যে ১৪ নারীকে বিয়ে করা হারাম

আজ খতমে তারাবিতে চতুর্থ পারার পুরোটা ও পঞ্চম পারার প্রথম অর্ধেক পড়া হবে—মোট দেড় পারা। সুরা আলে ইমরানের ৯২ থেকে সুরা নিসার ৮৭ নম্বর আয়াত পর্যন্ত। এই অংশে ইসলামের দাওয়াত, বদর যুদ্ধ, উত্তরাধিকার, এতিমের অধিকার, বিয়েশাদি, পারিবারিক বিরোধ মীমাংসা, ওহুদ যুদ্ধ, মৃত্যু, হাশর, দাম্পত্য জীবন, আসমান-জমিন সৃষ্টিসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিধানের কথা আলোচিত হয়েছে।
পৃথিবীর প্রথম ঘর কাবা
এদিকে কিবলা পরিবর্তন হওয়ার পর যখন কাবা কিবলা হিসেবে সাব্যস্ত হয়ে গেল, তখন আহলে কিতাবরা এই কথা চাউর করল, বাইতুল মাকদিস কাবা থেকে উত্তম। কারণ, বাইতুল মাকদিস ভূপৃষ্ঠের প্রথম ঘর হওয়ার মর্যাদায় ভূষিত। সুরা আলে ইমরানের ৯৬-৯৭ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা তাদের এ কথা প্রত্যাখ্যান করে কাবার তিনটি বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করেন। যেমন—
১. কাবা ভূপৃষ্ঠের সর্বপ্রথম ইবাদতের জায়গা।
২. এতে আছে প্রকাশ্য কিছু নিদর্শন—যা দিয়ে এর মর্যাদা সুপ্রমাণিত। এর মধ্যে মাকামে ইবরাহিম, জমজম ও হাতিমে কাবা অন্যতম।
৩. হারাম এলাকায় প্রবেশকারী নিরাপদ।
ইসলামের প্রথম সামরিক বিজয়—বদর যুদ্ধ
এ সুরার ১২১ থেকে ১২৯ নম্বর আয়াতে বদর যুদ্ধের আলোচনা রয়েছে। ইসলামের ইতিহাসে বদর যুদ্ধ সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ও গুরুত্ববহ। মুসলিম ইতিহাসের প্রথম সশস্ত্র লড়াই এটি। দ্বিতীয় হিজরির ১৭ রমজান মদিনার উপকণ্ঠে বদর নামক স্থানে কাফেরদের বিরুদ্ধে মুসলমানদের যুদ্ধ। এটি ছিল অসত্যের বিরুদ্ধে সত্যের লড়াই। দাম্ভিকতার বিরুদ্ধে একনিষ্ঠতার লড়াই। অবিশ্বাসের বিরুদ্ধে বিশ্বাসের লড়াই। এ যুদ্ধে কুরাইশ বাহিনীর ১ হাজার সশস্ত্র সেনা, ১০০টি ঘোড়া, ৭০০টি উট ছিল। মুসলমানেরা ছিলেন ৩১৩ জন। তাদের সঙ্গে ছিল মাত্র দুটি ঘোড়া ও ৭০টি উট। মুসলিমরা এ যুদ্ধে আল্লাহর গায়েবি মদদে অলৌকিকভাবে বিজয় লাভ করেন এবং কাফেররা শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়। এতে কুরাইশদের ৭০ জন নিহত হয় ও ৭০ জন বন্দি হয়। মুসলিমদের ১৪ জন শহীদ হন।
নারীদের নিয়ে স্বতন্ত্র সুরা—সুরা নিসা
মদিনায় অবতীর্ণ সুরা নিসার আয়াত সংখ্যা ১৭৬। পবিত্র কোরআনের চতুর্থ সুরা এটি। নিসা অর্থ নারী। এ সুরায় নারীর অধিকার, নারীর উত্তরাধিকার, দাম্পত্যজীবন, তালাক ও নারী সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ের আলোচনা রয়েছে। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে এ সুরার নাম রাখা হয় সুরা নিসা। নারীর উত্তরাধিকার বিষয়ে এত বিস্তারিত আলোচনা অন্য কোনো সুরায় করা হয়নি।
ইসলামে বহু বিবাহ
আল্লাহ তাআলা সুরা নিসার ৩ নম্বর আয়াতে বিয়েবিষয়ক আলোচনা করেছেন। একসঙ্গে সর্বোচ্চ চারজন নারীকে বিয়ে করার অনুমতি দিয়েছেন। সেক্ষেত্রে স্বামী তাদের সার্বিক হক আদায় করার সামর্থ রাখতে হবে। তাদের মাঝে ন্যায়-ইনসাফ বজায় রাখতে হবে। অন্যথায় একজন স্ত্রীই যথেষ্ট।
উত্তরাধিকারীদের ঠকানো জঘন্য পাপ
