কেউ আপনার প্রশংসা করলে কী বলবেন

সুফি ও মনীষী শেখ আহমাদ ইবনে আতাউল্লাহ (রহ.) তার বিখ্যাত বই আলহিকামে বলেছেন, ‘মানুষ যখন আপনার বিষয়ে করা ধারণার ওপর ভিত্তি করে আপনার প্রশংসা করে, তখন আপনি আপনার নিজের সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে যা জানেন, তার জন্য নিজের আত্মসমালোচনা করুন। সেই সবচেয়ে বড় অজ্ঞ, যে নিজের সম্পর্কে নিশ্চিত সত্যকে অস্বীকার করে এবং অন্যের ধারণা বিশ্বাস করে।’
জীবনে চলার পথে আমাদের নানা ধরনের পরীক্ষার সম্মুখীন হতে হয়। এর মধ্যে একটি হলো, মানুষের মুখে আমাদের প্রশংসাবাক্য শোনা। প্রশ্ন হলো, মানুষ আমাদের প্রশংসা করলে তা কীভাবে গ্রহণ করব?
প্রশংসা কেন বিপজ্জনক
প্রশংসা বিপদ ডেকে আনতে পারে। একবার হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর সামনে এক ব্যক্তি অপর এক ব্যক্তির অতিরিক্ত প্রশংসা করছিলেন। তখন মহানবী (সা.) বললেন, ‘আফসোস তোমার জন্য, তুমি তো তোমার ভাইয়ের গর্দান কেটে ফেললে।’ তিনি এ কথা বারবার পুনরাবৃত্তি করে বললেন, যদি তোমাদের কাউকে কারও প্রশংস করতেই হয়, তবে যেন সে বলে, ‘আমি তার সম্পর্কে এমন ধারণা করি’ (যদি সে সত্যিই তেমন মনে করে)। আর আল্লাহ তাআলা তার প্রকৃত হিসাব গ্রহণকারী, কারণ তিনি তার প্রকৃত অবস্থান জানেন। আল্লাহর সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে কেউই কাউকে নিষ্পাপ বলে সনদ দিতে পারে না।’ (সহিহ বুখারি)
আরেক হাদিসে মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘যখন তোমরা অতিরিক্ত প্রশংসাকারীদের দেখবে, তখন তাদের মুখে ধূলা ছুড়ে মারো।’ (সহিহ মুসলিম)
মানুষের প্রশংসা ব্যক্তির নিয়ত বা উদ্দেশ্যকে কখনও বদলে দিতে পারে। প্রশংসা পাওয়ার পর সে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য না করে পরিবর্তে মানুষের প্রশংসার দিকে ঝুঁকতে পারে। নিজের মধ্যে চলে আসতে পারে মহান হওয়ার গৌরব।
প্রশংসা নিজের দোষ-ত্রুটিকে ভুলিয়ে দেয়। ব্যক্তি তখন নিজের গুণাবলি নিয়ে ভাবে। গুণের দিকে নজর দেয়। শেখ আহমাদ ইবনে আতাউল্লাহ (রহ.) বলেন, ‘মানুষ ধারণার ওপর ভিত্তি করে আপনার প্রশংসা করলে, আপনি নিজের বিষয়ে আত্মসমালোচনা করুন। মানুষ জানে আপনার বাহ্যিকটা, আপনি জানেন আপনার ভেতরের দুর্বলতা ও ত্রুটি।’
ইসলামের চতুর্থ খলিফা আলি (রা.) বলেন, ‘তাদের কারও যখন প্রশংসা করা হতো, তখন সে বলত, ‘আমি নিজেকে অন্যের চেয়ে ভালো চিনি, আর আমার রব আমার সম্পর্কে আমার চেয়েও বেশি জ্ঞাত। হে আল্লাহ, তারা যা বলছে সে জন্য আমাকে পাকড়াও করবেন না। তারা আমাকে যেমন মনে করে আমাকে তার চেয়েও উত্তম বানিয়ে দিন। তারা যেসব গুনাহের কথা জানে না, সেগুলো ক্ষমা করে দিন।’
আলি (রা.)-এর বর্ণনা অনুযায়ী, সাহাবিদের প্রশংসা করা হলে তারা বলতেন, ‘আমি নিজেকে অন্যের চেয়ে ভালো চিনি।’ তারা বলতেন, ‘আমার রব আমার সম্পর্কে আমার চেয়েও বেশি জ্ঞাত।’ শেষে সাহাবিরা দোয়া করতেন এভাবে, ‘আমাকে তাদের ভাবনার চেয়েও ভালো বানিয়ে দিন এবং তারা যে গুনাহের কথা জানে না, তা ক্ষমা করে দিন।’
কখনো কখনো প্রশংসা সওয়াব নষ্ট করে দেয়। কারণ, কাজের ক্ষেত্রে নিয়ত বা ইচ্ছাই মূল। কাজের নিয়ত যদি আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন না হয়ে মানুষের প্রশংসা কুড়ানো হয়, তখন তা হয়ে যায় লোকদেখানো। এতে সওয়াব পাওয়া যায় না।
প্রশংসা হতে পারে সুসংবাদ
কখনও প্রশংসা মুমিনের জন্য সুসংবাদও হতে পারে। হজরত আবু জর (রা.) বলেন, মহানবী (সা.)-কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, ‘কোনো ব্যক্তি ভালো কাজ করলে মানুষ যদি তার প্রশংসা করে, তবে সে বিষয়ে আপনার মতামত কী?’ তিনি বললেন, ‘এটা তো মুমিনের জন্য দুনিয়াতেই নগদ সুসংবাদ।’ (সহিহ মুসলিম)। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘তাদের জন্য রয়েছে সুসংবাদ পার্থিব জীবনে এবং আখেরাতে।’ (সুরা ইউনুস, আয়াত: ৬৪)
