logo
Advertisement
কোরআনের গল্প

আদেশ অমান্য করায় যাদের বানর বানিয়ে শাস্তি দিয়েছিলেন আল্লাহ

আদেশ অমান্য করায় যাদের বানর বানিয়ে শাস্তি দিয়েছিলেন আল্লাহ
বনি ইসরাইলের এ গোষ্ঠী লোহিত সাগরের তীরে আয়লা জনপদে বসতি গড়েছিল। ছবি: সংগৃহীত

এক দিন গ্রামের মাঝখানে দেয়াল তুলে দিল তারা। এক পাড়ায় আল্লাহ বিশ্বাসীদের বাস, অন্য পাড়ায় অবিশ্বাসীরা। অবিশ্বাসীদের পাড়ায় যেসব বিশ্বাসীর সাধ্যমতো ছড়ানো-ছিটানো ঘরবাড়ি ছিল, তারা ঘরের দরজা বন্ধ করে দিল। একসময় একসঙ্গে বয়ে চলা মানুষদের কারও সঙ্গে কারও কুশল নেই। কথাবার্তা নেই। পানাহার নেই। কেনাবেচা নেই। সামাজিক কর্মকাণ্ড নেই। কোনো সম্পর্ক আর অবশিষ্ট থাকল না। তবে এক পাড়ার আওয়াজ-শোরগোল অন্য পাড়া থেকে শোনা যায়। মানুষের ছুটে চলা অনুভব করা যায়। পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়। এভাবেই প্রতিদিন ভোর হয়। সন্ধ্যা আসে। রাতের পর্দা নামে দুই পারার আকাশে। একসময় বিশ্বাসীরা খেয়াল করলেন, দেয়ালের ওপাশ থেকে আওয়াজ আসছে না। বন্ধ দরজার ভেতরে নেই কোনো শব্দ কোলাহল। মানুষের ছুটে চলা নেই। পায়ের বিচরণ নেই। কারও গতিবিধি অনুভূত হচ্ছে না। দরজা বা দেয়ালের পর যেন গ্রাম থেকে দূরে পুরোনো কবরস্থানের নীরবতা। তারা শঙ্কা ও দ্বিধা নিয়ে বাইরে বেরিয়ে এক আশ্চর্য অবস্থা দেখল। অবিশ্বাসী মানুষরা সব বানর ও শূকর হয়ে গেছে।

Advertisement

বানর ও শূকররা তাদের পায়ের কাছে গড়াগড়ি শুরু করল। ইশারা-ইঙ্গিতে নিজেদের অপদস্থ ও লাঞ্ছনার অবস্থা প্রকাশ করল। বিশ্বাসীরা বলল, আমরা তো তোমাদের সতর্ক করেছিলাম। আজাবের ভয় দেখিয়ে ছিলাম। অবিশ্বাসীরা পশুর মতো মাথা নাড়িয়ে তাদের কথা স্বীকার করল। চোখের পানিতে অপরাধ মেনে নিল। (কাসাসুল কোরআন, মুফতি হিফজুর রহমান, অনুবাদ: আব্দুস সাত্তার আইনী, খণ্ড: ৮, পৃষ্ঠা: ৩৮)

মুসা (আ.) পৃথিবী ছেড়ে গেছেন দীর্ঘকাল হলো। বনি ইসরাইলের এক গোষ্ঠী লোহিত সাগরের তীরে বসতি গড়েছিল—আয়লা জনপদে। (কেউ কেউ বলেন, এটি দাউদ (আ.)-এর কালের ঘটনা)। মাছ শিকারই ছিল তাদের প্রধান পেশা। অত্যন্ত প্রিয় কাজও। সপ্তাহের ছয় দিন তারা এ কাজ করত। শনিবার দিনটি আল্লাহর ইবাদতে ব্যয় করত। এদিন মাছ ধরা ছিল হারাম। প্রভুপ্রেমে ডুবে থাকাই ছিল এ দিনের মূল কাজ।

মাছেরাও বাঁচতে চাইত। তারা ছয় দিন সাগরের গভীরে লুকিয়ে থাকত। শনিবারে সাগরের পাড়ে ঝাঁকে ঝাঁকে মাছ আসত। পানির ওপর মাছ ভাসত। যেন হাত বাড়ালেই অঞ্জলি ভরে আসে। এটা ছিল আল্লাহর পক্ষ থেকে পরীক্ষাও। তারাও আল্লাহর সঙ্গে ওয়াদা করেছিল এ দিন মাছ ধরবে না। আল্লাহর তাআলা বলেন, ‘তাদের আরও বলেছিলাম, শনিবারে সীমা লঙ্ঘন করো না এবং তাদের থেকে দৃঢ় ওয়াদা নিয়েছিলাম।’ (সুরা নিসা, আয়াত: ১৫৪)

