logo
Advertisement

কাবা শরিফের বর্তমান ইমামদের তালিকা ও পরিচয়

কাবা শরিফের বর্তমান ইমামদের তালিকা ও পরিচয়
ওপরে বাঁ থেকে আবদুর রহমান আস-সুদাইস, শেখ সালেহ বিন হুমাইদ ও শেখ উসামা খায়াত, শেখ ফয়সাল গাজ্জাওয়ি, শেখ মাহের আল-মুআইকলি ও শেখ আবদুল্লাহ জুহানি, শেখ বানদার বালিলাহ, ইয়াসির আল দাওসারি ও শেখ ওয়ালিদ আশ শামসান। কোলাজ: এশিয়া পোস্ট

সৌদি আরবের মক্কায় অবস্থিত মসজিদে হারাম বা কাবাঘর। কাবা আল্লাহর ঘর। প্রতিদিন আমরা কাবার দিকে মুখ করেই নামাজ আদায় করি। আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি। এই ঘরের দিকে ফিরে নামাজ না পড়লে কখনও নামাজ হবে না।

মক্কা বিজয়ের পর কাবাঘরে আনুষ্ঠানিকভাবে নামাজ আদায় করা শুরু করেন মুসলিমরা। নির্ধারিত হয় কাবার ইমাম ও মুয়াজ্জিন। বর্তমানে কাবাঘরে ১০ জন ইমাম নামাজ পড়াচ্ছেন। তারা পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ানোর পাশাপাশি জুমার খুতবা, ধর্মীয় দিকনির্দেশনা ও আধ্যাত্মিক আলোচনা করেন। কাবাঘরের বর্তমান ১০ জন ইমামের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি তুলে ধরা হলো-

কাবা শরিফের বর্তমান ইমাম যারা

১. আবদুর রহমান আস-সুদাইস

২. শেখ সালেহ বিন হুমাইদ

৩. শেখ উসামা খায়াত

৪. শেখ ফয়সাল গাজ্জাওয়ি

৫. শেখ মাহের আল-মুআইকলি

৬. শেখ আবদুল্লাহ জুহানি

৭. শেখ বানদার বালিলাহ

৮. শেখ ইয়াসির আল দাওসারি

৯. শেখ বদর আল তুর্কি

১০. শেখ ওয়ালিদ আশ শামসান

আবদুর রহমান আস-সুদাইস

শেখ আবদুর রহমান আস-সুদাইসের জন্ম সৌদি আরবের রিয়াদে, ১৯৬০ সালে। ১২ বছর বয়সে তিনি পবিত্র কোরআন হেফজ করেন। ১৯৭৯ সালে রিয়াদের সায়েন্টিফিক ইনস্টিটিউশন থেকে স্নাতক শেষ করেন এবং রিয়াদ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শরিয়াহ বিষয়ে ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৯৫ সালে মক্কার উম্মুল কুরা বিশ্ববিদ্যালয়ের শরিয়া ফ্যাকাল্টি থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন।

হৃদয়গ্রাহী সুর ও মধুমাখা কণ্ঠে কোরআন তেলাওয়াতের জন্য মুসলিম বিশ্বে অত্যন্ত সমাদৃত তিনি। ১৯৮৪ সাল থেকে মক্কার পবিত্র মসজিদুল হারাম ও কাবা শরিফের ইমাম হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি, তখন তার বয়স মাত্র ২২ বছর। ১৯৮৪ সালের জুলাই মাসে মসজিদুল হারামে প্রথমবার খুতবা দেন তিনি।

শেখ সুদাইস দুই পবিত্র মসজিদের বিষয়াবলির সাধারণ প্রেসিডেন্সির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। তার নেতৃত্বে কাবা শরিফ এবং মদিনার মসজিদে নববি অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালিত হচ্ছে।

শেখ সালেহ বিন হুমাইদ

১৯৫০ সালে সৌদি আরবের কাসিম অঞ্চলের বুরাইদা শহরে জন্মগ্রহণ করেন শায়েখ ড. সালেহ বিন হুমাইদ। তিনি ১৯৭৫ সালে উম্মুল কুরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইসলামি শরিয়াহ বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন এবং পরবর্তীতে ১৯৭৬ সালে মাস্টার্স ও ১৯৮১ সালে ইসলামি ফিকহ ও মূলনীতি বিষয়ে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন।

শেখ সালেহ বিন হুমাইদ মসজিদে হারামে ইমামতির পাশাপাশি সৌদি আরবের গ্র্যান্ড মুফতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি মসজিদুল হারাম ও মসজিদে নববির ইমাম ও খতিবদের তত্ত্বাবধানকারী ‘প্রেসিডেন্সি অ্যাফেয়ার্স’ পরিষদের সভাপতির দায়িত্বে ছিলেন।

