ফিতরার পরিমাণ সবার জন্য কি সমান

সদকাতুল ফিতর বা ফিতরা আদায় করতে হয় ঈদের নামাজের আগে। ফিতরা গরিবের অধিকার। ফিতরা আদায়ে রোজাদারের ছোটখাট ভুলত্রুটির ক্ষমা হয়। হাসি ফোটে গরিবের মুখে।
ঈদের দিন ধনী, বিত্তশালীদের ঘরে বেশ আনন্দ-উৎসব থাকে। মিসকিন ও গরিবরা থেকে যায় কষ্টে। ইসলামে যেহেতু আল্লাহর সৃষ্টিজীবের প্রতি অনুগ্রহ করা অপরিহার্য কর্তব্য। তাই ঈদের নামাজের আগে ফকির-মিসকিনদের ফিতরা দেওয়া বিত্তশালীদের নৈতিক দায়িত্ব। ইসলামি স্কলারদের মতে, ‘ঈদের নামাজের আগে ফিতরা দেওয়া ওয়াজিব।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৫০৯)
ফিতরার নেসাব জাকাতের নেসাবের সমপরিমাণ। কারও কাছে সাড়ে সাত ভরি স্বর্ণ বা সাড়ে বায়ান্ন ভরি রুপা অথবা তার সমমূল্যের নগদ অর্থ কিংবা নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের অতিরিক্ত সম্পদ ঈদুল ফিতরের দিন সুবহে সাদিকের সময় থাকলে তার ওপর সদকাতুল ফিতর আদায় করা ওয়াজিব। যার ওপর সদকাতুল ফিতর আদায় করা ওয়াজিব, তিনি নিজের পক্ষ থেকে যেমন আদায় করবেন, তেমনি নিজের অধীনস্থদের পক্ষ থেকেও আদায় করবেন। সদকাতুল ফিতরে জাকাতের মতো বছর অতিক্রম হওয়া শর্ত নয়। (ফাতহুল কাদির, খণ্ড: ২, পৃষ্ঠা: ২৮১)
রমজানের শেষ দিনেও যে নবজাতক দুনিয়ায় এসেছে কিংবা কোনো ব্যক্তি ইসলাম গ্রহণ করেছে, তার পক্ষ থেকেও সদকাতুল ফিতর আদায় করতে হবে। (ফাতাওয়া আলমগিরি, খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ১৯২)
সদকাতুল ফিতরের পরিমাণ সম্পর্কে শরিয়তে দুটি মাপকাঠি নির্ধারণ করা হয়েছে। তা হচ্ছে ‘এক সা’ বা ‘অর্ধ সা’। খেজুর, পনির, জব ও কিশমিশ দিয়ে আদায়ের ক্ষেত্রে এক সা তথা তিন কেজি ২৭০ গ্রামের কিছু বেশি। গম দিয়ে আদায় করতে চাইলে অর্ধ সা তথা এক কেজি ৬৩৫ গ্রামের কিছু বেশি দিতে হবে। সদাকাতুল ফিতর সম্পর্কিত হাদিসগুলো পর্যালোচনা করলে এ বিষয়ে মোট পাঁচ ধরনের খাদ্যের বর্ণনা পাওয়া যায়। যেমন: যব, খেজুর, পনির, কিশমিশ ও গম। এ পাঁচ প্রকারের মধ্যে যব, খেজুর, পনির ও কিশমিশ দিয়ে ফিতরা আদায় করতে চাইলে প্রত্যেকের জন্য এক সা দিতে হবে। গম দিয়ে দিতে চাইলে আধা সা দিতে হবে। এটা হলো ওজনের দিক দিয়ে পার্থক্য। আর মূল্যের দিক থেকে তো পার্থক্য রয়েছেই। যেমন—
- আজওয়া খেজুরের মূল্য প্রতি কেজি এক হাজার টাকা হলে একজনের সদকায়ে ফিতর দাঁড়ায় ৩ হাজার ২৭০ টাকা।
- মধ্যম ধরনের খেজুর, যার মূল্য প্রতি কেজি তিনশ টাকা হলে একজনের ফিতরা দাঁড়ায় নয়শ একাশি টাকা।
- কিশমিশ প্রতি কেজি চারশ টাকা করে হলে একজনের সদকায়ে ফিতর দাঁড়ায় তেরশ টাকার কিছু বেশি।
- পনির প্রতি কেজি এক হাজার টাকা করে ধরা হলে একজনের সদকায়ে ফিতর দাঁড়ায় ৩ হাজার ২৭০ টাকা।
