logo

সৌদি আরবের সঙ্গে মিল রেখে বাংলাদেশে ঈদ করা সঠিক নয় 

সৌদি আরবের সঙ্গে মিল রেখে বাংলাদেশে ঈদ করা সঠিক নয় 
ছবি: এশিয়া পোস্ট গ্রাফিকস

শাইখুল হাদিস মুফতি সফিউল্লাহ আদম দায়িত্ব পালন করছেন রাজধানীর তেজগাঁও রেলওয়ে জামিয়া ইসলামিয়ার শিক্ষা সচিব হিসেবে। সৌদি আরবের সঙ্গে মিল রেখে ঈদ উদযাপন, দেশে শাওয়াল মাসের চাঁদ না উঠলে মুসলিমদের করণীয়সহ নানা বিষয়ে এশিয়া পোস্টের সঙ্গে কথা বলেছেন বিশিষ্ট এই ইসলামি গবেষক। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন রায়হান রাশেদ

এশিয়া পোস্ট: মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে পবিত্র শাওয়াল মাসের চাঁদ দেখা না যাওয়ায় সৌদি আরবে ঈদুল ফিতর উদযাপিত হবে শুক্রবার (২০ মার্চ)। এখন সৌদির সঙ্গে মিল রেখে বাংলাদেশে একই দিনে ঈদ করা যাবে? 

মুফতি সফিউল্লাহ: ইসলামি শরিয়তের যেসব বিধান বছরে একবার আদায় করতে হয়, সেগুলো সাধারণত চাঁদকেন্দ্রিক হয়ে থাকে। চাঁদ দেখে সেসব বিধান পালন করতে হয়। যেমন—হজ, জাকাত, রোজা, ঈদ ও কোরবানি ইত্যাদি। আর যেসব বিধান প্রতিদিন আদায় করতে হয়, সেগুলো সূর্যের বিভিন্ন অবস্থানের সঙ্গে মিলিয়ে করতে হয়। সূর্যের সময়ের সঙ্গে সেগুলো নির্ধারিত। যেমন—পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, সাহরি-ইফতার ও নামাজের নিষিদ্ধ সময়সমূহ।

এ মূলনীতির আলোকে রমজান মাস শুরু হওয়া কিংবা শাওয়াল মাসের প্রথম তারিখে ঈদ পালন করা নির্ভর করে মূলত চাঁদ দেখার ওপর। আবার চাঁদের উদয়াস্তের ভিন্নতাও একটি প্রমাণিত বিষয়। কেননা সমগ্র বিশ্বে চাঁদের দিগন্ত রেখা এক নয়। বরং ভিন্ন ভিন্ন হয়ে থাকে। তাই সাধারণভাবে নিজ দেশের চাঁদ দেখা বা নির্ভরযোগ্য ঘোষণা অনুযায়ী চাঁদ দেখা প্রমাণিত হওয়ার পরই শুধু ঈদ উদযাপন করা যাবে। 

হজরত মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা চাঁদ দেখে রোজা রাখো এবং চাঁদ দেখে রোজা ভাঙো অর্থাৎ ঈদ করো।’ আরেক হাদিসে আছে, ‘যদি চাঁদ দেখা না যায় (মেঘ কিংবা প্রাকৃতিক কোনো কারণে), তবে ৩০ দিন পূর্ণ করো।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৯০৯, সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১০৮১)ৎ

এ হাদিস অনুযায়ী সৌদিতে চাঁদ দেখার কারণে বাংলাদেশে ঈদ করা সঠিক নয়। আমাদের এখানে ঈদ করতে হলে দেশের আকাশে চাঁদ দেখা প্রমাণিত হতে হবে। 

এশিয়া পোস্ট: সৌদি আরবে চাঁদ ওঠার সঙ্গে ঈদের কোনো সম্পর্ক কী রয়েছে? 

মুফতি সফিউল্লাহ: ঈদের সম্পর্ক শাওয়াল মাসের চাঁদ ওঠার সঙ্গে নির্ধারিত। শাওয়াল মাসের চাঁদ উঠলে প্রথম দিন ঈদুল ফিতর পালন করতে হবে। ঈদুল ফিতরের নামাজ আদায় করতে হবে। কোনো নির্দিষ্ট দেশের সঙ্গে মিল রেখে ঈদুল ফিতর আদায় করা যাবে না। 

যথাযথ পদ্ধতিতে বা যথাযথ কর্তৃপক্ষের ঘোষণার আলোকে চাঁদ ওঠার বিষয়টিও প্রমাণিত হতে হবে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তারা আপনাকে চাঁদ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। বলে দিন, এগুলো মানুষের জন্য (বিভিন্ন ইবাদতের) সময় নির্ধারণের মাধ্যম।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৮৯)

ইসলামে সময় নির্ধারণের মূল ভিত্তি চাঁদ, কোনো দেশের অনুসরণ নয়। তাই সৌদি আরবের অনুসরণ করে বাংলাদেশে রোজা রাখা বা ঈদ করা যাবে না। 

এশিয়া পোস্ট: বাংলাদেশের বেশ কিছু গ্রামের মানুষ সৌদি আরবের সঙ্গে মিল রেখে ঈদ করেন, তাদের ঈদের বিষয়ে ইসলামের বিধান কি? তাদের ঈদ হবে?

