কবর জিয়ারত ও সালাম দিলে মৃতরা কি টের পান

পৃথিবীর বুকে সবচেয়ে বড় সত্য মৃত্যু। মৃত্যু অবধারিত। মানুষের বেঁচে থাকাটা অস্বাভাবিক, কিন্তু মৃত্যু খুবই স্বাভাবিক। পৃথিবীর প্রথম মানুষ থেকে শুরু করে নির্ধারিত জীবনযাপনের পর কেউ আর বেঁচে নেই। আল্লাহ বলেন, ‘প্রত্যেক প্রাণীকেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে।’ (সুরা আনয়াম, আয়াত : ১৮৫)
পৃথিবীর সব মানুষকে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে, এটা সবাই জানে। মৃত্যু নিয়ে মানুষের কল্পনা-জল্পনারও শেষ নেই। নিকটাত্মীয় কেউ মারা গেলে আমরা অনেকেই কবর জিয়ারত করতে যাই। তাদের জন্য দোয়া করি। সওয়াব পাঠাই। সালাম দিই। অনেকেই জানতে চান, কবর জিয়ারতের বিষয়টি মৃতরা কি অনুভব করতে পারেন? কিংবা তারা কি আমাদের সালাম শুনতে পান?
মৃতরা জীবিতদের জিয়ারত ও সালাম শুনতে পান কি না, বিষয়টি নিয়ে ইসলামের শুরুর যুগেও মতভেদ ছিল। কেউ বলেছেন শুনতে পান। কেউ বলেছেন, বিষয়টি নিশ্চিত নয়। তবে অধিকাংশ সালাফ, নির্ভরযোগ্য আলেম ও ফকিহদের মতে, মৃতব্যক্তি জিয়ারতকারীর কথা শুনতে পান এবং সালামের উত্তর দেন।
ইসলাম বিশেষজ্ঞরা বলেন, মৃত ব্যক্তিকে আল্লাহ তাআলা সালামের উত্তর দেওয়ার জন্য আত্মা বা রুহ দেন। পরে তিনি উত্তর দেন। তবে তার সালামের উত্তর জীবিতরা শুনতে পান না।
হজরত মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন, ‘যখন কোনো মুসলিম ব্যক্তি দুনিয়ায় পরিচিত তার কোনো মৃত ভাইয়ের কবরের পাশ দিয়ে গমন করে এবং তাকে সালাম দেয় তখন তার সালামের জবাব দেওয়ার জন্য আল্লাহ তার রুহকে ফেরত দেন।’ (আল-ইসহিজকার, খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ১৮৫)। এ হাদিস দিয়ে বোঝা যায়, মৃত ব্যক্তি তাকে চিনতে পারেন এবং তার সালামের জবাব দেন।
রাসুলুল্লাহ (সা.) কবরবাসীদের জীবিতদের মতো সম্বোধন করে সালাম দিতে বলেছেন। এক হাদিস দিয়ে বোঝা যায়, জানাজা শেষে কবরের পাশে জীবিতদের কিছুক্ষণ অবস্থান মৃতব্যক্তি পছন্দ করেন। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১২১)
ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো নিকটাত্মীয়ের কবর জিয়ারত করে এবং সেখানে বসে তার জন্য দোয়া করে, মৃত ব্যক্তি তা বুঝতে পারে এবং এতে আনন্দিত হয়।’ (ইবনে কাইয়িম, আর-রুহ, পৃষ্ঠা: ৫)
ইমাম কুরতুবি (রহ.) বলেন, ‘মৃতরা জীবিতদের কণ্ঠস্বর শুনতে পান এবং তাদের পদচারণাও অনুভব করেন।’ (আজ-তাজকিরা, পৃষ্ঠা: ১০০-১২০)
আল্লাহ মৃতদের মাঝে এমন ক্ষমতা দেন যে তারা দুনিয়ার কিছু নির্দিষ্ট সংবাদ ও সম্পর্কিত বিষয়ে সম্পর্কে অবগত হতে পারেন বলে মনে করেন ইমাম ইবনু তাইমিয়া ও ইমাম ইবনে কাইয়ুম।

আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান শায়খ আহমাদুল্লাহ ইউটিউবে এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘মৃত ব্যক্তির কবরের পাশে দাঁড়িয়ে জিয়ারত করলে বা মৃত ব্যক্তিকে সালাম দিলে তিনি সেটা টের পান। তাদের ধ্বংসাবশেষ মাটির সঙ্গে মিশে গেলেও বারজাখি জীবনে (মৃত্যু থেকে কেয়ামত পর্যন্ত) আল্লাহ তাদেরকে এক প্রকারের রুহ বা আত্মা দেন। আল্লাহ যেগুলো তাদের অনুভব করাতে চান, সেটা এর মাধ্যমে অনুভব করান।’
তিনি বলেন, ‘অধিকাংশ সালাফদের মতে, মৃত ব্যক্তিকে কবরের পাশে দাঁড়িয়ে সালাম দেওয়া হলে তিনি সালামের উত্তর দেন। উত্তরটা মানুষ শুনতে পায় না। তবে এ বিষয়ে সমকালীন আলেমদের কেউ কেউ ভিন্নমত পোষণ করেছেন। তাদের মতে, মৃত ব্যক্তিরা সালাম শুনতে পায় কি না বা কবর জিয়ারত টেয় পায় কি না, এটা হাদিস দিয়ে স্পষ্টভাবে প্রমাণিত নয়।’
কবর জিয়ারতের দোয়া
কবর জিয়ারত করা মহানবী (সা.)-এর সুন্নত। এটা ইবাদতও। এতে অন্তর নরম হয়। মৃত্যুর কথা স্মরণ হয়। আখেরাতের কথা মনে পড়ে। দুনিয়াবিমুখতা তৈরি হয়। ইসলামের শুরুর দিকে কবর জিয়ারতের অনুমতি ছিল না। পরে রাসুলুল্লাহ (সা.) কবর জিয়ারতের অনুমতি দেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আমি তোমাদের কবর জিয়ারতে নিষেধ করেছিলাম, এখন থেকে কবর জিয়ারত করো। কারণ, তা দুনিয়াবিমুখতা এনে দেয় এবং আখেরাতের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ১৫৭১)
আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) মদিনার কবরবাসীর পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় এই দোয়া পড়েন—
السَّلاَمُ عَلَيْكُمْ يَا أَهْلَ الْقُبُورِ يَغْفِرُ اللَّهُ لَنَا وَلَكُمْ أَنْتُمْ سَلَفُنَا وَنَحْنُ بِالأَثَرِ
উচ্চারণ: আসসালামু আলাইকুম ইয়া আহলাল কুবুর, ইয়াগফিরুল্লাহু লানা ওয়ালাকুম। আংতুম সালাফুনা, ওয়া নাহনু বিল আসার।
অর্থ: হে কবরবাসী, তোমাদের ওপর শান্তি বর্ষিত হোক। আল্লাহ আমাদের ও তোমাদের ক্ষমা করুন, তোমরা আমাদের আগে কবরে গিয়েছ এবং আমরা পরে আসছি। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস : ১০৫৩)
