বাংলাদেশে আসন্ন নির্বাচনে প্রধান খেলোয়াড় কে?

২০২৪ সালে গণঅভ্যুত্থানে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পতন ও পলায়নের দেড় বছর পর বাংলাদেশে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি। এবারের নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে বেশ কয়েকটি জোট ও দল। পাশাপাশি একই দিনে একটি গণভোটও অনুষ্ঠিত হবে। গণঅভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্রীয় ও শাসনের মৌলিক কাঠামো কী হবে, তা নির্ধারণের জন্যই হচ্ছে এবারের গণভোট। পাশাপাশি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন স্বতন্ত্র প্রার্থীরাও। এবারের নির্বাচনে নিবন্ধিত ভোটার ১২ কোটি ৭০ লাখের বেশি।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে বিক্ষোভকারীদের দমনে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশ দেন শেখ হাসিনা। এতে প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষ নিহত হয়। ওই দমন-পীড়নের দায়ে বাংলাদেশে গঠিত বিশেষ ট্রাইব্যুনাল তাকে মৃত্যুদণ্ড দেন। তিনি বর্তমানে ভারতে নির্বাসনে রয়েছেন এবং তার দল আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক কার্যক্রম থেকে নিষিদ্ধ।
২০২৪ সালের ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হলে প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব গ্রহণ করেন নোবেলবিজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস।
আলজাজিরার একটি বিশ্লেষণমূলক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অন্তত তিনটি বিতর্কিত নির্বাচনের পর এবার অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে আয়োজিত হচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট। সারা দেশের ৩০০ আসনে সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অংশ নিচ্ছে বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক দল ও তাদের জোট।
এর মধ্যে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নেতৃত্ব দিচ্ছে ১০ দলীয় জোটের, ১১টি দলের জোটের নেতৃত্ব দিচ্ছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোটে রয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। দলটি ২০২৪ সালের হাসিনাবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া শিক্ষার্থীদের সমন্বয়ে গঠিত হয়েছে। তবে কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে আধিপত্য বিস্তার করা আওয়ামী লীগ এই নির্বাচনে প্রার্থী দিতে পারছে না।
এই দুই প্রধান জোটের বাইরে, জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট থেকে বেরিয়ে যাওয়া ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এবং আওয়ামী লীগের দীর্ঘদিনের মিত্র জাতীয় পার্টিও স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে।
ভোটের মাঠে দলগুলোর অবস্থান
বিএনপি
আলজাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়, আসন্ন নির্বাচনের অন্যতম প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখা হচ্ছে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ও শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ছেলে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপিকে।
১৯৭৮ সালে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদকে দলের মূল আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করা দলটি প্রতিষ্ঠা করেন জিয়াউর রহমান।
দলের ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ এটি এমন একটি আদর্শ যা জাতি, লিঙ্গ বা বর্ণ নির্বিশেষে সব বাংলাদেশির অধিকারকে স্বীকৃতি দেয়। মধ্যমপন্থি দল হিসেবে বিএনপি দীর্ঘদিন ধরে দেশের অন্যতম প্রভাবশালী শক্তি। এর আগে তারা বেশ কয়েকবার বাংলাদেশে সরকার গঠন করেছে।
১৯৮১ সালে জিয়াউর রহমান শহীদ হওয়ার পর প্রায় চার দশক বিএনপির নেতৃত্ব দেন তার স্ত্রী খালেদা জিয়া। তিনি ১৯৯১-৯৬ এবং ২০০১-০৬ মেয়াদে বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ওই সময়ে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক লড়াইয়ে বিএনপির মিত্র ছিল জামায়াতে ইসলামী।
২০০৯ সালে শেখ হাসিনা আবার ক্ষমতায় ফেরার পর বিএনপি ও খালেদা জিয়া দুর্নীতির মামলার মুখে পড়েন। ২০১৮ সালে খালেদা জিয়াকে গৃহবন্দি করা হয়। ২০২৪ সালে হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির পর তিনি সব অভিযোগ থেকে খালাস পান।
