logo

মসজিদ দেখভালে হিন্দু পরিবার, ১৬ বছর ধরে রোজা রাখেন এক সদস্য

মসজিদ দেখভালে হিন্দু পরিবার, ১৬ বছর ধরে রোজা রাখেন এক সদস্য

ভারতের কলকাতার শহরতলির এক হিন্দু বাড়িতেই গড়ে উঠেছে ‘আমানতি মসজিদ’। এক হিন্দু পরিবারই এই পবিত্র স্থাপনার রক্ষণাবেক্ষণ করে আসছে। সেই পরিবারের সন্তান পার্থসারথি বোস। যিনি ১৬ বছরের বেশি সময় ধরে রোজা পালন করছেন। এর মাধ্যমে পশ্চিমবঙ্গের সম্প্রীতির নজির গড়ে উঠেছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

আমানতি মসজিদে পবিত্র রমজান মাসের প্রতিদিন দেড় শতাধিক মুসল্লি ইফতার করেন। নামাজও আদায় করেন আশপাশের এলাকায় কাজে আসা মুসলমানরা। কিন্তু এব সব দেখভালের দায়িত্বে রয়েছে একটিমাত্র হিন্দু পরিবার।

কলকাতার প্রায় ২৫ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত বারাসতের ক্ষুদ্র আমানতি মসজিদের এক পাশে প্রতিমা নির্মাতাদের কর্মশালা এবং অন্য পাশে হার্ডওয়্যার গ্যারেজ। টিনের ছাদসহ একতলা ভবনটি কলকাতার উপকণ্ঠে একটি সর্বজনীন উপাসনালয় বলে গণ্য করা হয়।

পার্থসারথি বোস জানান, সিয়াম সাধনার মাসে নিয়ম করে রোজা পালন করেন তিনি। ১৬ বছরের বেশি সময় ধরে সেই নিয়ম ও নিষ্ঠা বজায় রেখেছেন। তিনি বলেন, ‘এ নিয়ে টানা ১৬ বছর ৩০ রোজা রাখছি। তবে তার আগেও করতাম। কিন্তু তখন পুরো মাসটা রাখা হতো না। সেসব ধরলে বহু বছর ধরে রমজানে মাসে রোজা রেখে আসছি।’

পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ২৪ পরগনা জেলার বারাসাতের পশ্চিম ইছাপুরের নবপল্লীর সেই আমানতি মসজিদের গল্প সবাই জানেন। ১৯৬০ সালে সম্পত্তি বিনিময় প্রথার মাধ্যমে খুলনার আলকা গ্রাম থেকে পশ্চিমবঙ্গে চলে আসেন পার্থসারথীর দাদু নিরোধকৃষ্ণ বোস। ওঠেন উত্তর ২৪ পরগনার বারাসাতে। বসতভিটায় সন্ধান মেলে এক জরাজীর্ণ মসজিদের। ধর্মীয় সম্মান জানিয়ে সেই মসজিদ আগলে রাখেন নিরোধকৃষ্ণ বোস। পরে তার ছোট ছেলে দীপক বোস দায়িত্ব পান মসজিদের। নাম দেওয়া হয় আমানতি মসজিদ। এখন এর দায়িত্ব পালন করেন পার্থসারথি।

সম্প্রীতির এই উদাহরণ নিয়ে স্থানীয় বহু গণমাধ্যমে এ নিয়ে বহু সংবাদ প্রকাশিত হয়ে আসছে। ২০১৮ সালের ৯ আগস্ট ‘প্রচলিত ধারণা ভেঙে কয়েক দশক ধরে কলকাতার শহরতলিতে মসজিদ পরিচালনা করছে হিন্দু পরিবার’, এমন শিরোনামে এক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ভারতীয় মতামতভিত্তিক সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়্যার।

প্রতিবেদনে বলা হয়, আমানতি মসজিদ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ করতেন দীপক বসু। তিনি বলেছিলেন, ‘এটি (আমানতি মসজিদ) আমার পরিচয়। আমি পৃথিবীর কোনো কিছুর বিনিময়ে এটিকে বিক্রি করব না।’

তিনি বলেন, আমার মা মসজিদের পূর্ব দেয়ালের বাইরের বারান্দায় একটি মোমবাতি জ্বালান। তিনি তাৎক্ষণিক সংযোগ অনুভব করেন এবং জোর দিয়ে বলেন যে আমাদের সবার জন্য একটি উপাসনালয় তৈরি করা উচিত। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার মধ্যে পালিয়ে আসা লোকজনের জন্য একটি আশ্রয় হতে পারে এই মসজিদ।’

পীর আমানত শাহ বাংলাদেশের একজন জনপ্রিয় সাধক। তার স্মরণে বসু পরিবার নামকরণ করে আমানতি মসজিদ।

