logo
Advertisement

মায়ের মৃত্যুর পর মহানবী (সা.) যাকে মা ডাকতেন

শাইখ মাহমুদ আহমাদ গজনফর
মায়ের মৃত্যুর পর মহানবী (সা.) যাকে মা ডাকতেন
আরবিতে ‘মুহাম্মদ (সা.)’ লেখা ক্যালিগ্রাফি। ছবি: পিন্টারেস্ট

মহানবী (সা.) যখন মায়ের গর্ভে, তখন নবীজির বাবা মারা যান। মিরাস হিসেবে নবীজির বাবা পাঁচটি উট, এক পাল বকরি, মূল্যবান একটি তলোয়ার, রুপার কিছু অলংকার এবং এক দাসী রেখে যান। তার নাম বারাকাহ বিনতু সালাবা। আরবের তখনকার নিয়ম অনুযায়ী নবীজির শৈশবের প্রাথমিক সময় কাটে বনু সাদ গোত্রের হালিমা সাদিয়ার কাছে। নবীজির বয়স যখন পাঁচ বছর, হালিমা তখন তাকে মক্কায় তার মায়ের কাছে ফিরিয়ে দেন।

Advertisement

নবীজির বয়স তখন ছয়। তিনি তখন মায়ের সঙ্গে মদিনার বনু নাজ্জার গোত্রে তার নানার বাড়িতে বেড়াতে যান। এই সফরে তাদের সাথে বারাকাহ বিনতু সালাবাও ছিলেন। মদিনা থেকে ফেরার সময় আবওয়া নামক স্থানে পৌঁছে নবীজির মা আমেনা বিনতু ওয়াহব হঠাৎ করেই অসুস্থ হয়ে পড়েন। কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি ইন্তেকাল করেন। সেই তখন থেকেই উম্মু আইমান নবীজিকে মায়ের মমতা দিয়ে লালনপালন করেন। যুবক বয়সে নবী (সা.) তাকে আজাদ করে দেন।

প্রথম বিয়ে

খাদিজাতুল কুবরাকে নবীজি (সা.) বিয়ে করার পর উম্মু আইমানের বিয়ের ব্যবস্থা করেন। উবাইদ ইবনু জাইদ খায়রামির সঙ্গে তার বিয়ে দেন। তাদের সংসারে তখন আইমান জন্মগ্রহণ করে। এরপর থেকেই তার নাম হয়ে যায় উম্মু আইমান। আর এই নামেই তিনি ইতিহাসে বিখ্যাত হন।

আইমান (রা.) ছিলেন বিখ্যাত সাহাবি। তিনি হুনাইন যুদ্ধে শাহাদাত বরণ করেন। নবীজির নবুযত লাভের পর উম্মু আইমান শুরুর দিকেই মুসলিম হয়ে যান। তবে তার স্বামী উবাইদ ইবনু জাইদ ইসলাম গ্রহণ করেননি। ফলে তারা আলাদা হয়ে যান। (আল-ইসাবা, খণ্ড: ৮, পৃষ্ঠা: ৩৫৮)

দ্বিতীয় বিয়ে

উম্মু আইমান (রা.) সারাজীবন নবীজির খেদমত করেছেন। ইসলামের জন্য তিনি নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন। নবীজি (সা.) তার ব্যাপারে বলেন, কেউ যদি কোনো জান্নাতি নারীকে বিয়ে করতে চায়, সে যেন উম্মু আইমানকে বিয়ে করে নেয়।

নবীজির এই ঘোষণার পর অনেকেই উম্মু আইমানকে বিয়ের ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করেন। এই সৌভাগ্যটুকু লেখা ছিল জাইদ ইবনুল হারিসার ভাগ্যে। উম্মু আইমানের দ্বিতীয় বিয়ে হয় জাইদ ইবনুল হারিসার সাথে। তাদের সংসার আলো করে আসেন বিখ্যাত সাহাবি উসামা ইবনু জাইদ (রা.)। (তাবাকাতু ইবনি সাদ, খণ্ড: ৮, পৃষ্ঠা: ২২৪)