এত মাছ দেখে ধৈর্যধারণ করা তাদের জন্য মুশকিল হয়ে পড়ল। তাদের ধৈর্য বেশি দিন স্থায়ী হলো না। মাছ ধরতে এক অভিনব কৌশল অবলম্বন করল। জুমার দিন সন্ধ্যায় সাগরের কিনারে ছোট ছোট হাউজ বা গর্ত বানাল তারা। সাগর থেকে হাউজে পানি আসার নালা করল। শনিবারে মাছের ঝাঁক পানির ওপর ভেসে উঠলে সাগরের পানি ছেড়ে দিত তারা। নালা দিয়ে পানি প্রবাহের সঙ্গে মাছও আসত হাউজে। শনিবার সন্ধ্যায় হাউজের মুখ বন্ধ করে দিত, যাতে মাছ চলে না যায়। রোববার খুব ভোরে তারা হাউজ থেকে মাছ ধরত। (তাফসিরে মারিফুল কোরআন, মাওলানা ইদরিস কান্ধলভি, অনুবাদ: রাইহান খাইরুল্লাহ, খণ্ড: ৩, পৃষ্ঠা: ৫১৬)

এদিকে কিছু লোক জুমার দিন জাল ও বড়শি ফেলে রাখত। শনিবারে ভেসে আসা মাছ এগুলোতে ফেঁসে যেত। রোববার সকালে মাছ ধরত। এভাবে মাছ ধরে তারা বেশ আনন্দিত ছিল। আল্লাহবিশ্বাসীরা তাদের এ ধরনের কাজ থেকে নিষেধ করলেন। তখন তারা ফুরফুরে মেজাজে বলল, আমরা তো শনিবারে মাছ শিকার করছি না। আমরা যে কৌশলে মাছ শিকার করি, এটা তো নিষিদ্ধ নয়। তারা এ ভেবে তৃপ্তির ঢেকুরও গিলত যে, আমাদের অজুহাত আল্লাহর কাছে গৃহীত হবে।

তাদের কৌশলের কথা অন্যরাও জেনে গেল। তারাও তাদের কৌশল অনুসরণ করল। ধীরে ধীরে বনি ইসরাইলের বড় একটা অংশ কৌশল ও বাহানার অন্তরালে মাছ শিকার করতে লাগল। নষ্ট করল শনিবারের পবিত্রতা। লঙ্ঘন করল আল্লাহর বিধান। আল্লাহ বিশ্বাসী মানুষরা তাদের এ হীন কাজ থেকে বিরত থাকতে বুঝালেন। সৎ কাজের আদেশ করলেন, অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করলেন। কিন্তু তারা এসবের পরোয়া করল না। আল্লাহর অবাধ্যতায় অটল থাকল। কৌশলের বেড়াজালে নিজেদের আত্মতুষ্ট রাখল।

বিশ্বাসীদের মধ্যে দুটি দল হলো। একদল বললেন, তাদের আর দাওয়াত দিয়ে লাভ নেই। তারা এ কাজ পাপ মনে করছে না। তারা বরং কৌশল অবলম্বনে তুষ্টিতে ভুগছে। তাদের ওপর খুব শিগগিরই আজাব নেমে আসবে। অন্যদলটি বলল, আমরা তাদের উপদেশ দিয়ে যাব। হয়তো তারা একদিন সঠিক পথে ফিরে আসবে। কেয়ামতের দিন আল্লাহকে বলব, আমরা তাদের শেষ পর্যন্ত বুঝিয়েছি, আমরা অপারগ। (কাসাসুল কোরআন, মুফতি হিফজুর রহমান, অনুবাদ: আব্দুস সাত্তার আইনী, খণ্ড: ৮, পৃষ্ঠা: ৩৬)

