মক্কা-মদিনার নিরাপত্তা নিয়ে কোরআন-হাদিসে যা বলা হয়েছে

মক্কা ও মদিনা- এ দুই নগরীর নাম উচ্চারিত হলে মুসলমানদের হৃদয়ে বয়ে যায় গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা। মক্কায় আছে পবিত্র কাবাঘর। মুসলমানদের কিবলা। মদিনায় শায়িত আছেন বিশ্বমানবতার মুক্তির দূত মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)। মুসলিম উম্মাহর আবেগের সঙ্গে এ দুই নগরীর সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য।
কোরআন-হাদিসে মক্কা-মদিনার মর্যাদা ও নিরাপত্তার কথা এসেছে। অথচ ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায়, বিভিন্ন সময়ে এ দুই নগরী আক্রমণ ও রক্তপাতের শিকার হয়েছে। এমনকি একসময় কাবাঘরের হাজরে আসওয়াদও ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছিল।
নিরাপদ নগরী মক্কা
কোরআনে আল্লাহ তাআলা মক্কা নগরীকে নিরাপদ স্থান হিসেবে উল্লেখ করেছেন। আল্লাহ বলেন, ‘আর স্মরণ করো, যখন আমি কাবাঘরকে মানুষের জন্য মিলনকেন্দ্র ও নিরাপদ স্থানে পরিণত করেছিলাম।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ১২৫)। আরেক আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘তারা কি দেখে না যে, আমি হারামকে নিরাপদ স্থান বানিয়েছি?’ (সুরা আনকাবুত, আয়াত: ৬৭)
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ আসমান ও জমিন সৃষ্টির দিনই এ নগরীকে পবিত্র ঘোষণা করেছেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৮৩৪)
উল্লিখিত আয়াত ও হাদিসে মক্কার নিরাপত্তা ও পবিত্রতার বিশেষ মর্যাদার কথা বর্ণনা করা হয়েছে। হজ ও ওমরাহ পালনের জন্য পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ এখানে সমবেত হন। এ নগরীর পবিত্রতা রক্ষা করা এবং সেখানে মানুষের জীবন-সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ নগরীতে রক্তপাত ও সহিংসতা সৃষ্টি করা সাধারণ অপরাধের মতো নয়, বরং হারামের বিশেষ মর্যাদার কারণে বিষয়টি আরও গুরুতর।
মদিনাও পবিত্র ভূমি
মক্কার মতো মদিনারও রয়েছে স্বতন্ত্র মর্যাদা। এ নগরী ইসলামের প্রথম রাষ্ট্রের কেন্দ্র। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হিজরতের ভূমি। তিনি (সা.) বলেছেন, ‘ইবরাহিম (আ.) মক্কাকে পবিত্র এলাকা ঘোষণা করেছিলেন, আর আমি মদিনাকে পবিত্র এলাকা ঘোষণা করেছি।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৩৬০)
মুসলমানদের কাছে মদিনা নবীপ্রেমের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। এ নগরীর নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়া কিংবা সেখানে মানুষের ওপর জুলুম সংঘটিত হওয়া মুসলিম উম্মাহর জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয়।
