যে নারীর পবিত্রতায় নাজিল হয়েছিল কোরআনের ১০ আয়াত

আজ খতমে তারাবিতে পবিত্র কোরআনের ১৮তম পারা তেলাওয়াত করা হবে। সুরা হিসেবে সুরা মুমিনুন, সুরা নুর ও সুরা ফুরকানের ১ থেকে ২০ নম্বর আয়াত পর্যন্ত পড়া হবে। এই অংশে কিয়ামতের ভয়াবহতা, হিসাবের পাল্লা, আসমান-জমিন সৃষ্টি, আল্লাহর ভয়, দ্বীনের মূলনীতি, মুমিনের গুণ, খাঁটি ইমান, ক্ষমা প্রার্থনা, পর্দা, ব্যভিচার, ব্যভিচারের অপবাদ, অপপ্রচারের শাস্তি, দৃষ্টির হেফাজত, ঘরে প্রবেশে অনুমতি, বিধবাদের বিয়ের ব্যবস্থা, দাস-দাসীদের বিষয়ে নির্দেশনা, সমাজজীবনে শিষ্টাচার ইত্যাদি বিষয়ের আলোচনা রয়েছে।
মুমিনের সাত গুণ
মক্কায় অবতীর্ণ সুরা মুমিনুনের আয়াত সংখ্যা ১১৮। এটি কোরআনের ২৩তম সুরা। এ সুরায় মুমিনদের বিষয়ে আলোচনা আছে, তাই এটিকে সুরা মুমিনুন বলা হয়। সুরাতে নুহ (আ.), হুদ (আ.), সালেহ (আ.), মুসা (আ.), হারুন (আ.) ও ইসা (আ.)-এর ঘটনা আলোচিত হয়েছে। এ সুরার ২ থেকে ৯ নম্বর আয়াতে মুমিনদের সাতটি গুণের কথা বলা হয়েছে। যাদের এ গুণগুলো থাকবে, তারা জান্নাতের অধিবাসী হবেন। যথা—
- তারা নামাজে বিনয়-নম্র।
- অনর্থক কথাবার্তা থেকে দূরে থাকেন।
- জাকাত দেন।
- অবৈধ যৌনাচার থেকে বিরত থাকেন।
- আমানত ফিরিয়ে দেন।
- অঙ্গীকার পূর্ণ করেন।
- নামাজে যত্নবান থাকেন।
কাফেরদের তিনটি দুষ্কর্ম
সুরা মুমিনুনের ৬৮ থেকে ৭১ নম্বর আয়াতে কাফেরদের তিনটি দুষ্কর্ম নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। দুষ্কর্ম তিনটি হলো—
- তারা বুদ্ধিকে কাজে লাগাত না। কোরআন নিয়ে গবেষণা না করে হাসি-তামাশা ও অস্বীকার করত।
- শুধু বিদ্বেষ ও জেদের বশবর্তী হয়ে হজরত মুহাম্মদ (সা.)-কে মিথ্যা প্রতিপন্ন করত।
- মহানবী (সা.)-কে তারা পাগল বলে সম্বোধন করত। অথচ এটা ছিল বাস্তব মিথ্যা।
আলোর সুরা—সুরা নুর
সুরা নুর মদিনায় অবতীর্ণ। এর আয়াত সংখ্যা ৬৪। কোরআনের ২৪তম সুরা এটি। এ সুরার নাম দুটি কারণে নুর রাখা হয়েছে। এক. এ সুরায় নুর শব্দটি এসেছে। দুই. সুরাটিতে এমন সব ফজিলত, বিধিবিধান ও মূলনীতির বয়ান রয়েছে, যা মানুষের সামষ্টিক জীবনের পথচলা আলোকিত করে। এ সুরাতে নারী-পুরুষের মৌলিক সম্পর্ক বিশেষ করে নারীর সতীত্ব বিধান, সংরক্ষণ ও পর্দা সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে।
নারীকে অপবাদমুক্ত করতে ১০ আয়াত