- গম প্রতি কেজি ৬৫ টাকা হিসেবে ধরা হলে একজনের সদকায়ে ফিতর দাঁড়ায় ১১০ টাকার কাছাকাছি।
হাদিসে এ পাঁচটি খাদ্যের যে কোনোটি দিয়ে ফিতরা আদায়ের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। যেন মুসলিমরা নিজ নিজ সামর্থ্য ও সুবিধা অনুযায়ী এর যে কোনো একটি দিয়ে তা আদায় করতে পারে।
লক্ষণীয় বিষয় হলো, সবাই যদি সবচেয়ে নিম্ন মূল্যের খাদ্য দিয়েই নিয়মিত ফিতরা আদায় করে, তবে হাদিসে বর্ণিত অন্য চারটি খাদ্যের হিসেবে ফিতরা আদায়ের ওপর আমল করবে কে? কর্তব্য হলো, ব্যক্তি তার সামর্থ্য অনুযায়ী ফিতরা আদায় করবে। যে আজওয়া খেজুরের হিসাবে আদায়ের সামর্থ্য রাখে, সে আজওয়া দিয়ে দেবে। এভাবে সামর্থ্য অনুযায়ী পনির, খেজুর ও কিশমিশ দিয়ে আদায় করবে। যে এ চারটি দিয়ে দিতে পারবে না, সে দেবে গম দিয়ে। এটিই হওয়া উত্তম। এ নিয়মই ছিল মহানবী (সা.), সাহাবা, তাবেয়ি ও তাবে-তাবেয়িদের সময়ে।
রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে সর্বোত্তম দান সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, ‘দাতার কাছে যা সর্বোৎকৃষ্ট এবং যার মূল্য সবচেয়ে বেশি।’ (সহিহ বুখারি, খণ্ড-৩, পৃষ্ঠা-১৮৮)
আবু সাইদ খুদরি (রা.) বলেন, ‘আমরা সদকায়ে ফিতর আদায় করতাম এক সা খাদ্য দিয়ে অথবা এক সা যব অথবা এক সা খেজুর, কিংবা এক সা পনির বা এক সা কিশমিশ দিয়ে। আর এক সা’র ওজন ছিল রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সা অনুযায়ী।’ (মুয়াত্তা মালেক, পৃষ্ঠা: ১২৪)
আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) সারা জীবন খেজুর দিয়েই সদকায়ে ফিতর আদায় করেছেন। তিনি একবার যব দিয়ে আদায় করেছেন।
ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, অধিক মূল্যের খাদ্য দিয়ে ফিতরা আদায় করা উত্তম। অর্থাৎ যা দিয়ে আদায় করলে গরিবের বেশি উপকার হয়, সেটাই উত্তম ফিতরা। ইমাম মালিক (রহ.)-এর মতে, খেজুর দিয়ে ফিতরা আদায় করা উত্তম এবং খেজুরের মধ্যে সবচেয়ে উন্নত আজওয়া খেজুর দিয়েই আদায় করা উত্তম। ইমাম শাফি (রহ.)-এর মতে, সর্বোৎকৃষ্ট ও সর্বোচ্চ মূল্যের খাদ্য দিয়ে সদকা আদায় করা শ্রেয়। অন্য সব ইমামের মতও এমন। সদকার ক্ষেত্রে সব ফকিহর ঐকমত্য হলো, যা গরিবদের জন্য বেশি উপকারী। (আল-মুগনি, খণ্ড: ৪, পৃষ্ঠা: ২১৯)
দেশের প্রায় মানুষই সর্বনিম্ন মূল্যের হিসাবে ফিতরা আদায় করছে। মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত সবাই ফিতরা দিচ্ছে জনপ্রতি ১১০ টাকা করে। গম হচ্ছে ফিতরার পাঁচটি খাদ্যের একটি, যা সবচেয়ে কম মূল্যের। সামর্থ্য অনুযায়ী বেশি মূল্যের খাদ্যবস্তুকে মাপকাঠি ধরে ফিতরা আদায় করা উত্তম। কেননা সদকার মূল লক্ষ্যই হলো গরিবদের প্রয়োজন পূরণ ও তাদের স্বার্থ সংরক্ষণ।