তিনি মজলিসে শুরার (সৌদি পরামর্শক পরিষদ) সাবেক স্পিকার এবং আন্তর্জাতিক ইসলামি ফিকহ একাডেমির সভাপতির মতো উচ্চমর্যাদার দায়িত্ব সাফল্যের সঙ্গে সম্পন্ন করেছেন। ইসলামি আইনশাস্ত্র ও আইন বিষয়ে গভীর জ্ঞান রয়েছে তার।

শেখ উসামা খায়াত

১৯৫৬ সালে পবিত্র মক্কা নগরীতে জন্মগ্রহণ করেন উসামা খাইয়াত। তার বাবা শেখ আব্দুল্লাহ খাইয়াতও কাবার একজন সাবেক ইমাম ও প্রখ্যাত পণ্ডিত ছিলেন। উসামা খাইয়াত তার বাবার কাছেই পবিত্র কোরআন হিফজ সম্পন্ন করেন। উম্মুল কুরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি ১৯৭৭ সালে শরিয়াহ বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কিতাব ও সুন্নাহ বিভাগে মাস্টার্স এবং ১৯৮৮ সালে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন।

বহু বছর ধরে গ্র্যান্ড মসজিদের ইমাম হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন শেখ উসামা খায়াত। তার খুতবায় মুসলিম সম্প্রদায়ের সামাজিক ও আধ্যাত্মিক সমস্যা এবং এর প্রতিকারগুলো খুব চমৎকারভাবে ফুটে উঠে। তিনি চমৎকার খুতবা দেওয়ার জন্য বেশ পরিচিত।

ইসলামি ধর্মতত্ত্বে শেখ উসামার গভীর জ্ঞান রয়েছে। তিনি ইসলাম ধর্ম প্রচার ও প্রসারের লক্ষে বিভিন্ন শিক্ষামূলক কাজে জড়িত আছেন।

শেখ ফয়সাল গাজ্জাওয়ি

শেখ ফয়সাল গাজ্জাওয়ি সৌদি আরবের মক্কায় ১৯৬৫ সালে জন্মগ্রহণ করেন। উম্মুল কুরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কোরআন তেলাওয়াত ও কিরাত বিষয়ে স্নাতক, মাস্টার্স ও পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৯৩ সাল থেকে তিনি উম্মুল কুরা বিশ্ববিদ্যালয়ে লেকচারার হিসেবে শিক্ষকতা শুরু করেন। পরবর্তীতে ডক্টরেট শেষ করে ২০০৪ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত তিনি সেখানে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘দাওয়া ও উসুলুদ্দিন’ অনুষদের ডিন এবং পোস্ট-গ্রাজুয়েট অনুষদের ডেপুটি ডিন হিসেবেও সফলভাবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

শেখ ফয়সালের সুমধুর কোরআন তেলাওয়াত মুসল্লিদের প্রাণবন্ত করে রাখে। মুসল্লিদের নামাজে একনিষ্ঠ হতে সহযোগিতা করে। মসজিদে হারামের ইমাম হওয়ার পর তিনি তরুণ আলেম ও ইমামদের নানাবিধ বিষয়ে শিক্ষা দিচ্ছেন। প্রশিক্ষণ দিয়ে তাদের যোগ্য করে গড়ে তুলছেন। সবার মাঝে কোরআন শেখার আগ্রহ ছড়িয়ে দিতে বহু উদোগ নিয়েছেন তিনি। কোরআনের ব্যাখ্যা সংরক্ষণেও কাজ করছেন তিনি।

শেখ মাহের আল-মুআইকলি

শেখ মাহের মুআইকলি তার অনন্য ও মর্মস্পর্শী তেলাওয়াতের জন্য মুসলিম বিশ্বে অন্যতম বিখ্যাত ইমাম। শেখ মাহের ১৯৬৯ সালে মদিনায় জন্মগ্রহণ করেন। শিক্ষাজীবনের শুরুতে গণিতে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তীতে কোরআন-হাদিসের জ্ঞান অর্জন করে মক্কার কাবা শরিফের ইমাম হন।

রমজান মাসে তারাবি নামাজে তার কোরআন তেলাওয়াত বিশ্বজুড়ে মুসলমানদের কাছে বিশেষভাবে জনপ্রিয়।

শেখ আবদুল্লাহ জুহানি

মক্কার কাবা শরিফের ইমাম শেখ আবদুল্লাহ জুহানি। তিনি ১৯৭৬ সালে সৌদি আরবের মদিনা শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি মদিনা ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কোরআন অনুষদ থেকে স্নাতক ডিগ্রি এবং মক্কার উম্মুল কোরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইসলামি শরিয়া বিষয়ে ডক্টরেট (পিএইচডি) অর্জন করেছেন।