হারামাইনের বিশেষ সুরক্ষা সম্পর্কে সবচেয়ে আলোচিত হাদিসগুলোর একটি হলো দাজ্জালের প্রবেশসংক্রান্ত বর্ণনা। আনাস ইবনে মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মক্কা-মদিনা ছাড়া দাজ্জাল সব জনপদে প্রবেশ করতে পারবে। এ দুই নগরীর প্রবেশপথগুলোর প্রত্যেকটিতে ফেরেশতারা সারিবদ্ধভাবে পাহারা দেবেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৮৮১)
দাজ্জাল হবে মানবজাতির জন্য ভয়াবহ পরীক্ষা। সে ভয়ংকর কিছু ক্ষমতা প্রদর্শনের মাধ্যমে বহু মানুষকে বিভ্রান্ত ও প্রতারিত করবে। কিন্তু আল্লাহর বিশেষ ব্যবস্থাপনায় মক্কা ও মদিনায় তার প্রবেশ নিষিদ্ধ থাকবে।
এখানে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি। হাদিসটি দাজ্জালের প্রবেশ সম্পর্কে সুস্পষ্ট ভবিষ্যদ্বাণী করেছে। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, ইতিহাসে কখনও এ দুই নগরীতে কোনো আক্রমণ ঘটবে না। কারণ দাজ্জালের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা এবং পার্থিব জীবনে মানুষের সংঘটিত যুদ্ধ ও হামলা এক বিষয় নয়।
আবরাহার হস্তিবাহিনী
ইয়েমেনের শাসক আবরাহা কাবাঘরের পরিবর্তে নিজের নির্মিত উপাসনালয়ের প্রতি মানুষকে আকৃষ্ট করতে চেয়েছিল। এতে সফল না হওয়ায় সে কাবাঘর ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে বিশাল বাহিনী নিয়ে মক্কার দিকে অগ্রসর হয়। আল্লাহ তাআলা আবরাহার ষড়যন্ত্র ব্যর্থ করে দেন এবং তাদের ওপর ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি পাঠান। পাখিগুলো সৈন্যবাহিনীর ওপর পোড়ামাটির পাথর নিক্ষেপ করে। ফলে আল্লাহ তাদের পরিণত করেন ভক্ষিত শস্যপাতার মতো। (সুরা ফিল, আয়াত: ১-৫)
রাজনৈতিক সংঘাতে অবরুদ্ধ মক্কা
মুসলমানদের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংঘাতও পবিত্র মক্কাকে যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত করেছে। ইয়াজিদ ইবনে মুয়াবিয়ার মৃত্যুর পর আবদুল্লাহ ইবনে জুবাইর (রা.) মক্কায় নিজের শাসন প্রতিষ্ঠা করেন। উমাইয়া কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টায় সিরীয় বাহিনী মক্কা অবরোধ করে। ৬৪ হিজরির এ সংঘাতে মিনজানিক ব্যবহার করা হয়। সে সময় সংঘর্ষ ও অগ্নিকাণ্ডে কাবাঘরও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।
পরে আবদুল্লাহ ইবনে জুবাইর (রা.) কাবাঘর পুনর্নির্মাণ করেন। তার শাসনের অবসান ঘটাতে ৭৩ হিজরিতে হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফের নেতৃত্বে আরেকটি সামরিক অভিযান পরিচালিত হয়। সে সময়ও মক্কা অবরোধ ও সংঘর্ষের শিকার হয়। আবদুল্লাহ ইবনে জুবাইর (রা.) শহীদ হন এবং উমাইয়া কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়।
এসব ঘটনা ইসলামের ইতিহাসের বেদনাদায়ক অধ্যায়। যে নগরীর পবিত্রতা রক্ষার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, সেই নগরীই মুসলমানদের রাজনৈতিক ক্ষমতার দ্বন্দ্বে আক্রান্ত হয়েছিল। ক্ষমতার লড়াই কখনো কখনো মানুষকে এমন পরিণতির দিকে নিয়ে যায়, যেখানে পবিত্র স্থান ও নিরপরাধ মানুষের নিরাপত্তাও বিপন্ন হয়ে পড়ে।