মৃতের সম্পদ ওয়ারিশদের মধ্যে ভাগ করা ফরজ—এটা আল্লাহর বিধান। এই বিধানে কমবেশি করার সুযোগ নেই। কোনো মুসলমান মারা গেলে তার সম্পত্তি বণ্টনের আগে কিছু আনুষ্ঠানিকতা পালন করা জরুরি। যেমন—তার সম্পদ থেকে দাফন-কাফনের ব্যবস্থা করা, ঋণ আদায় করা, স্ত্রীর দেনমোহর আদায় করা এবং অসিয়ত করে গেলে তার প্রাপককে বুঝিয়ে দেওয়া। এ কাজগুলো শেষ হলে মৃত ব্যক্তির অবশিষ্ট সম্পত্তি ইসলামি ফারায়েজ আইন অনুযায়ী উত্তরাধিকারীদের মধ্যে বণ্টন করে দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে কমবেশি করা যাবে না। মা, স্ত্রী, ফুফু ও বোনদের ঠকানো যাবে না। আমাদের সমাজে সম্পদ বণ্টনে তাদের নানাভাবে ঠকানোর প্রবণতা দেখা যায়। ইসলামি শরিয়তে মা, স্ত্রী, কন্যা কখনোই উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত হয় না। তারা উত্তরাধিকার হিসেবে সম্পদ পাবেনই। মৃতের সম্পদ বণ্টনে আল্লাহর আইন অমান্য ও ওয়ারিশ ঠকানো পাপ। (সুরা নিসা, আয়াত : ১৯)
উল্লেখ্য, জাহেলি যুগে স্ত্রীদের স্বামীর সাধারণ সম্পত্তি হিসেবে গণ্য করা হতো। ফলে স্বামীর মৃত্যুর পর অন্যান্য সম্পত্তির মতো স্ত্রীও তার উত্তরাধিকারীর (বাবা, ভাই, ছেলে ইত্যাদি) সম্পত্তিতে পরিণত হতো। সে যুগে বাবার মৃত্যুর পর সৎমাকে বিয়ে করা যেত। ওই নারী সম্পদের মালিক হয়ে থাকলে সেগুলো কুক্ষিগত করতে জোর করে বিয়ে করা হতো। এমনকি সম্পদশালী নারীর বিয়ে ঠেকিয়ে দিত তার স্বজনরা। (তাফসিরে জাকারিয়া)
যে ১৪ নারীকে বিয়ে করা হারাম
সুরা নিসার ২৩ থেকে ২৫ নম্বর আয়াতে কাকে বিয়ে করা যায় আর কাকে বিয়ে করা যায় না; এ বিষয়ে বিস্তারিত বলা হয়েছে। যে ১৪ শ্রেণির নারীকে বিয়ে করা হারাম, তাদের তালিকা এখানে দেওয়া হলো—
- মা।
- দাদি, নানি ও তাদের ওপরের সবাই।
- নিজের মেয়ে, ছেলের মেয়ে, মেয়ের মেয়ে ও তাদের গর্ভজাত কন্যাসন্তান।
- সহোদর, বৈমাত্রেয় (সৎমায়ের মেয়ে) ও বৈপিত্রেয় (সৎবাবার মেয়ে) বোন।
- বাবার সহোদর বোন এবং বাবার বৈমাত্রেয় ও বৈপিত্রেয় বোন।
- যে স্ত্রীর সঙ্গে দৈহিক মিলন হয়েছে, তার পূর্ববর্তী বা পরবর্তী স্বামীর ঔরশজাত কন্যাসন্তান, স্ত্রীর আপন মা, নানি শাশুড়ি ও দাদি শাশুড়ি।
- মায়ের সহোদর বোন এবং মায়ের বৈমাত্রেয় ও বৈপিত্রেয় বোন।
- ভাতিজি অর্থাৎ সহোদর, বৈমাত্রেয় ও বৈপিত্রেয় ভাইয়ের মেয়ে ও তাদের পরের প্রজন্মের কন্যাসন্তানেরা।
- ভাগ্নি অর্থাৎ সহোদর, বৈমাত্রেয় ও বৈপিত্রেয় বোনের মেয়ে ও তাদের পরের প্রজন্মের কন্যাসন্তানেরা।
- দুধ মেয়ে (স্ত্রীর দুধ পান করেছে এমন), সেই মেয়ের মেয়ে, দুধছেলের মেয়ে ও তাদের পরের প্রজন্মের কোনো কন্যাসন্তান এবং দুধছেলের স্ত্রী।
- দুধ মা এবং তার দিকের খালা, ফুফু, নানি, দাদি ও তাদের ঊর্ধ্বতন নারীরা।
- দুধ বোন, দুধ বোনের মেয়ে, দুধ ভাইয়ের মেয়ে এবং তাদের গর্ভজাত যে কোনো কন্যাসন্তান। অর্থাৎ দুধ সম্পর্ককে রক্তসম্পর্কের মতোই গণ্য করতে হবে।
- ছেলের স্ত্রী।
- এমন দুই নারীকে একসঙ্গে স্ত্রী হিসেবে রাখা যাবে না, যাদের একজন পুরুষ হলে তাদের মধ্যে বিয়ে বৈধ হতো না। যেমন—স্ত্রীর বোন, খালা, ফুফু।
৭টি মৌলিক হক
সুরা নিসার ৩৬ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা মানুষকে সাতটি মৌলিক হক যথাযথভাবে পালনের আদেশ করেছেন। যেমন—
আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরিক না করা।
- মা-বাবা
- নিকটাত্মীয়
- এতিম-মিসকিন
- প্রতিবেশী
- অসহায় মুসাফির
- নিজের অধীনস্থদের সঙ্গে সদাচরণ করা।
একজন প্রকৃত মুমিনের গুণ হলো, এই হক আদায় করা এবং তাঁদের সঙ্গে উত্তম আচরণ করা। পাপী, দাম্ভিকরা এই হক আদায় করে না। আল্লাহ দাম্ভিকদের পছন্দ করেন না।
এ ছাড়াও মুমিনদের বারবার পরীক্ষার কারণ, আমানত আদায়, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা ও জিহাদ পালনসহ ইত্যাদি বিষয় আলোচিত হয়েছে।