যে কারণে ধ্বংস হয়েছিল প্রাচীন ৬ জাতি

আজ ষষ্ঠ তারাবি। খতমে তারাবিতে কোরআনের অষ্টম পারার শেষ অর্ধেক এবং নবম পারার পুরো অংশ তেলাওয়াত করা হবে। পারা হিসেবে মোট দেড় পারা পড়া হবে। সুরা আরাফের ১২ থেকে সুরা আনফালের ৪০ নম্বর আয়াত পর্যন্ত। এই অংশে আদম ও হাওয়া (আ.) দুনিয়ায় আসার ঘটনা, নবীরা নিজ নিজ সম্প্রদায়কে কী বলেছিলেন, জবাবে সম্প্রদায়ের নেতৃস্থানীয় লোকজন কী বলেছিল, ফলে আল্লাহ কী করেছেন, শয়তানের ধোঁকা, লজ্জা, বিভিন্ন জাতি ধ্বংসের কারণ, মুসা (আ.)-এর মোজেজা, অপচয়, আল্লাহর একত্ববাদের প্রমাণ, বনি ইসরাইলের ওপর আল্লাহর শাস্তি, শয়তানের ধোঁকা থেকে মানুষকে বাঁচার নির্দেশ, মুসা (আ.)-এর লাঠি ও ফেরাউনের জাদুর সাপসহ নানা বিষয় আলোচিত হয়েছে।
নামাজের পোশাক যেমন হবে
আল্লাহ তাআলা মানুষের পরিধেয় পোশাক নিয়ে সুরা আরাফে তিনবার আলোচনা করেছেন। নির্দেশ দিয়েছেন মানুষকে সতর ঢেকে রাখতে ও নামাজে উত্তম পোশাক পরিধান করতে। ইসলামে সতর ঢেকে রাখা ফরজ। মুমিন কখনো সতর খোলা রেখে চলতে পারে না। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘পুরুষদের সতর নাভি থেকে হাঁটু পর্যন্ত এবং নারীদের সতর মুখমণ্ডল, হাতের তালু এবং পদযুগল ছাড়া অবশিষ্ট দেহ।’ (হাদিস)।
নামাজ আদায় করতে হবে পবিত্র দেহ, পরিপাটি ও উত্তম পোশাকে। নিজের সবচেয়ে ভালো পোশাক পরে আল্লাহর সামনে দাঁড়ানো উচিত।
অনেকেই আছেন, নামাজে দাঁড়ান অপরিচ্ছন্ন পুরোনো পোশাকে, অপ্রস্তুত এলোমেলো হয়ে। কিন্তু অন্য অনেক কারণে আমরা নতুন পোশাক পরি। আল্লাহ বলেন, ‘হে আদম সন্তান, প্রত্যেক নামাজের সময় সাজসজ্জা (সুন্দর পোশাকপরিচ্ছদ) গ্রহণ করো।’ সুরা আরাফ, আয়াত: ৩১)
জান্নাতি, জাহান্নামি ও আরাফবাসীর কথোপকথন
জান্নাতি, জাহান্নামি ও আরাফবাসীদের কথোপকথনের আলোচনা আছে সুরা আরাফের ৪৬ থেকে ৪৮ নম্বর আয়াতে। জান্নাতিরা জাহান্নামিদের ডেকে বলবে, ‘আমাদের সঙ্গে আমাদের প্রতিপালক যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তা আমরা সত্য পেয়েছি। তোমরা কি তোমাদের প্রতিপালকের প্রতিশ্রুতি সত্য পেয়েছ।’
তারা বলবে, ‘হ্যাঁ।’ এরপর একজন ঘোষণা দেবেন, ‘জালিমদের ওপর আল্লাহর অভিসম্পাত।’
আরাফে থাকবে ওই সমস্ত মুমিন, যারা নেক আমলের ক্ষেত্রে অন্য জান্নাতিদের চেয়ে পিছিয়ে পড়েছে। তারা না জান্নাতি, না জাহান্নামি। পরে অবশ্যই আল্লাহ তাদের জান্নাতে প্রবেশ করাবেন। এদেরকে কোরআনের ভাষায় ‘আসহাবুল আরাফ’ বলা হয়।
যে কারণে ধ্বংস হয়েছিল ৬ জাতি
কওমে নুহ, আদ, সামুদ, কওমে লুত, মাদায়েনবাসী ও বনি ইসরাইল সম্প্রদায়ের অবাধ্যতা ও গজবে ধ্বংস হওয়ার আলোচনা রয়েছে এ সুরার ৬৫ থেকে ৮৭ নম্বর আয়াতে।
- কওমে নুহের নবী ছিলেন নুহ (আ.)। মূর্তিপূজা পরিত্যাগ না করার কারণে ভয়ংকর বন্যা ও জলোচ্ছ্বাস দিয়ে তাঁর জাতিকে ধ্বংস করা হয়েছিল।
- আদ জাতির নবী ছিলেন হুদ (আ.)। শক্তি ও ক্ষমতার বাহাদুরি এবং মূর্তিপূজা না ছাড়ার কারণে বিভিন্ন আজাব দিয়ে আদ জাতিকে ধ্বংস করা হয়েছিল।