হাসিনার পতনের পর আবার রাজনৈতিক অঙ্গনে শীর্ষ প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে উঠে আসে বিএনপি। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউটের এক জরিপে দেখা যায়, গত ডিসেম্বর মাসে ৩৩ শতাংশ সমর্থন নিয়ে বিএনপি এগিয়ে ছিল। ওই সময় নির্বাচন সামনে রেখে নিজেদের উদার রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে তুলে ধরতে জামায়াতের সঙ্গে জোট ভাঙে দলটি। জরিপ অনুযায়ী, জনপ্রিয়তায় জামায়াত বিএনপির খুব কাছাকাছি।
৬০ বছর বয়সি তারেক রহমান রাজনৈতিক নিপীড়নের অভিযোগে ২০০৮ সালে বাংলাদেশ ছাড়েন এবং দীর্ঘদিন লন্ডনে ছিলেন। ২০২৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর তিনি ঢাকায় ফেরেন। পাঁচ দিন পর, ৩০ ডিসেম্বর তার মা খালেদা জিয়া মারা যান।
দেশে ফেরার পর সাম্প্রতিক নির্বাচনি সমাবেশগুলোতে রাষ্ট্রের অবকাঠামোগত উন্নয়ন, স্বাস্থ্যব্যবস্থা সংস্কার এবং তরুণদের কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি দেন তারেক রহমান।
ইন্ডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের শিক্ষক খন্দকার তাহমিদ রেজওয়ানের মতে, ‘তারেক রহমান ফেরার পর বিএনপি সাংগঠনিকভাবে আরও শক্তিশালী হয়েছে। কেন্দ্রীয় ও তৃণমূল, উভয় স্তরেই নতুন উদ্দীপনায় ঘুরে দাঁড়িয়েছে দলটি।’ তৃণমূল পর্যায়ে দলটির বিরুদ্ধে চাঁদাবাজিসহ নানা অভিযোগও তুলনামূলকভাবে কমেছে বলে মনে করেন তিনি।
জামায়াতে ইসলামী
১৯৪১ সালে ব্রিটিশ শাসনামলে সাইয়েদ আবুল আলা মওদুদী জামায়াতে ইসলামী প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নেওয়ায় স্বাধীনতার পর দলটি নিষিদ্ধ হয়। ১৯৭৯ সালে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান সেই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করেন। এরপর দুই দশকে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয় জামায়াত। ১৯৯১ ও ২০০১ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট সরকারে শরিক ছিল দলটি।
২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত শেখ হাসিনার শাসনামলে মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে জামায়াতের পাঁচ শীর্ষ নেতার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়। ওই সময় কারাবন্দি হন দলটির আরও অনেক নেতা। ২০১৩ সালে দলটির নিবন্ধন বাতিল করা হয়। তবে ২০২৫ সালের জুনে সুপ্রিম কোর্ট সেই নিবন্ধন পুনর্বহাল করেন, ফলে নির্বাচনে অংশগ্রহণের পথ খুলে যায় তাদের।
দলের বর্তমান আমির শফিকুর রহমানের নেতৃত্বে জামায়াত আবার সাংগঠনিকভাবে সক্রিয় হয়েছে। তিনি বলেন, ‘এবারের নির্বাচন অতীতের পুরোনো অপরাজনীতি কবর দেওয়ার একটি সুযোগ তৈরি হয়েছে।’
তবে জামায়াতের পুনরুত্থান ঘিরে বিতর্কও রয়েছে। কেউ কেউ প্রশ্ন করছেন, বাংলাদেশ কি ইসলামপন্থি নেতৃত্বের জন্য প্রস্তুত? তাছাড়া দলটি ক্ষমতায় এলে নারী ও সংখ্যালঘুদের অধিকার খর্ব হওয়ার আশঙ্কা নিয়েও সমালোচনাও আছে। অবশ্য জামায়াত এসব আশঙ্কা নাকচ করে দিয়ে বলছে, তারা গণতান্ত্রিক পথেই ক্ষমতায় আসতে চায়।
জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)
২০২৪ সালের জুলাইয়ে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে হওয়া আন্দোলনে তৎকালীন আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের পতন হয়। পরে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে তাদের নেতৃত্বে গঠন করা হয় জাতীয় নাগরিক পার্টি।
আলজাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়, অর্থনৈতিক সক্ষমতার অভাবে জামায়াতের সঙ্গে জোট বাঁধে এনসিপি। তবে এ সিদ্ধান্তে দলটির ভেতরে বিভাজন সৃষ্টি হয় এবং কয়েকজন নেতা পদত্যাগ করেন। তাদের অভিযোগ, মুক্তিযুদ্ধবিরোধী ইতিহাস থাকা দলের সঙ্গে জোট এনসিপির আদর্শের পরিপন্থি।
অন্যদিকে আসন্ন নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করেছেন ভারতে নির্বাসনে থাকা শেখ হাসিনা। আলজাজিরার প্রতিবেদনে তাকে উদ্ধৃত করে বলা হয়, ‘বর্জনের মাধ্যমে গঠিত সরকার বিভক্ত জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করতে পারে না।’ এ পরিস্থিতিতে এবারের নির্বাচনে বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে, আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশ নিতে না পারায় দলটির সমর্থকরা এবার কাকে ভোট দেবেন? বিশ্লেষকদের মতে, নিষিদ্ধ হলেও আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনা এখনও রাজনৈতিক বাস্তবতায় একটি বড় ফ্যাক্টর, যা আসন্ন নির্বাচনকে ঘিরে অস্থিরতার সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।
আলজাজিরায় ‘Bangladesh election: Who are the key players and parties?’ শিরোনামের বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনটি অনুবাদ করেছেন মুহাম্মাদ শাখাওয়াত হুসাইন।