অবিশ্বাসীরা কৌশলের ওপরই অটল থাকল। আল্লাহর অবাধ্যতা করল। শনিবারের পবিত্রতা নষ্ট করল। এ দিন মাছ শিকারে চূড়ান্তরূপে বেপরোয়া হয়ে পড়ল। আল্লাহ তাদের প্রতি অসন্তুষ্ট হলেন। আল্লাহ বলেন, ‘(হে নবী) তাদেরকে সমুদ্র-তীরবর্তী জনপদের অধিবাসীদের সম্পর্কে জিজ্ঞেস করো, তারা শনিবারে সীমালঙ্ঘন করত; শনিবার পালনের দিন মাছগুলো ভেসে তাদের কাছে আসত। আর যেদিন শনিবারের অনুষ্ঠান থাকত না সেদিন সেগুলো আসত না। এভাবে আমি তাদের পরীক্ষা করেছিলাম, যেহেতু তারা সত্যত্যাগ করত। স্মরণ করো, (যেসব সৌভাগ্যবান ব্যক্তি নাফরমানদের নসিহত করত) তাদের একদল বলেছিল, ‘আল্লাহ যাদেরকে (তাদের দুর্ভাগ্যের কারণে) ধ্বংস করবেন অথবা কঠোর শাস্তি দেবেন, তোমরা তাদেরকে সদুপদেশ দাও কেন?’ তারা বলেছিল, ‘তোমাদের প্রতিপালকের কাছে (কেয়ামতের দিন) দায়িত্ব-মুক্তির জন্য (যে, আমরা আমাদের দায়িত্ব পালন করেছি) এবং যাতে তারা (তাদের নাফরমানি) সাবধান হয়ে যায়, এজন্য।’ যে উপদেশ তাদের দেওয়া হয়েছিল তারা যখন তা ভুলে যায়, তখন যারা অসৎ কাজ থেকে নিবৃত্ত করত তাদের আমি উদ্ধার করি এবং যারা জুলুম করে তারা কুফরি করত বলে আমি তাদের কঠোর শাস্তি দিই।’ (সুরা আরাফ, আয়াত: ১৬৩-১৬৬)

তারা যেভাবে কৌশল অবলম্বন ও বাহানার মাধ্যমে আল্লাহর বিধানকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করেছে, আল্লাহও তাদের আসল রূপ ও চেহারা বিকৃত করে দিলেন। তাদের বানর বানিয়ে দিলেন। তারা সৃষ্টির সেরা জীব মানুষের মর্যাদা থেকে বঞ্চিত হয়ে নিকৃষ্ট বানর হয়ে গেল। (তাদের শুধু চেহারায় বিকৃত হয়েছিল। দেহের অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ও অনুভব-অনুভূতি আগের মতোই ছিল। তবে বাকশক্তি ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছিল।) আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা ভালোভাবেই জান যে, যারা সীমালঙ্ঘন করেছে তোমাদের মধ্যে শনিবারে, ফলে আমি বললাম তাদের, তোমরা হয়ে যাও ঘৃণিত বানর।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ৬৫)

আবু আব্দুল্লাহ মুহাম্মাদ আল কুরতুবি বলেন, যারাই তাদের দেখতে আসত, তাদের প্রতি ধিক্কার জানিয়ে এবং তিরষ্কার করে বলত, আমরা কি তোমাদের নিষেধ করিনি? তখন তারা প্রচণ্ড অনুতাপ নিয়ে মাথা নেড়ে জানাত, অবশ্যই তোমরা নিষেধ করেছিলে। চোখ দেখে তাদের সনাক্ত করা যেত। তিন দিন পর্যন্ত তাদের এ অবস্থা ছিল, এরপর সবাই মারা যায়। (তাফসিরে কুরতুবি, খণ্ড : ৭, পৃষ্ঠা : ৩০৬)

হজরত কাতাদা (রহ.) বলেন, তাদের যুবকরা বানরে ও বৃদ্ধরা শূকরে পরিণত হয়ে গিয়েছিল। রূপান্তরিত হওয়ার পরও তারা আত্মীয়স্বজনদের চিনত। তাদের কাছে এসে অঝোরে অশ্রু বিসর্জন করত। (তাফসিরে মারেফুল কোরআন, মুফতি মুহাম্মাদ শফি, অনুবাদ : মাওলানা মুহিউদ্দীন খান, পৃষ্ঠা : ৪৪)

এক সাহাবি মহানবী (সা.)-কে জিজ্ঞেস করলেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল, একালের বানর-শূকরগুলো কি সেই রূপান্তরিত ইহুদিদের বংশধর?’ তিনি বললেন, ‘আল্লাহ তাআলা যখন কোনো জাতিকে ধ্বংস করেন বা আজাব দেন, তখন তাদের বংশ পৃথিবীতে বাকি রাখেন না। মূলত বানর-শূকর তাদের আগে থেকেই ছিল।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৬৬৩)