মদিনার মাটিতে রক্তপাত
৬৩ হিজরিতে ইয়াজিদ ইবনে মুয়াবিয়ার শাসনামলে মদিনাবাসীর সঙ্গে কেন্দ্রীয় শাসনের সংঘাত তীব্র হয়ে ওঠে। বিদ্রোহ দমনে সিরীয় বাহিনী মদিনার দিকে অগ্রসর হয়। মদিনার উপকণ্ঠে ‘হাররা’ নামক স্থানে সংঘটিত যুদ্ধে ব্যাপক প্রাণহানি ঘটে। পরবর্তী সময়ে নগরীতেও সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হিজরতের ভূমি, যেখানে ইসলামের প্রথম শাসনব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল, সেখানেই মুসলমানদের মধ্যে সংঘর্ষ ও রক্তপাত সংঘটিত হয়।
হাজরে আসওয়াদ অপহরণ
হারামাইনের ইতিহাসে সবচেয়ে নৃশংস আক্রমণগুলোর একটি সংঘটিত হয় চতুর্থ হিজরি শতকে। ৩১৭ হিজরিতে কারামাতি নেতা আবু তাহির জান্নাবির বাহিনী হজের মৌসুমে মক্কায় আক্রমণ চালায়। হাজিদের হত্যা করে। পবিত্র কাবাঘরের মর্যাদা লঙ্ঘন করে। এমনকি হাজরে আসওয়াদও খুলে নিয়ে যায়। পাথরটি বাহরাইন অঞ্চলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল এবং দীর্ঘ সময় সেখানে ছিল। প্রায় ২২ বছর পর, ৩৩৯ হিজরিতে সেটি মক্কায় ফিরিয়ে আনা হয়।
মসজিদে হারাম দখল
আধুনিক যুগেও মক্কার পবিত্রতা ভয়াবহভাবে লঙ্ঘিত হয়েছে। ১৯৭৯ সালের ২০ নভেম্বর জুহাইমান উতাইবির নেতৃত্বে একদল সশস্ত্র ব্যক্তি মসজিদুল হারামের নিয়ন্ত্রণ দখল করে। তারা নিজেদের একজনকে মাহদি হিসেবে উপস্থাপন করে এবং মসজিদে অবস্থানরত বহু মানুষকে জিম্মি করে রাখে। সৌদি নিরাপত্তা বাহিনী তাদের বিরুদ্ধে অভিযান চালায়। সংঘর্ষ ও অবরুদ্ধ অবস্থা কয়েকসপ্তাহ স্থায়ী হয়। শেষ পর্যন্ত দখলদাররা পরাস্ত হয়।
ইসলামের সুস্পষ্ট নির্দেশনা
হারামাইনের মর্যাদা শুধু আবেগ বা ঐতিহাসিক স্মৃতির ওপর প্রতিষ্ঠিত নয়। ইসলাম সেখানে মানুষের নিরাপত্তা ও শান্তি রক্ষার জন্য সুস্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের কারও জন্য মক্কায় অস্ত্র বহন করা বৈধ নয়।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৩৫৬)
হাদিসটি মক্কার পবিত্রতা রক্ষায় ইসলামের কঠোর ও সুস্পষ্ট অবস্থান তুলে ধরেছে। হারামাইনের পবিত্রতা রক্ষার ক্ষেত্রে এ নির্দেশনার বাস্তব প্রয়োগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে অবস্থানরত হাজি, ওমরাহ পালনকারী, মুসল্লি ও সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সহিংসতা থেকে তাদের রক্ষা করা একটি বড় দায়িত্ব।
একদিকে কোরআন মক্কাকে নিরাপদ নগরী হিসেবে উল্লেখ করেছে, অন্যদিকে ইতিহাসে সেই নগরীতেই আক্রমণ সংঘটিত হয়েছে। একদিকে সহিহ হাদিসে দাজ্জালের মক্কা ও মদিনায় প্রবেশে নিষেধাজ্ঞার কথা এসেছে, অন্যদিকে বিভিন্ন যুগে মানুষ সেখানে সহিংসতা চালিয়েছে। এই দুইয়ের মধ্যে কোনো বিরোধ নেই। কারণ দাজ্জালের প্রবেশ সম্পর্কে হাদিসের ঘোষণা একটি নির্দিষ্ট ভবিষ্যৎ ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত, আর ইতিহাসে সংঘটিত সামরিক আক্রমণ মানুষের কর্মকাণ্ডের ফল।