শুক্রবার (২৭ ফেব্রুয়ারি) অনলাইন বাংলানিউজ টোয়েন্টিফোর এ নিয়ে এক প্রতিবেদন প্রকাশ করে। তাতে বলা হয়, পার্থর কাছে জানতে চাওয়া হয়েছে কেন রোজা রাখেন? জবাবে পার্থ বলেন, ‘২০০৯ সালের আগে মসজিদের সঙ্গে আমার অত সম্পৃক্ততা ছিল না। বাবা দীপক বোস তখন মসজিদের দেখাশোনা করতেন। কিন্তু সেবার রোজার মাসে বন্ধুদের সঙ্গে মদ্যপ অবস্থায় বাইক থেকে পড়ে গিয়ে ডান কাঁধের হাড় ভেঙে যায়। চিকিৎসকরা বলেন, এ হাড় জোড়া লাগবে না। অনুশোচনা হয়, বুঝতে পারি, নিজেদের বাস্তুভিটায় মসজিদ আছে আর রমজানেই অন্যায় করে ফেলেছি।’

‘পরদিন সকালেই মসজিদে এসে কেঁদে ফেলি। আমি বলি, আমার ভুল হয়ে গেছে আর কোনো দিন হবে না। আমাকে তুমি শাস্তি দিয়েছ। আমি সেই ছেলে হব, যে এই মাসে রোজা রাখবে। আর জীবিত অবস্থায় রোজা ভাঙব না। আমার এই হাড় জোড়া লাগিয়ে দাও, এই বলে মসজিদের মাটি আমি কাঁধে লাগাই। এরপর ধীরে ধীরে ঠিক হয়ে যায়, হাড়ে জোড়া লাগে।’

পার্থ বলেন, ‘এই মসজিদ আমাকে এমন শিক্ষা দিয়েছে যে আর ভালো না থেকে উপায় নেই। সিয়াম সাধনার মাসে এখন রোজা রেখে মসজিদে পড়ে থাকি। এ সময় আমার মনে বাজে চিন্তা আসে না। আসলে বলতে পারেন আমার মনে একটা ভয় ঢুকে গেছে। যদি আবার ভুল করি বা অন্যায় করি, তাতে যদি অন্য কিছু ক্ষতি হয়। ফলে তারপর থেকেই রোজা রেখে আসছি।’

দ্য ওয়্যারের প্রতিবেদনেও উঠে আসে এমন বিশ্বাসের গল্প। গণমাধ্যমটি সেই প্রতিবেদনে বলেছে, ‘হিন্দু-সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকায় সর্বস্তরের বিশ্বাসীরা এখানে নামাজ আদায় করার জন্য আসতে শুরু করেন। নিকটবর্তী মালিকাপুর গ্রামের একজন দোকানদার রাজু ভাস্কর প্রতিদিন বিকেলে ১০ কিলোমিটার সাইকেল চালিয়ে বারাসত শহরে যান। তিনি তার ৮২ বছর বয়সী দাদুর কাছ থেকে আমানতি মসজিদ সম্পর্কে জানতে পারেন। তিনি বলেন, ‘আজও আমার দাদু আমানতির অলৌকিক ক্ষমতার ওপর বিশ্বাস রাখেন। এটি তাকে এক মারাত্মক রোগ থেকে আরোগ্য করেছিল। তাই আমি প্রতিদিন এখানে আসি।’

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ‘মসজিদের আরোগ্য ক্ষমতায় দীপক বসু নিজেই মুগ্ধ হয়েছিলেন যখন তার ছেলে পার্থসারথি যখন মাত্র তিন বছর বয়য়ে জন্ডিস থেকে সেরে ওঠে। তিনি বলেন, ‘তার (পার্থ) স্বাস্থ্যের অবনতি হচ্ছিল, তাই আমরা তাকে মসজিদে নিয়ে এসে নামাজ পড়ি। তিন দিনের মধ্যে তার উন্নতি হয়। সবকিছুই বিশ্বাসের ওপর নির্ভর করে।’

রোজার মাসে প্রতিদিন শতাধিক মুসল্লি ইফতার করেন। বসু পরিবারের সঙ্গে ইফতারের আয়োজন করেন মুসল্লিরাও।

পার্থ বলেন, ‘আমার পরিবারে কেউ রোজা রাখে না। কিন্তু সবাই আমাকে সহযোগিতা করেন। সাহরির আয়োজন আমার স্ত্রী করে দেন। ইফতারও রাখি হালকাভাবে–খেজুর, পাঁচ রকম ফল মুড়ি ইত্যাদি।’