মহানবী (সা.) এবং উম্মু আইমান

নবী (সা.) উম্মু আইমানকে খুবই শ্রদ্ধা করতেন। তার ব্যাপারে নবীজি সবসময় সজাগ থাকতেন। তার সবকিছু খেয়াল রাখতেন। তিনি তাকে মা বলে ডাকতেন। কোনো বিষয়ে অভিমান করলে নবীজি তার মান ভাঙাতেন। (তাবাকাতু ইবনি সাদ, খণ্ড: ৮, পৃষ্ঠা: ২২৩)

আনাস ইবনু মালিক (রা.) বলেন, হিজরতের পর আনসার সাহাবিরা তাদের খেজুরের বাগান আল্লাহর রাসুলের হাতে সঁপে দেন। আল্লাহর রাসুল তখন সেসব খেজুর বাগান মুহাজিরদের মাঝে বণ্টন করে দেন। বনু কুরাইজা এবং বনু নাজির বিজয়ের পর আল্লাহর রাসুল আনসারদের বাগান তাদের মাঝে ফিরিয়ে দিতে শুরু করেন।

আনাস (রা.) বলেন, আমি তখন আমার বাগান ফেরত নেওয়ার জন্য উম্মু আইমানের কাছে যাই। কিন্তু তিনি আমার বাগান ফিরিয়ে দিতে অস্বীকার করেন। তখন আল্লাহর রাসুল তাকে বুঝিয়ে বললেন, আম্মাজান, আনাসের বাগান তাকে দিয়ে দিন। আমি এর চেয়ে ১০ গুণ বেশি সম্পদ দেব আপনাকে। তখন উম্মু আইমান আনাস ইবনু মালিকের বাগান ফিরিয়ে দেন। (তাবাকাতু ইবনি সাদ, খণ্ড: ৮, পৃষ্ঠা: ২২৫)

নবীজি (সা.) প্রায়ই উম্মু আইমানকে দেখতে তার ঘরে যেতেন। তাকে দেখলেই নবী (সা.) বলতেন, তিনি আমার পরিবারের অংশ। তিনি আমার মা। (তাবাকাতু ইবনি সাদ, খণ্ড: ৮, পৃষ্ঠা: ২২৩)। আয়িশা সিদ্দিকা (রা.) বলেন, একদিন আল্লাহর রাসুল পানি পান করছিলেন। তখন উম্মু আইমান বললেন, আল্লাহর রাসুল, আমাকেও পানি পান করান। আয়িশা বলেন, আমি বললাম, আপনি আল্লাহর রাসুলকে আদেশ দিচ্ছেন? তখন উম্মু আইমান বললেন, তাতে কী হয়েছে? আমার সে অধিকার আছে। আমি তার অনেক সেবা করেছি। তখন আল্লাহর রাসুল বললেন, আয়িশা, তিনি সত্য বলছেন। তিনি আমার জন্য অনেক করেছেন।

আনাস (রা.) বলেন, আল্লাহর রাসুলের সাথে আমিও প্রায়ই উম্মু আইমানকে দেখতে যেতাম। আমাদেরকে দেখলে তিনি খুবই খুশি হতেন। আমাদের সামনে খাবার এনে রাখতেন। আল্লাহর রাসুল কোনো কারণে না খেলে রাগ করে বলতেন, আপনি খাচ্ছেন না কেন? আল্লাহর রাসুল তার পীড়াপীড়ি দেখে মুচকি হাসতেন।

উম্মু আইমানের কারামত

উম্মু আইমান যখন হিজরতের জন্য মদিনায় রওনা করেন, সফরের একপর্যায়ে তার পানির পিপাসা লাগে। তার গলা ও ঠোঁট শুকিয়ে আসে। বিজন মরুভূমিতে আশেপাশে পানির কোনো চিহ্নও ছিল না। মনে হচ্ছিল পানির অভাবে তিনি মারা যাবেন। এমন সময় দেখা গেল আসমান থেকে ধীরে ধীরে একটি পানির পাত্র নেমে আসছে। পাত্রটি ধবধবে সাদা একটি রশি দিয়ে বাঁধা। সেই পাত্রটি উম্মু আইমানের একদম মুখের সামনে এসে থামে। তিনি তৃপ্তি সহকারে পানি পান করেন। উম্মু আইমান (রা.) বলেন, এরপর আমার আর কখনোই তীব্র পিপাসা লাগেনি। আমি প্রচণ্ড গরমের দিনেও রোজা রেখেছি। তবু আমার খুব বেশি পিপাসা লাগেনি। সবসময় মনে হয়েছে আমার বুকের মাঝে এক ধরনের কোমল শীতলতা জমে আছে। (তাবাকাতু ইবনি সাদ, খণ্ড: ৮, পৃষ্ঠা: ২২৪)

