হাদিসের আলোকে রোজার শুরু ও শেষ সময় কখন

রমজানে সাহরির শেষ সময় বা রোজা শুরুর সময় এবং ইফতার শুরুর সময় বা রোজার শেষ সময় নিয়ে অনেকে কিছুটা দ্বিধায় ভোগেন। একেকজন একেকরকম নিয়ম মোতাবেক সময় মেনে সাহরি ও ইফতার করেন।
এটা নিতান্তই অজ্ঞতা ও অলসতার পরিচয়। একটু সচেতন হলেই সাহরি ও ইফতারের সঠিক সময় নির্ণয় করা এবং শুদ্ধভাবে সঠিক সময়ে সাহরি ও ইফতার করা সম্ভব।
আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা পানাহার করো যতক্ষণ না ফজরের সাদা রেখা কালো রেখা থেকে স্পষ্ট হয়। অতপর রাত পর্যন্ত রোজা পূর্ণ করো।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ১৮৭)। আয়াতটিতে রোজার শুরু ও শেষ সময়ের সীমানা স্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে।
রোজা শুরুর সময়
রোজা শুরুর সময় হলো ফজরের সাদা রেখা কালো রেখা থেকে স্পষ্ট হওয়া অর্থাৎ সুবেহ সাদিক উদিত হওয়া। সুবহে সাদিক (রাতের শেষে পূর্ব দিগন্তে আড়াআড়িভাবে বিস্তৃত প্রথম আলো) উদিত হলেই রোজা শুরুর সময় আরম্ভ হয়ে যায়। তখনই ফজরের সময় শুরু হয়।
ইবনে উমর (রা.) বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) দুজন মুয়াজ্জিন ছিলেন। বেলাল (রা.) ও উম্মু মাকতুমের অন্ধ ছেলে আব্দুল্লাহ। রাসুল (সা.) বলেছেন, বেলাল (রা.) রাতেই আজান দেয়। অতএব ইবনে উম্মু মাকতুম আজান না দেওয়া পর্যন্ত তোমরা পানাহার করো।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১০৯২)
আয়েশা (রা.) বলেন, ‘বেলাল (রা.) রাতেই আজান দিতেন অর্থাৎ বেলালের আজান ছিল মূলত সাহরি খাওয়া শুরু করার জন্য। তাই আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, ইবনে উম্মু মাকতুম (রা.) আজান না দেওয়া পর্যন্ত তোমরা পানাহার করো। কারণ, ফজরের সময় না হওয়া পর্যন্ত সে আজান দেয় না।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১৯১৮)
জায়েদ ইবনে সাবিত (রা.) বলেন, ‘আমরা রাসুল (সা.)-এর সঙ্গে সাহরি খেয়েছি, এরপর সালাতের জন্য দাঁড়িয়েছি। বর্ণনাকারী জিজ্ঞেস করলেন, ফজরের আজান এবং সাহরির মধ্যে কতটুকু সময় ব্যবধান ছিল? তিনি বলেন, পঞ্চাশ আয়াত পাঠ করা পরিমাণ।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১৯২১)
এখানে আয়াত বলতে মধ্যম ধরনের আয়াত বোঝানো হয়েছে। আর এই শ্রেণির ৫০টি আয়াত পড়তে ১৫ থেকে ২০ মিনিট সময় লাগে। সুতরাং সাহরির শেষ সময় বা রোজা শুরুর সময় হলো সুবেহ সাদিক উদিত হওয়া বা ফজরের আজান শুরু হওয়া। ফজরের আজান শুরু হওয়ার পর আর সাহরি গ্রহণ করা ঠিক নয়। উত্তম হলো, আজান শুরু হওয়ার আগেই পানাহার শেষ করা।
রোজার শেষ সময়
সূর্যাস্ত যাওয়া পর্যন্ত রোজার শেষ সময়। সূর্যাস্তের সঙ্গে সঙ্গে রোজার সময় শেষ হয়ে যায়। সাহল ইবনে সাদ (রা.) বলেন, ‘রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘লোকেরা যতদিন শিগগিরই ইফতার করবে, ততদিন তারা কল্যাণের ওপর থাকবে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১৯৫৭)
রোজাদার কখন ইফতার করবে এ বিষয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যখন রাত সেদিক থেকে ঘনিয়ে আসে ও দিন এদিক থেকে চলে যায় এবং সূর্য ডুবে যায়, তখন রোজাদার ইফতার করবে।’ (মিশকাতুল মাসাবিহ, হাদিস : ১৯৮৫)
আবু আতিয়া (রা.) বলেন, ‘আমি ও মাসরুক আয়েশা (রাযি.)-এর কাছে গিয়ে বললাম, ‘হে উম্মুল মুমিনিন, রাসুলের (সা.) দুজন সাহাবির একজন সূর্যাস্তের সঙ্গে সঙ্গে ইফতার করেন এবং তাড়াতাড়ি (মাগরিবের) নামাজ আদায় করেন। দ্বিতীয়জন বিলম্বে ইফতার করেন এবং বিলম্বে নামাজ আদায় করেন।’
আয়েশা (রা.) জিজ্ঞেস করলেন, ‘কে ইফতার ও নামাজ তাড়াতাড়ি আদায় করেন?’ বলা হলো, ‘আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)।’ আয়েশা (রা.) বললেন, রাসুল (সা.) এমনটাই করতেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১০৯৯)। সুতরাং ইফতার শুরুর সময় বা রোজার শেষ সময় হলো রাত শুরু হওয়া বা মাগরিবের আজান হওয়া। মাগরিবের আজান শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ইফতার করা উত্তম।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘রোজার রাতে তোমাদের জন্য তোমাদের স্ত্রীদের কাছে গমন হালাল করা হয়েছে। তারা তোমাদের জন্য পোশাক এবং তোমরা তাদের জন্য পোশাক। আল্লাহ জেনেছেন যে, তোমরা নিজেদের সাথে খেয়ানত করছিলে। অতপর তিনি তোমাদের তওবা কবুল করেছেন এবং তোমাদের ক্ষমা করেছেন। অতএব, এখন তোমরা তাদের সঙ্গে মিলিত হও। আল্লাহ তোমাদের জন্য যা লিখে দিয়েছেন, তা অনুসন্ধান করো। আর আহার করো ও পান করো যতক্ষণ না ফজরের সাদা রেখা কালো রেখা থেকে স্পষ্ট হয়। অতঃপর রাত পর্যন্ত রোজা পূর্ণ করো।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ১৮৭)
এ আয়াতে আল্লাহ তাআলা রোজার সময় কখন শুরু ও কখন শেষ, সে বিষয়ে সুস্পষ্ট বর্ণনা দিয়েছেন। সুতরাং রোজা শুরু হবে সুবহে সাদিক উদিত হলে আর শেষ হবে সূর্যাস্ত গেলে। অন্যভাবে বললে, রোজার শুরু সময় হচ্ছে, সুবহে সাদিক উদিত হওয়া আর শেষ সময় সূর্যাস্ত যাওয়া।