logo

সন্তানের ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাকে বিয়ে দেওয়া কি জায়েজ

সন্তানের ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাকে বিয়ে দেওয়া কি জায়েজ
বিয়ের আগে নারীর মতামত নেওয়া জরুরি। ছবি: ভেকটিজি

যারা বিয়ের সামর্থ্য রাখেন, তাদের সঠিক সময়ে বিয়ে করতে উৎসাহিত করেছেন হজরত মুহাম্মদ (সা.)। বিয়ের মাধ্যমে মানুষ তার দৃষ্টিকে সংযত করে। যৌনাঙ্গের পবিত্রতা রক্ষার মাধ্যমে জান্নাতের পথ সুগম করতে সক্ষম হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘হে যুব সমাজ, তোমাদের মধ্যে যারা বিয়ের সামর্থ্য রাখে, তাদের বিয়ে করা কর্তব্য। কেননা বিয়ে দৃষ্টির নিয়ন্ত্রণকারী, যৌনাঙ্গের পবিত্রতাকারী।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫০৬৬)

এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, সামর্থ্য হলে বিয়ে করতে হবে। বিয়ের জন্য কোনো দিন বা তারিখ নির্ধারিত নেই। যে কোনো সময় যে কোনো দিন বিয়ে করা যায়।

ইসলামি বিধি-বিধান মেনে বিয়ে করতে হবে। বিয়েতে ইজাব বা প্রস্তাব এবং কবুল বা গ্রহণ থাকতে হবে। সেখানে সাক্ষীর উপস্থিতিও ফরজ। আমাদের সমাজে এমন অভিভাবকও আছেন, যারা সন্তানের সম্মতি ছাড়া তাদের বিয়ে দিয়ে দেন। বিয়েতে তাদের মতামত নেওয়াকে প্রয়োজন মনে করেন না। প্রশ্ন হলো, সন্তানের ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাদের বিয়ে দেওয়া যাবে?

ইসলামি শরিয়তে, মন থেকে সন্তুষ্ট না থাকা সত্ত্বেও যদি দুজন প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিম পুরুষ ও নারী দুজন সাক্ষীর সামনে বিয়ের প্রস্তাব ও গ্রহণ হয়ে থাকে, তাহলে বিয়ে সম্পন্ন হয়ে যাবে। কারণ বিধান প্রযোজ্য হয় বাহ্যিক অবস্থার ওপর। তখন কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়া তালাক দেওয়া ঠিক হবে না।

বিয়ের আগে নারীর মতামত নেওয়া জরুরি। চাই সে কুমারি হোক বা তালাকপ্রাপ্তা। সন্তানের মতামতের তোয়াক্কা না করে তার ইচ্ছার বিরদ্ধে পাত্রস্থ করা বা বিয়ে দেওয়া বৈধ নয়। মতামত বা সম্মতি ছাড়া বিয়ে দিলে সে চাইলে পরবর্তীতে বিয়ের আকদ বা চুক্তি বহাল রাখতে পারবে কিংবা বিয়ে ভেঙে দিতে পারবে।

হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আগে বিয়ে হয়েছে এমন তালাকপ্রাপ্তা বা বিধবা নারীর মতামত বা সম্মতি গ্রহণ ছাড়া তার বিয়ে দেওয়া যাবে না এবং কুমারি নারীকে তার অনুমতি ছাড়াও বিয়ে দেওয়া যাবে না। সাহাবিরা বললেন, কুমারি নারীর অনুমতি আবার কীভাবে? রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, তার চুপ থাকাই অনুমতি।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫১৩৬)

ইচ্ছার বিরুদ্ধে কাউকে বিয়ে দেওয়া শরিয়সম্মত নয়। এজন্য বিয়ে দেওয়ার সময় প্রাপ্তবয়স্ক ছেলে-মেয়ের সম্মতি নিতে হবে। এক মেয়েকে তার বাবা তার অসম্মতিতে বিয়ে দিলে নবী (সা.) মেয়ের আপত্তির কারণে বিয়ে বাতিল করে দেন। খানসা বিনতে খিজাম আনসারি (রা.) থেকে বর্ণিত, তাকে তার বাবা (অনুমতি ছাড়া) বিয়ে দিলেন। সে ছিল বিধবা। এ বিয়ে সে অপছন্দ করল। তাই সে নবী (সা.)-এর কাছে এসে জানাল। ফলে তিনি তার এ বিয়ে বাতিল করে দিলেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫১৩৮)

আরেক হাদিসে হাদিসে আছে, বুরাইদা (রা.) বলেন, ‘এক নারী নবী (সা.)-এর কাছে এসে বলল, আমার বাবা আমাকে তার ভাতিজার কাছে বিয়ে দিয়েছে, যাতে তার মর্যাদা বৃদ্ধি পায়। বর্ণনাকারী বলেন, তখন রাসুল (সা.) বিষয়টি মেয়ের ইচ্ছার ওপর ছেড়ে দেন। (ইচ্ছে করলে বিয়ে রাখতেও পারবে, ইচ্ছা করলে ভেঙে দিতে পারবে)। তখন ওই নারী বললেন, আমার বাবা যা করেছেন, তা আমি মেনে নিলাম। আমার উদ্দেশ্য ছিল, মেয়েরা যেন জেনে নেয় যে, বিয়ের বিষয়ে বাবার মতের অধিকার নেই।’ (ইবনে মাজাহ, হাদিস: ১৮৭৪)

কুমারি মেয়ে মন থেকে রাজি না থাকার পরও সম্মতি দিলে বিয়ে শুদ্ধ হয়ে যায়। (রদ্দুল মুহতার, খণ্ড: ৪, পৃষ্ঠা: ৮৭)। তবে প্রাপ্তবয়স্ক ছেলে স্বাধীনভাবে বিয়ে করতে পারে। কিন্তু সেক্ষেত্রেও বাবা-মাকে সন্তুষ্ট রেখে বিয়ে করা কর্তব্য।

ইমাম ইবনে তায়মিয়া (রহ.) বলেন, মা-বাবার জন্য সমীচীন নয় যে, ছেলের বিয়ে এমন মেয়ের সঙ্গে দেবে, যাকে সে চায় না। এমন বিয়ে সে অমান্য করলে সে অবাধ্য হিসেবে গণ্য হবে না। মাজমুউল ফাতাওয়া, খণ্ড: ৩২, পৃষ্ঠা: ৩০)

আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশনের চেয়ার‌ম্যান শায়খ আহমাদুল্লাহ ইউটিউবে এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘কোনো সন্তানের অপছন্দে তাকে কারও সঙ্গে বিয়ে দিতে বাধ্য করার অধিকার মা-বাবার নেই। সন্তানের অনুমতি ছাড়া বিয়ে দেওয়া ইসলামে জায়েজ নেই। বাবা-মা যতই জোর করুক, ছেলে-মেয়ে রাজি না হলে বিয়ে দেওয়া যাবে না।’

বাবা-মা জোর করে খারাপ জায়গায় বিয়ে দিতে চাইলে রাজি না হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন শায়খ আহমাদুল্লাহ। সন্তানের ন্যায্য দাবি শোনা মা-বাবার জন্য আবশ্যক বলে জানান তিনি।