- সামুদ জাতির নবী ছিলেন সালেহ (আ.)। আল্লাহর নিদর্শন বিশেষ একটি উট হত্যার কারণে ভূমিকম্প দিয়ে সামুদ জাতিকে ধ্বংস করা হয়।
- কওমে লুতের নবী ছিলেন লুত (আ.)। সমকামিতার অপরাধে ভূমি উল্টে পাথরবৃষ্টি দিয়ে লুত (আ.)-এর জাতিকে ধ্বংস করা হয়েছিল।
- মাদায়েনবাসীর নবী ছিলেন শোয়াইব (আ.)। তাওহিদে অবিশ্বাস, মাপে কম দেওয়া, সম্পদ আত্মসাৎ, অর্থনৈতিক অসততা ও মানুষকে ধর্ম পালনে বাধা দেওয়ায় ভূমিকম্প দিয়ে মাদায়েন জাতিকে ধ্বংস করা হয়েছিল।
- বনি ইসরাইলের নবী ছিলেন মুসা (আ.)। নিজের ক্ষমতার প্রতি অন্ধ মোহ, মুসা ও হারুন (আ.)-কে হত্যার পরিকল্পনা করার কারণে ফেরাউন ও তার জাতিকে নীল নদে ডুবিয়ে ধ্বংস করা হয়েছিল।
আলেম ও সাধকের পথভ্রষ্ট হওয়ার কারণ
আল্লাহ তাআলা জ্ঞানী বালয়াম ইবনে বাউরার ঘটনা তুলে ধরেছেন সুরা আরাফের ১৭৫ ও ১৭৬ আয়াতে। বালয়াম স্বীয় জ্ঞান দুনিয়ার তুচ্ছ জিনিসের বিনিময়ে বিক্রি করার কারণে অপদস্থ ও ধ্বংস হয়েছিল। বালয়াম ছিল একজন বিজ্ঞ আলেম ও সাধক। বায়তুল মুকাদ্দাসের নিকটবর্তী কেনানের অধিবাসী। তখন মুসা (আ.)-এর সময়কাল। মুসা (আ.) জাব্বারিন (আধিপত্যবাদী) সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য সৈন্যবাহিনী নিয়ে সিরিয়ায় আসেন। এদিকে বালয়াম ইবনে বাউরার গোত্রের লোকেরা তার কাছে এসে মুসার বিরুদ্ধে বদদোয়া কামনা করল। বালয়াম নবি মুসা (আ.)-এর কথা শুনে তাদের ধিক জানিয়ে বিদায় দিল। লোকেরা আবার এল। বালয়াম বলল, ‘আমি আল্লাহর কাছে অনুমতি চেয়েছিলাম, তিনি নিষেধ করেছেন।’ তখন লোকেরা তাকে উপহার দিল। সে তা গ্রহণ করল। লোকেরা তাদের চাওয়া অব্যাহত রাখল। বালয়াম আল্লাহর কাছে আবার অনুমতি চাইল। এবার কোনো উত্তর পাওয়া গেল না। লোকেরা বলল, আল্লাহ যেহেতু কিছুই জানালেন না, এবার তবে দোয়া করুন। বালয়াম দোয়া করতে গিয়ে আল্লাহর কুদরতে নিজ সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধেই দোয়া করল। নিজ সম্প্রদায়ের ওপর ধ্বংস নেমে এল। তার জিহ্বা বেরিয়ে এসে বুকের ওপর লটকে গেল। (তাফসিরে মাআরেফুল কোরআন, মুফতি মুহাম্মাদ শফি, অনুবাদ: মাওলানা মুহিউদ্দীন খান, পৃষ্ঠা: ৫০১)
যুদ্ধবিষয়ক বিধান আছে সুরা আনফালে
সুরা আনফাল কোরআনের অষ্টম সুরা। এটি মদিনায় অবতীর্ণ। এ সুরার আয়াত সংখ্যা ৭৫। আনফাল ‘নফল’ শব্দের বহুবচন। অর্থ অতিরিক্ত। কাফেরদের সঙ্গে যুদ্ধ চলাকালে যে সম্পদ মুসলিমদের হস্তগত হয়, তাকে নফল বা গনিমত বলা হয়। এ সুরায় গনিমতের সম্পদ বণ্টন নিয়ে আলোকপাত করায় এ সুরাকে আনফাল বলা হয়।
আজ তারাবিতে সুরা আনফালের ১ থেকে ৪০ নম্বর আয়াত পড়া হবে। এ অংশে বিশেষ করে গনিমতের সম্পদ বণ্টনের নীতি, নবিজির বিরুদ্ধে কাফেরদের ষড়যন্ত্র, বদর যুদ্ধের বিস্তারিত বিবরণ, আল্লাহর পথে জিহাদ, ঈমানদারের বৈশিষ্ট্য, মুসলমানদের অভিভাবক আল্লাহ ও কাফেরদের ঠিকানা জাহান্নাম ইত্যাদি বিষয়ের আলোচনা রয়েছে।