মুফতি সফিউল্লাহ: সৌদি আরবের সঙ্গে মিল রেখে ঈদ করার বিষয়টি ক্ষেত্রবিশেষে বাড়াবাড়ি কিংবা অজ্ঞতার কারণে হয়ে থাকে। রাষ্ট্রীয়ভাবে এগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত। কেননা সরকারি ঘোষণার সম্পূর্ণ বিপরীতে গিয়ে তারা এ কাজগুলো করছে। ইসলামি বিধান হচ্ছে, যদি কোনো এলাকায় সরকারি বা শরিয়তসম্মত ঘোষণা ছাড়াই অন্য দেশের অনুসরণ করে ঈদ করা হয়, তাহলে তা শরিয়তসম্মত হবে না। কারণ ইসলামে সমাজ ও মুসলিম কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ঐক্য বজায় রাখার নির্দেশ আছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘রোজা সেই দিন, যেদিন তোমরা সবাই রোজা রাখো; আর ঈদও হবে সেই দিন, যেদিন তোমরা সবাই ঈদ করো।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৬৯৭)
 
হজরত আয়েশা (রা.) বলেন, ‘কোরবানি তো সেদিন, যেদিন ইমাম (মুসলমানদের রাষ্ট্রপ্রধান) ও সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ কোরবানি করে। ঈদুল ফিতর তো সেদিন, যেদিন ইমাম ও সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ রোজা ভাঙে।’ (মুসান্নাফে আবদুর রাজ্জাক, হাদিস: ৭৩১০)। অর্থাৎ মুসলিম সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে আলাদা ঈদ করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

 

এশিয়া পোস্ট: ৩০ রমজানের পরও আকাশে মেঘ বা কোনো কারণে চাঁদ দেখা না গেলে করণীয় কী?

মুফতি সফিউল্লাহ: সৌদির সঙ্গে মিল রেখে ঈদ করার কোনো সুযোগ নেই। হাদিসের নির্দেশ অনুযায়ী, ৩০ দিন পূর্ণ হলে মাস শেষ হয়ে নতুন মাস শুরু হয়। তাই পরদিন শাওয়ালের এক তারিখ হওয়ায় ঈদ করতে হবে। আরবি মাস কখনোই ৩০ দিনের বেশি হয় না। ৩০ দিন পূর্ণ হওয়ার পর আকাশে মেঘ বা অন্য যে কোনো কারণে চাঁদ দেখা না গেলে পরদিন থেকে নতুন মাসের এক তারিখ গণনা করতে হবে। রমজানের ৩০ রোজা হয়ে গেলে চাঁদ দেখা না গেলেও পরের দিন শাওয়ালের এক তারিখ শুরু হবে। ওই দিনই ঈদুল ফিতর হবে। বুখারির হাদিসে আছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা মাস ৩০ দিন পূর্ণ করো।’ 

এশিয়া পোস্ট: তাহলে পার্শ্ববর্তী কোনো দেশের সঙ্গে মিল রেখে ঈদ করা যাবে না? 

মুফতি সফিউল্লাহ: এ বিষয়ে একটি মৌলিক কথা জানা থাকলে অনেক প্রশ্ন এমনিতেই শেষ হয়ে যাবে। চান্দ্রমাস শুরু করার ক্ষেত্রে শরিয়ত ভিত্তি রেখেছে চাঁদ দৃষ্টিগোচর হওয়া এবং দৃষ্টিগোচর হওয়ার বিষয়টি শরয়ি পদ্ধতিতে (রাষ্ট্র কর্তৃক চাঁদ দেখার ঘোষণা দেওয়া বা স্থানীয়দের মাধ্যমে চাঁদ দেখার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া) প্রমাণিত হওয়ার ওপর। 

জ্যোতির্বিজ্ঞানের হিসাব অনুযায়ী, নতুন চাঁদের জন্ম হওয়া বা পাশের কোনো দেশে চাঁদের উদয়ের বিষয়টিকে শরিয়তে মানদণ্ড হিসেবে ধরা হয়নি। তবে ইসলামি গবেষকরা বলেন, কাছাকাছি এলাকায় সাধারণত একই সময়ে চাঁদ দৃষ্টিগোচর হয়। পাশের দেশের চাঁদ যদি আরেক প্রতিবেশী দেশ রাষ্ট্রীয়ভাবে গ্রহণ করে বা ওই দেশের চাঁদ দেখা কমিটি গ্রহণ করে, তাহলে পাশের দেশের সঙ্গে মিলিয়ে ঈদ করতে কোনো অসুবিধা নেই। 

দূরবর্তী এলাকা বা ভিন্ন দিগন্তের অঞ্চলে চাঁদ উদয়ের বিষয়টি আগে পরে হতে পারে। তাই প্রত্যেক অঞ্চলের নিজস্ব চাঁদ দেখা অনুসরণ করাই ভালো এবং নিরাপদ। কিন্তু দূরবর্তী দেশ যেমন সৌদি আরবের সঙ্গে মিল রেখে বাংলাদেশে ঈদ করার সুযোগ নেই। প্রত্যেক দেশের যথাযথ কর্তৃপক্ষ অথবা সরকারি চাঁদ দেখা কমিটির ঘোষণা অনুসরণ করাই উত্তম।