচনা থাকায় এটিকে সুরা মরিয়ম বলা হয়। এ ছাড়াও সুরায় জাকারিয়া (আ.), ইসা (আ.), ইবরাহিম (আ.), মুসা (আ.), হারুন (আ.) ইসমাইল (আ.) ও ইদরিস (আ.)-এর কথা আলোচিত হয়েছে।
মরিয়ম (আ.)-এর মাধ্যমে আল্লাহর কুদরতের প্রকাশ
আল্লাহর কুদরতের নিদর্শন হিসেবে মরিয়ম (আ.) গর্ভবতী হলেন। প্রসবের সময় ঘনিয়ে এলে তিনি মসজিদ ছাড়লেন। নির্জন ভূমিতে চলে গেলেন। স্বামী ছাড়া সন্তান হওয়ার বিষয়টি তিনি নিতে পারছিলেন না। ফলে মরে যেতে চাইলেন। মানুষের স্মৃতি থেকে মুছে যেতে চাইলেন। একদিন সন্তান ইসা (আ.)-কে প্রসব করলেন। তার ওপর অপবাদ দিত ইহুদিরা। তিনি কথা না বলে কোলের শিশুর প্রতি ইঙ্গিত করলেন। শিশু ইসা মায়ের পবিত্রতার সাক্ষ্য দিলেন। সুরা মরিয়মের ১৬ থেকে ৪০ নম্বর আয়াতে এ ঘটনার বিবরণ রয়েছে।
মুসা (আ.)-এর জীবনের গল্প সুরা তহায়
সুরা তহার আয়াত সংখ্যা ১৩৫। কোরআনের ২০তম সুরা এটি। এটি মক্কায় অবতীর্ণ। শিশু মুসাকে বাক্সে ভরে নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া, শত্রুর ঘরে মুসার বেড়ে ওঠা, নবুওয়াত লাভ, আল্লাহর সঙ্গে কথোপকথন, ফেরাউনকে একাত্ববাদের দাওয়াত, জাদুকরদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় মুসার বিজয়, জাদুকরদের ইসলাম গ্রহণ, বনি ইসরাইলকে নিয়ে মিসর ত্যাগ, সৈন্যসামন্ত নিয়ে মুসাকে ফেরাউনের ধাওয়া ও নদীতে ডুবে ফেরাউনসহ পুরো বাহিনীর মৃত্যু, বনি ইসরাইলের অকৃজ্ঞতা ইত্যাদি বিষয়ের রয়েছে এ সুরার ৯ থেকে ৯৮ নম্বর আয়াতে।