শেখ জুহানি তার বলিষ্ঠ ও স্পষ্ট কণ্ঠস্বরের জন্য সুপরিচিত। কাবা শরিফের তরুণ প্রজন্মের ইমামদের মধ্যে অন্যতম তিনি। শেখ জুহানি ২০০৭ সাল থেকে মক্কায় ইমাম হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

শেখ বানদার বালিলাহ

শেখ বানদার বালিলাহর জন্ম মক্কায়, ১৯৭৫ সালে। ১৯৯৬ সালে উম্ম কুরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শরিয়াহ বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি। তিনি ২০০১ সালে একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইসলামি আইনশাস্ত্রে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি সম্পন্ন করেন। ২০০৮ সালে মদিনার ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনশাস্ত্রে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন।

বানদার বালিলাহ ২০১৩ সালে প্রথমে রমজানে মসজিদুল হারামে অতিথি ইমাম হিসেবে তারাবি নামাজ পড়ানোর সুযোগ লাভ করেন। এরপর তিনি মসজিদুল হারামে নিয়মিত ইমাম ও খতিব হন।

সুললিত কোরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে মুসলিম বিশ্বের লাখো মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছেন তিনি। ২০২০ সালে সৌদি আরবের উচ্চতর উলামা পরিষদের সদস্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।

শেখ ইয়াসির আল দাওসারি

১৯৮০ সালে সৌদি আরবের আল-খারিজ প্রদেশে জন্ম শেখ ইয়াসির আল-দাওসারি। তিনি ১৫ বছর বয়সের আগেই শায়খ বাকরি তাবারাবিশি ও শায়খ ইবরাহিম আল আখদারের কাছে পবিত্র কোরআন হেফজ সম্পন্ন করেন। পরে ইমাম মুহাম্মদ বিন সৌদি ইসলামিক ইউনিভার্সিটি থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেন। এ বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই তিনি তুলনামূলক আইনশাস্ত্রের ওপর ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেন।

তিনি বিভিন্ন দেশে খ্যাতিমান কারিদের কাছে ইলমে কিরাত শিখেছেন এবং সনদ লাভ করেছেন। তিনি সৌদি আরব রেডিও-টেলিভিশনের অতি পরিচিত মুখ ও কণ্ঠ। তিনি নিয়মিত রেডিও-টেলিভিশনে কোরআন তেলাওয়াত করেছেন।

২০১৯ সালের অক্টোবর থেকে মসজিদে হারামে নিয়মিত নামাজের ইমামতি করে আসছিলেন। এর আগে তিনি ২০ বছর ধরে সৌদি আরবের প্রসিদ্ধ একাধিক মসজিদে ইমাম ও খতিবের দায়িত্ব পালিন করেছেন।

শেখ বদর আল তুর্কি

১৯৮৪ সালে সৌদি আরবের কাসিম প্রদেশে শেখ বদর আল তুর্কির জন্ম। তিনি রিয়াদের বিখ্যাত ইমাম মুহাম্মদ বিন সৌদ ইসলামিক ইউনিভার্সিটি থেকে ২০১২ সালে দাওয়াহ বিষয়ে ব্যাচেলর ডিগ্রি এবং ২০২০ সালে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন। ২০২৪ সালের ৩ অক্টোবর রাজকীয় আদেশে ইমাম হিসেবে নিয়োগ পান তিনি।

সাবলীল বক্তৃতার তার বেশ পরিচিত রয়েছে। ইসলামি আইনশাস্ত্রে তার বেশ পাণ্ডিত্য রয়েছে। তিনি কাবা শরিফের ইমাম হিসেবে নিয়োগ পাওয়া সবশেষ সদস্যদের একজন।

শেখ ওয়ালিদ আশ শামসান

মসজিদে হারাম এবং মসজিদে নববির পরিচালনা পরিষদের প্রধান শায়খ আবদুর রহমান আস সুদাইসে রাজকীয় আদেশে ২০২৪ সালের ৩ অক্টোবর ইমাম হিসেবে নিয়োগ পান শেখ ওয়ালিদ।

জানা যায়, তার বাবা দোয়া করেছিলেন, তিনি যেন কাবার ইমাম হন। বাবার দোয়া আল্লাহ কবুল করেছেন। ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে তার গভীর জানাশোনা রয়েছে। তার খুতবাগুলো আধুনিক সমাজের মুসলমানদের জন্য বেশ উপযোগী। তিনি ইমামতির পাশাপাশি মসজিদে হারামে আগত লাখো মুসলমানদের জন্য নসিহত পেশ করেন। কোরআন-হাদিসের আলোকে ওয়াজও করেন।