logo

সাহাবি ও তার স্ত্রীর যে কাজে হেসে দিয়েছেন আল্লাহ

সাহাবি ও তার স্ত্রীর যে কাজে হেসে দিয়েছেন আল্লাহ
সুলতান আহমেদ মসজিদ, ইসতান্বুল, তুরস্ক। ছবি: সংগৃহীত

দিনের সূর্য মদিনাকে দোলাতে দোলাতে সন্ধ্যার কাছে নিয়ে এসেছে। মদিনার বৃক্ষ, পত্রপল্লবে সূর্যের শেষ আলোর কিছুটা মায়া লেগে আছে। হজরত মুহাম্মদ (সা.) সাহাবিদের নিয়ে মসজিদে নববিতে বসে আছেন। পাশেই নবীর ঘর। যে ঘরে প্রতিদিন নিয়ম করে তিন বেলা রান্না হয়েছে, এমন নজির নেই। এ ঘরের অধিবাসীদের প্রায়ই অনাহারে থাকতে হয়। অথচ এ ঘরের মালিক মদিনা শহরের রাষ্ট্রপতি। যার রাষ্ট্রীয় কোষাগারে রয়েছে গনিমতের পর্যাপ্ত সম্পদ। প্রতিদিনই বাড়ছে সে সম্পদের তালিকা। 

এ ভর সন্ধ্যায় দূর থেকে এক লোক এলেন রাসুলুল্লাহর (সা.) দরবারে। লোকটির ক্লান্ত-শ্রান্ত মুখে ছিল প্রচণ্ড ক্ষুধার ছাপ। নবী (সা.) তার পাশে দাঁড়াতে চাইলেন। মেহমানদারি চাইলেন। মেহমানের সংবাদ দিয়ে ঘরে লোক পাঠালেন। খবর এলো, পানি ছাড়া ঘরে আর কিছুই নেই। তিনি সঙ্গীদের বললেন, ‘কে আছো, আমার এই মেহমানকে নিজের মেহমান করে নিতে পারবে।'
আবু তালহা চটজলদি বললেন, ‘আমি নেব হে আল্লাহর রাসুল।’

আবু তালহা তৃপ্তির ঢেকুর তোলে। আহ্, আবু তালহার কী সৌভাগ্য! নবীর মেহমান নিয়ে ঘরে ফিরতে পেরেছে। এর মধ্যে রাতের অন্ধকারে ঢেকে যায় মদিনার আকাশ। রাস্তায় পিনপতন নীরবতা। নীরবতার দেয়াল ভেঙে কখনো অস্তিত্বের জানান দিচ্ছে রাতজাগা-পাখি। মাথার ওপর উজ্জ্বল তারা ফুটে আছে। অন্ধকারে গাছপালা আর ঘর আলাদা করে চেনা যায় না। দু’পায়া পথে হেঁটে আবু তালহা বাড়ি পৌঁছলেন। ঘরে তখন মিটমিট আলোর চেরাগ জ্বলছে। মেহমানকে অনেক যত্নে বিছানায় বসতে দিলেন। স্ত্রীর উদ্দেশ্যে হাক ছেড়ে বললেন, ‘ও তালহার মা। আল্লাহর রাসুলের মেহমান নিয়ে এসেছি। খাবার-দাবার কিছু দাও।’

‘হায় আল্লাহ, আজ তো ভালো খাবার নেই। যা আছে, তা সন্তানদেরও হবে না।’ বললেন আবু তালহার স্ত্রী। 

‘বাচ্চাদের ঘুম পাড়িয়ে দাও। এরপর মেহমানের জন্য খাবার পরিবেশন করো।’

উম্মে তালহা বাচ্চাদের না খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিলেন। এরপর খাবার তৈরিতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। এদিকে আবু তালহা মেহমানের সঙ্গে গল্প করে সময় পার করছেন। এমন আম্মা-আব্বা আর কোথাও পাওয়া যায়, যারা মেহমানের জন্য নিজ সন্তানদের ক্ষুধার্ত অবস্থায় ঘুম পাড়িয়ে দিতে পারে!

খাবারের জন্য মেহমানকে নিয়ে আসা হলো। মেহমান বললেন, ‘আপনারাও বসুন।’ তারা বসলেন। পর্দার আড়ালে উম্মে তালহা। 

আবু তালহার ইশারায় উম্মে তালহা বাতিটা ঠিক করার কৌশলে নিভিয়ে দিলেন। ‘আহা! বাতিটা নিভেই গেল। এখন অন্ধকারেই খেতে হবে।’ বললেন উম্মে তালহা।

