জান্নাতে আল্লাহর প্রতিবেশী হতে চেয়েছেন যে নারী

আজ খতমে তারাবিতে পবিত্র কোরআনের ২৮তম পারা তেলাওয়াত করা হবে। সুরা মুজাদালা, সুরা হাশর, সুরা মুমতাহিনা, সুরা সাফ, সুরা জুমুআ, সুরা মুনাফিকুন, সুরা তাগাবুন, সুরা তালাক ও সুরা তাহরিম পড়া হবে। আকজের তারাবিতে আল্লাহর প্রশংসা, আল্লাহর দ্বীনের সাহায্যকারী, তালাক, পারিবারিক ও বৈবাহিক জীবন, স্ত্রীর ভরণপোষণ, আল্লাহ এবং শয়তানের দল, কৃপণতা, বৈঠকের আদব, আনসারদের সুসংবাদ, কাফেরের সঙ্গে মুসলমানদের আচরণ নীতি, ইহুদি সম্প্রদায়, রিসালাতের উদ্দেশ্য, মহানবী (সা.)-এর গুণাগুণ,আজান হলেই জুমার নামাজে যাওয়া, কানাঘুষা, কাফেরদের পরিণতি, দুনিয়াতে নারীর জান্নাতের সুসংবাদ, আল্লাহর পথে ব্যয়, ইবাদতের জন্য মুমিনের আফসোস ইত্যাদি বিষয়ের আলোচনা রয়েছে।
স্ত্রীকে মায়ের সঙ্গে তুলনা করা যাবে না
স্ত্রীকে স্থায়ীভাবে হারাম নারীর হারাম অঙ্গের সঙ্গে তুলনা করা হলো ‘জিহার’। যেমন: স্ত্রীকে এ কথা বলা ‘তুমি কিংবা তোমার ওই অঙ্গ আমার মা-বোনের মতো’। হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর যুগে এমন ঘটনা ঘটেছিল। সাহাবি আওস ইবনে সামেত (রা.) স্ত্রীকে মায়ের সঙ্গে তুলনা করেছিলেন।
আওসের স্ত্রী খাওলা (রা.)-এর আর্তনাদকে কেন্দ্র করে শরিয়তের একটি গুরুত্বপূর্ণ সমাধান নিয়ে সুরা মুজাদালার শুরুর আয়াতগুলো নাজিল হয়। আওস খাওলাকে বললেন, ‘তুমি আমার জন্য আমার মায়ের পিঠের মতো’, অর্থাৎ ‘তোমাকে আমার জন্য আমার মায়ের মতো হারাম করলাম।’ ইসলামপূর্ব যুগে এ বাক্যটি স্ত্রীকে চিরতরে হারাম করে দেওয়ার জন্য বলা হতো। খাওলা পেরেশান হয়ে মহানবীর কাছে এলেন। কিন্তু সমাধান পেলেন না। ইসলামে তখনো এ বিধান সম্পর্কে বিধান নাজিল হয়নি। তিনি মহানবীর সঙ্গে বাদানুবাদ শুরু করে দিলেন। পরে খাওলা কেঁদে কেঁদে আল্লাহকে ডাকতে লাগলেন। তখন আল্লাহ এর সমাধান দিয়ে সুরা মুজাদালার ১ থেকে ৫ নম্বর আয়াত নাজিল করেন। সেখানে বলা হয়, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বৈবাহিক সম্পর্ক বহাল থাকবে না যতক্ষণ না স্বামী কাফফারা আদায় করবে। জিহারের কাফফারা হলো ধারাবাহিকভাবে দুই মাস রোজা রাখা বা ৬০ জন অসহায় ব্যক্তিকে খাবার খাওয়ানো।
সুরা হাশরের শেষ তিন আয়াত পড়ার ফজিলত
২৪ আয়াত বিশিষ্ট সুরা হাশর মক্কায় অবতীর্ণ। এটি কোরআনের ৫৯তম সুরা। এ সুরায় আল্লাহর প্রশংসা, অপরাধের কারণে বুন নাজিরকে মদিনা থেকে বহিষ্কার, যুদ্ধ ছাড়াই অর্জিত সম্পদের বণ্টননীতি, আনসারদের সুসংবাদ, মুনাফিকদের নিন্দা ও তাকওয়ার বর্ণনা রয়েছে।
সুরা হাশরের শেষ তিন আয়াত তেলাওয়াতে আছে প্রভূত কল্যাণ। মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘যে সকালে তিনবার ‘আউজু বিল্লাহিস সামিয়িল আলিমি মিনাশ শায়তানির রাজিম’ পড়ে সুরা হাশরের শেষ তিন আয়াত পাঠ করে, আল্লাহ তার জন্য ৭০ হাজার ফেরেশতা নিযুক্ত করেন, যারা তার জন্য সন্ধ্যা পর্যন্ত মাগফিরাতের দোয়া করতে থাকে। এ সময়ে সে মারা গেলে শহীদের মৃত্যু লাভ করবে। যে এটি সন্ধ্যায় পড়বে, তার জন্য একই মর্যাদা রয়েছে।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৩০৯০)