জিহাদের জাজবা

উম্মু আইমান (রা.) নবীজির সঙ্গে বিভিন্ন জিহাদে অংশগ্রহণ করেছেন। উহুদ যুদ্ধে তিনি মুজাহিদদের পানি পান করিয়েছেন এবং আহতদের সেবা করেছেন। খাইবার যুদ্ধে ২০ জন নারী সাহাবি অংশগ্রহণ করেন, তাদের মধ্যে উম্মু আইমানও ছিলেন। (আল-ইসাবা, খণ্ড: ৮, পৃষ্ঠা: ৩৬১)

খাইবার যুদ্ধে তার ছেলে আইমানের ঘোড়া অসুস্থ থাকায় তিনি সে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে পারেননি। উম্মু আইমান তখন তার ছেলেকে কাপুরুষ বলে তিরস্কার করেন। হাসসান ইবনু সাবিত এই বিষয়টি নিয়ে কবিতাও লিখেছেন। সেখানে তিনি আইমানের ঘোড়া যে অসুস্থ ছিল এবং এই কারণেই যে তিনি খাইবার যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে পারেননি, তা উল্লেখ করেছেন। খাইবার যুদ্ধের সময় আইমানের ঘোড়া বিষাক্ত আটা খেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েছিল।

হুনাইন যুদ্ধে আইমান (রা.) খুবই বীরত্বের সঙ্গে লড়াই করেন। হুনাইন যুদ্ধে যখন মুসলিম সৈনিকরা পিছু হটতে বাধ্য হয়েছিল, তখন হাতেগোনা কয়েকজন সাহাবি নবীজির সাথে ময়দানে দৃঢ়পদ ছিলেন। তাদের মধ্যে আইমান ছিলেন অন্যতম। অসীম বীরত্বের সাথে লড়াই করে তিনি এই যুদ্ধে শাহাদাত বরণ করেন। উম্মু আইমান (রা.) তার সন্তানের শাহাদাতে ধৈর্যধারণ করেন।

মুতার যুদ্ধে তার স্বামী জাইদ ইবনুল হারিসা শাহাদাত বরণ করেন। মুতার যুদ্ধে মুসলিম বাহিনীকে প্রেরণকালে নবী (সা.) বলেন, এই যুদ্ধে জাইদ ইবনুল হারিসা হবে তোমাদের সেনাপতি। সে শহিদ হলে সেনাপতি হবে জাফর ইবনু আবি তালিব। সে শহিদ হলে সেনাপতি হবে আব্দুল্লাহ ইবনু রাওয়াহা। সেও যদি শহিদ হয়ে যায়, তখন তোমরা নিজেদের মধ্য থেকে সেনাপতি নির্ধারণ করবে। শুধু সেনাপতিরা নন, নবীজির এই ভাষণ যারা শুনেছে, তারা সবাই জানত যে, এই তিনজন সেনাপতিই শাহাদাত বরণ করবেন। মৃত্যুর আগাম খবর শুনেও তারা বিপুল বিক্রমের যুদ্ধ করেছেন। গড়েছেন নজিরবিহীন ইতিহাস। একে একে শামিল হয়েছেন শহিদের কাফেলায়। উম্মু আইমান (রা.) তার স্বামীর শাহাদাতেও ধৈর্যধারণ করেন। (সিরাতু ইবনে হিশাম, খণ্ড: ২, পৃষ্ঠা: ৩৭৩-৩৮২)