ছবি : সংগৃহীত

মসজিদটি পার্থসারথিদের বাড়িতে অবস্থিত। ফলে এখনও এর মালিকানা বোস পরিবারের। তবে সম্প্রীতি বজায় রাখছেন স্থানীয়রাও। পার্থ বলেন, ‘বারাসাত ৮ নম্বর ওয়ার্ড পুরোটাই হিন্দু-অধ্যুষিত এলাকা। এ অঞ্চলে একজনও মুসলিম ভোটার নেই। মায়ের কোলে যেমন শিশু থাকে, তেমন এই মসজিদ আমাদের সন্তান। সেভাবেই আগলে রেখেছি আমরা।’

তাহলে নামাজ পড়েন কারা? তিনি বলেন, ‘প্রায় দুই কিলোমিটারের বেশি জায়গাজুড়ে কোনো মসজিদ নেই। এ অঞ্চলে বিভিন্ন দোকানপাট, বাজারে কাজ করেন মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষ। তারাই আসেন মসজিদে। আর এখন জনপ্রিয় হওয়ায় দূর-দূরান্ত থেকে বহু মানুষ আসেন।’

সরকার বা স্থানীয়দের কাছ থেকে দান নেন কি না, জানতে চাইলে পার্থ বলেন, ‘না, নিই না। কারণ, ভয় পাই। হারাম না হালাল বুঝতে পারি না। তাই দান নেওয়া হয় না। মসজিদে দানবাক্স দেখতে পাবেন না।’

স্থানীয়দের দাবি, সম্প্রীতির বাংলায় এ অঞ্চলে ধর্মীয় দৃষ্টিতে বিচার করা হয় না। সিধু সাহা নামের একজন বলেন, ‘সকালে দরজা খুললেই মসজিদ দেখতে পাই। এ অঞ্চলে হিন্দু-মুসলমানের কোনো ভেদাভেদ নেই। এই মসজিদ আমাদের সম্প্রীতির বার্তা। জন্ম থেকেই এই মসজিদ দেখে আসছি।’

ষাটোর্ধ্ব দেবাশীষ সরকার বলেন, ‘এই মসজিদ আমাদের কাছে মন্দিরের মতো। বাসা থেকে বের হওয়ার সময় মসজিদের সামনে প্রণাম বা সেজদা দিয়েই বের হই। এটা আমাদের জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।’

৮০ বছর বয়সি মিনা দেবী বলেন, ‘এখন বাসা থেকে বের হওয়ার শক্তি আমার নেই। ঘুম থেকে উঠে যেমন আমি ইষ্ট দেবতাকে স্মরণ করি। তেমনভাবেই মসজিদ আমাকে শক্তি দেয়। ওদের ভোরের আজান আমার ঘুম ভাঙায়।’

৯০ দশক থেকে দায়িত্বে থাকা মসজিদের ইমাম আক্তার বলেন, ‘এমন নজির কোথাও নেই। এই মসজিদ বাংলায় এক নজির। বিশ্বে এমন নজির কোথাও আছে বলে আমার জানা নেই। কারণ, মুসলমানরা এখানে নামাজ পড়ে চলে যান। কিন্তু মসজিদের দেখভাল করে এক হিন্দু পরিবার। আর আমাদের বিধানে এমন কোনো কথা নেই যে একজন হিন্দু মসজিদের দেখভালে সঙ্গে জড়িত থাকতে পারবেন না।’

অন্যদিকে পার্থসারথি বলেন, ‘মসজিদের রক্ষণাবেক্ষণ, দেখভাল অবশ্যই আমরা করি। কিন্তু ইসলামের নিয়মনীতিতে মাথা গলাই না।’

মসজিদের ইমামের অভিমত, ইসলাম বজায় রাখে শান্তি ও সম্প্রীতি। আত্মত্যাগ করার নামই রোজা। সিয়াম সাধনার মাসে আজও আত্মত্যাগ করে আসছেন পার্থসারথি বোস। আর তাকে সম্মতি জানাচ্ছেন পরিবারসহ প্রতিবেশীরাও।

স্থানীয়রা জানান, বসুদের পারিবারিক সংস্কৃতির সঙ্গেও ক্রমে একাকার এ মসজিদ। এ বাড়ির কেউ মারা গেলে তাকে একবার ঠিক নিয়ে আসা হবে এখানে। শ্মশানে শেষযাত্রার আগে আজান দেবেন ইমাম সাহেব। বিয়ের পরে নতুন বউকেও শ্বশুরবাড়ি ঢোকার আগে মসজিদে প্রণাম করতে আসতে হবে। আর এ বাড়িতে নবজাতকের অন্নপ্রাশনের দস্তুর নেই। তার বদলে মসজিদে ইমাম সাহেবের হাতে একটু পায়েস মুখে দেওয়ার রীতি। সাম্প্রদায়িক ঘৃণা ও বিদ্বেষের উসকানির কাছে হার না-মানা পারিবারিক মূল্যবোধেরও আমানত এই মসজিদ-প্রাঙ্গণ।

সূত্র : বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর, দ্য ওয়্যার