রাসুলুল্লাহ (সা.) বনি মুসতালিকের যুদ্ধে বিজয়ী হয়ে মদিনায় ফিরছিলেন। সে যুদ্ধে আয়েশা (রা.) তাঁর সঙ্গে ছিলেন। ফেরার পথে যাত্রাবিরতিতে আয়েশা (রা.) প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে যান। কিন্তু সেটি কেউ টের পাননি। তার ওজন কম থাকায় হাওদা বহনকারীরাও বুঝতে পারেননি তিনি হাওদায় নেই। ফলে তাকে ছাড়াই কাফেলা এগিয়ে যায়। আয়েশা (রা.) ফিরে এসে কাউকে পেলেন না। সেখানেই চাদর মুড়িয়ে শুয়ে রইলেন। পরে সাহাবি সাফওয়ান বিন মুআত্তাল (রা.)—যাকে মহানবী (সা.) ফেলে যাওয়া আসবাবপত্র কুড়িয়ে নেওয়ার জন্য রেখে গিয়েছিলেন; আয়েশা (রা.) তার সঙ্গে ফিরলেন।
মুনাফিক স্বভাবের কিছু লোক আয়েশা (রা.)-এর বিরুদ্ধে ব্যভিচারের অপবাদ দিল। রাসুল (সা.) কষ্ট পেলেন। আয়েশা (রা.)-কে পৃথক করলেন। রেখে এলেন শ্বশুর আবু বকর (রা.)-এর ঘরে। এদিকে মুনাফিকেরা অপবাদের বিষ ছড়িয়ে যাচ্ছে। দীর্ঘ এক মাস পর আল্লাহ তাআলা আয়েশা (রা.)-এর পবিত্রতা ঘোষণা করে সুরা নুরে ১০টি আয়াত নাজিল করেন।
ব্যক্তিগত গোপনীয়তার সুরক্ষানীতি
সুরা নুরের ২৭ থেকে ২৯ ও ৫৮ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা ঘরে প্রবেশের নীতিমালা বর্ণনা করেছেন। কারও ঘরে প্রবেশে অনুমতি নেওয়া আল্লাহর আদেশ ও মহানবীর আদর্শ। সেটা স্ত্রী, মা-বাবা, সন্তান ও বন্ধু-বান্ধব—যেই হোক না কেন। ঘরে প্রবেশের ক্ষেত্রে দুটি কাজ করতে হবে, এক. অনুমতি নেওয়া। দুই. সালাম দেওয়া।
অপ্রাপ্তবয়স্করা বিশেষ তিন সময়ে অনুমতি নেবে—
- ফজর নামাজের আগে।
- দুপুরে ঘুমানোর সময়।
- এশার নামাজের পর।
এ সময়গুলোতে স্বামী-স্ত্রী নির্জনে সময় কাটানোর সম্ভাবনা বেশি থাকে। মানুষ তখন নিজের মতো করে ঘুমাতে যায়।
অনুমতি ছাড়া ঘরে প্রবেশ করা অপরাধ। আল্লাহ তাআলা ঘরে প্রবেশে অনুমতি নেওয়াকে আবশ্যক করেছেন। তিনবার অনুমতি চাইতে হবে। অনুমতি না পেয়ে কিংবা ঘরের ভেতর থেকে সাড়া-শব্দ না পেয়ে উঁকি দেওয়া নিষেধ। বর্তমানে অনেক বাসায় কলিংবেলের ব্যবস্থা আছে। সেক্ষেত্রে কলিংবেল বাজানোই ভালো।
হক-বাতিলের পার্থক্য নির্ণয়কারী সুরা ফুরকান
মক্কায় অবতীর্ণ সুরা ফুরকানের আয়াত সংখ্যা ৭৭। এটি কোরআনের ২৫তম সুরা।
কোরআনের আরেক নাম ফুরকান। এর অর্থ আলাদা করা। যেহেতু এ সুরা হক-বাতিলের মধ্যে পার্থক্য নির্ণয়কারী, তাই এর নাম ফুরকান।
আজকের তারাবিতে সুরা ফুরকানের ১৮ নম্বর আয়াত পর্যন্ত তেলাওয়াত করা হবে। এই অংশে আল্লাহ এক ও অদ্বিতীয়, তিনি একমাত্র উপাসনার উপযুক্ত, নবীরাও মানুষ, বিশ্বাসীদের জন্য জান্নাত আর অবিশ্বাসীদের জন্য জাহান্নামের শাস্তি ইত্যাদি বিষয়ের বিবরণ রয়েছে।