উসামার প্রতি নবীজির মমতা

আরব বিজয়ের পর নবী (সা.) রোমে সৈন্য প্রেরণ করেন। সেই বাহিনীর সেনাপতি নিযুক্ত করেন উসামা ইবনু জাইদকে। বড় বড় সাহাবি থাকা সত্ত্বেও উসামার নেতৃত্ব মেনে নিতে অনেকেরই বাধছিল। তখন নবী ঘোষণা করলেন, এই বাহিনীর সেনাপতি উসামা ইবনু জাইদই হবে। আর সে সেনাপতি হওয়ার উপযুক্তও। নবী (সা.) উসামাকে কাছে ডেকে যাত্রা শুরু করার নির্দেশ দেন। বাহিনী নিয়ে উসামা (রা.) মদিনার অদূরে ‘জুরুফ’ নামক স্থানে পৌঁছান। এমন সময় উম্মু আইমান দূতের মাধ্যমে খবর পাঠান, আল্লাহর রাসুল খুব বেশি অসুস্থ। ফলে তিনি যাত্রাবিরতি দেন এবং মদিনায় ফিরে আসেন। নবী (স.) ততক্ষণে এই ক্ষণস্থায়ী দুনিয়া ছেড়ে পরম বন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়েছেন। (তাবাকাতু ইবনি সাদ, খণ্ড: ৮, পৃষ্ঠা: ২২৫)

নবীজির বিরহে কাতর উম্মু আইমান

নবী (সা.)-এর ইন্তেকালে উম্মু আইমান (রা.) দুঃখ এবং বেদনায় ভেঙে পড়েন। দুঃখের কবিতা পড়তে পড়তে এবং কাঁদতে কাঁদতে তার এমন অবস্থা হবে, কেউ তা কল্পনা করেনি। উম্মু আইমানের পুরোটা জীবন ছিল নবীজির স্মৃতি দিয়ে ঘেরা। তিনি শৈশবে তাকে কোলে নিয়েছেন, চোখের সামনে তাকে বেড়ে উঠতে দেখেছেন, তিনি তার যৌবন দেখেছেন, খাদিজাতুল কুবরার সাথে তার বিয়ে দেখেছেন, নবুয়তের সূচনা দেখেছেন, মুশরিকদের জুলুম-নির্যাতন দেখেছেন, মক্কার জীবন দেখেছেন, মদিনার জীবন দেখেছেন, নবীজির শাসন দেখেছেন। সেই পরম্পরায় নবীজির ইন্তেকালও তার দেখতে হবে, তা কি তিনি কখনো ভেবেছিলেন?

নবীজির ইন্তেকালের কিছুদিন পর আবু বকর এবং উমর উম্মু আইমানের ঘরে যান। তিনি তখনো নবীজির স্মরণে কান্না করছিলেন। তারা জিজ্ঞেস করলেন, আম্মাজান, আপনি কেন এত কান্না করছেন। আল্লাহর রাসুল তো তার পরম বন্ধু আল্লাহ তাআলার কাছেই আছেন। তিনি এখন আরও আরামে আছেন।

উম্মু আইমান (রা.) বললেন, তা তো আমিও জানি। কিন্তু ওহি তো আর কখনোই আসবে না, আল্লাহর রাসুলের জবানে আর শোনাও হবে না আল্লাহর পবিত্র কালাম, আমি কাঁদছি সেই দুঃখে। এ কথা শুনে তারাও কাঁদতে লাগলেন। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৪৫৪)

ইন্তেকাল

উম্মু আইমান (রা.) অনেক লম্বা এবং বরকতময় হায়াত পেয়েছিলেন। তার ছিল দুই পুত্রসন্তান। দুজনেই ছিলেন ঘোড়সওয়ার। দুজনকেই তিনি গড়ে তুলেছিলেন যোগ্য মুজাহিদরূপে। তিনি একই সঙ্গে শহিদের স্ত্রী এবং শহিদের জননী। ব্যক্তিজীবনে তিনি ছিলেন খুবই সহজ-সরল। নবীজির সারাটি জীবনজুড়ে তিনি ছায়ার মতো পাশে ছিলেন দরদি অভিভাবক হয়ে। পার্থিব জীবনের এক দীর্ঘ আলোকিত যাত্রা শেষে তৃতীয় খলিফা উসমান ইবনু আফফানের খিলাফতকালে তার পবিত্র আত্মা নশ্বর দুনিয়া ছেড়ে রবের পরম আশ্রয়ে চলে যান। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।

[সমকালীন প্রকাশন থেকে প্রকাশিত ‘জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত নারী সাহাবিদের জীবনকথা’ বই থেকে সংগৃহীত। ভাষান্তর করেছেন ওমর ইবনে আব্দুর রউফ]