সুরা মুমতাহিনার বিষয়বস্তু
মক্কায় অবতীর্ণ সুরা মুমতাহিনার আয়াত সংখ্যা ১৩। এটি কোরআনের ৬০তম সুরা। এ সুরায় কাফেরদের সঙ্গে মুসলমানদের আচরণনীতি, কিয়ামতের দিন কেউ কারও উপকারে না আসা, ইবরাহিম (আ.)-এর আদর্শ, বিশ্বাসী মানুষের সঙ্গে উত্তম ব্যবহার, ইমানদার নারী কাফেরের জন্য হারাম এবং মুসলমান পুরুষের জন্য কাফের নারী হারাম ইত্যাদির বর্ণনা রয়েছে।
যা আছে সুরা সফে
কোরআনের ৬১তম সুরা সফ। এর আয়াত সংখ্যা ১৪। এটি মদিনায় অবতীর্ণ। এ সুরায় আল্লাহর প্রশংসা ও পবিত্রতা, ওয়াদার বিষয়ে যত্নশীল হওয়ার জন্য মুসলমানদের প্রতি কঠোর সতর্কতা, মুমিনদের প্রতি আল্লাহর ভালোবাসা, জিহাদ, মহানবীর বিষয়ে ইসা (আ.)-এর সুসংবাদ, জীবন-সম্পদ দিয়ে আল্লাহর পথে সংগ্রাম, আল্লাহর সাহায্য ও মুমিনদের গুনাহ মাফের বিষয়ে আলোচনা আছে।
জুমার নামাজের গুরুত্ব
মুসলমানদের সমাবেশের দিন জুমার দিন। এটি সপ্তাহের সেরা দিন। আমলের দিন। আল্লাহ পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ যথাসময়ে জামাতে পড়ার তাগিদ দিয়েছেন। জুমার নামাজের বিষয়ে আজানের সঙ্গে সঙ্গে মসজিদে যাওয়ার নির্দেশনা দিয়েছেন। সুরা জুমার ৯ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনরা, জুমার দিনে যখন নামাজের জন্য ডাকা হয়, তখন আল্লাহর স্মরণের দিকে শিগগির ধাবিত হও, ক্রয়-বিক্রয় ছেড়ে দাও, এটাই তোমাদের জন্য অতি উত্তম, যদি তোমরা জানতে!’
জান্নাতে আল্লাহর প্রতিবেশী হতে চেয়েছেন যে নারী
প্রাচীন মিসরের ফেরাউনের স্ত্রী ছিলেন আসিয়া বিনতে মুজাহিম। তিনি ছিলেন এক আল্লাহ বিশ্বাসী মহীয়সী নারী। ছিলেন মানুষের প্রতি দয়ালু ও সহানুভূতিশীল। তার স্বামী ফেরাউন নিজেকে খোদা বলে দাবি করত। সে ছিল অত্যাচারী ও বদমেজাজি বাদশাহ। আসিয়া ফেরাউনের স্ত্রী ছিলেন ঠিকই, কিন্তু ফেরাউনের দুশ্চরিত্রের কোনো স্বভাব তাকে গ্রাস করতে পারেনি। তিনি এক আল্লাহর ওপর ইমান আনেন।
নিজের স্ত্রী অন্যের উপাসনা করে এমন খবর জানতে পেরে ফেরাউন স্ত্রীকে বোঝাতে থাকেন। কিন্তু আসিয়া সত্য ধর্মের ওপর পাহাড়ের মতো অবিচল, অটল। ফেরাউন বিশেষ লোকদের সঙ্গে পরামর্শ করে আসিয়াকে হত্যার নির্দেশ দেয়। ফেরাউনের সৈন্য-সামন্ত তার হাত-পা বেঁধে উত্তপ্ত সূর্যের নিচে ফেলে রাখে। ক্ষতবিক্ষত করা হয় শরীর। তবুও তিনি ইমান ছাড়েননি। জীবনের বিনিময়ে ইমান রক্ষা করেন। দুনিয়ার রাজপ্রাসাদের বিনিময়ে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেন জান্নাতে আল্লাহর পাশে একটি ঘর। কোরআনে আছে, ‘হে আমার রব, আমার জন্য আপনাকে জান্নাতে একটি ঘর নির্মাণ করুন। আমাকে ফেরাউন ও তার দুষ্কর্ম থেকে উদ্ধার করুন। আমাকে মুক্তি দিন অত্যাচারী সম্প্রদায় থেকে।’ (সুরা তাহরিম, আয়াত: ১১)