‘আমাদের দুর্ভাগ্য, এখন অন্ধকারেই খেতে হবে’—এই বলে আবু তালহা মুখে ছপছপ শব্দ করতে লাগলেন। স্বামীর দেখাদেখি স্ত্রীও খাওয়ার মতো করে ছপছপ শব্দ করতে লাগলেন। তারা পুরো সময়টা এভাবেই না-খেয়ে খাওয়ার মতো শব্দ করে গেলেন। তারা জানতেন, এ খাবার মেহমানের জন্যও ঠিকঠাক যথেষ্ট নয়। তবুও চাচ্ছিলেন, নবীর (সা.) মেহমান একটু তৃপ্তিভরে খাক। মেহমান খেলেনও তাই। কিন্তু সে জানতে পারল না, মেজবান ও তার স্ত্রী না-খেয়ে কেমন ভঙ্গি করে চলছেন। মেজবান সন্তানদের ক্ষুধার্ত অবস্থায় ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছেন। কিন্তু একজন সব জেনে যাচ্ছেন। সব দেখছেন। যার আদালতে সব কিছুই সুস্পষ্ট লেখা থাকে।

তারা অভুক্ত ঘুমিয়ে পড়লেন। সঙ্গে সন্তানরাও। ঘুমোতে গিয়ে হয়তো সন্তানদের অভুক্ত মুখের দিকে তাকিয়ে কেঁপে উঠেছিল দুজনের মন। ভেতরে হয়তো হাহাকারও জমেছিল। কিন্তু নবীর প্রেমের কাছে সন্তান আর সম্পদ তো অতি তুচ্ছ। 

আবু তালহা-উম্মে তালহা তখনো জানেন না, অন্ধকারবেষ্টিত ছোট্ট এ ঘরের খবর আরশে আজিমে আলোচিত হয়ে উঠেছে। তাদের এ অভিনব কর্মকাণ্ডে হেসে উঠেছেন আল্লাহ তাআলা। কোরআনে নাজিল করেছেন আয়াত।  

আহ, আবু তালহা! আপনি কত সৌভাগ্যবান, আপনার মেহমানদারির আলোচনা হয় আরশে। আপনার কাজে হেসে দেন মহান আল্লাহ। খুশি হয়ে যান প্রভু। কোরআনে নাজিল করেন আপনার কথা। অথচ আপনি তখনও ঘুমিয়ে আছেন মদিনার ছোট্ট এক অন্ধকার ঘরে। যে ঘরে খাবার নেই। আলো-বাতাস নেই। যে ঘরের অধিবাসীরা অভুক্ত ঘুমায়। এমনকি শিশু-কিশোররাও। 

ফজর নামাজে আবু তালহা গেলেন মসজিদে নববিতে। প্রিয় নবীর (সা.) সান্নিধ্যে। নবী তাঁকে অভিনন্দন জানালেন। রাতের ঘটনার কথা বললেন। আল্লাহই নবীকে সব জানিয়েছেন। তিনি বললেন, ‘আবু তালহা, সুসংবাদ গ্রহণ করো, তোমাদের এ ঘটনায় আল্লাহ খুশি হয়েছেন। তিনি হেসে দিয়েছেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৭৯৮)

এ ঘটনার জন্য কোরআনে আয়াত নাজিল করেছেন আল্লাহ। আল্লাহ বলেন—‘তারা অভাবগ্রস্ত সত্ত্বেও নিজেদের ওপর অন্যদের অগ্রগণ্য করে থাকে। আর যাদের অন্তরের কৃপণতা থেকে মুক্ত রাখা হয়েছে, তারাই সফলতাপ্রাপ্ত।’ (সুরা হাশর, আয়াত: ৯) 

আবু তালহা, আপনি নেই। আপনার প্রিয় স্ত্রী আর আত্মার ধনরা নেই। আপনার সেই ঘর নেই। সেই পথ নেই। কিন্তু আপনার ত্যাগ বেঁচে আছে। আপনার মেহমানদারির দৃশ্য মূর্ত হয়ে আছে এই আকাশে, বাতাসে, শহরে, নগরে প্রতিটি মুসলমানের হৃদয়ে। আপনার এই মেহমানদারির স্মৃতি প্রতিদিন পাঠ হয় হাজারো কণ্ঠে, নানা দেশে। আমরা পাঠ করি নামাজে, সকালের মক্তবে, রাতের তাহাজ্জুদে, ইলম শিক্ষার দরসে।

 

ভাবা যায়! মেহমানদারির প্রতি খুশি হয়ে আল্লাহ তাআলা কোরআনে আয়াত নাজিল করেছেন। তাদের কথা তিনি কিয়ামত পর্যন্ত মুসলমানের কণ্ঠে জারি রেখেছেন। আদর্শ বানিয়েছেন। 

আপনার মেহমানদারিতে আবু তালহার মতো আপনার জন্য কোরআনের আয়াত নাজিল হবে না নিশ্চয়, কিন্তু আল্লাহর আরশে আপনার নাম অবশ্যই লেখা থাকবে। আল্লাহ আপনার প্রতি অবশ্যই খুশি হবেন। তিনিও আপনার এমন অদ্ভুত কর্মকাণ্ডে হেসে দেবেন নিশ্চয়ই।