logo

মূল ফ্যাক্টর দুর্নীতি, জানালেন ৬৭ শতাংশ ভোটার

মূল ফ্যাক্টর দুর্নীতি, জানালেন ৬৭ শতাংশ ভোটার

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে দেশব্যাপী পরিচালিত একটি মতামত জরিপে দেখা গেছে, নির্বাচনে ভোটারদের সিদ্ধান্তে দুর্নীতির বিষয়টি সবচেয়ে বড় প্রভাব ফেলছে। অংশগ্রহণকারী ভোটারদের ৬৭ দশমিক ৩ শতাংশ জানিয়েছেন, ভোট দেওয়ার সময় তারা দুর্নীতির ইস্যুকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেবেন। একই সঙ্গে ৩৫ দশমিক ৯ শতাংশ ভোটার ধর্মীয় বিষয়কে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন। এ ছাড়া দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, উন্নয়ন, কর্মসংস্থান ও জননিরাপত্তাও ভোটারদের সিদ্ধান্তে বড় ভূমিকা রাখবে বলে জরিপে উঠে এসেছে।

‘আনকভারিং দ্য পাবলিক পালস: ফাইন্ডিংস ফ্রম আ নেশনওয়াইড সার্ভে’ শীর্ষক এই জরিপটি যৌথভাবে পরিচালনা করেছে কমিউনিকেশন অ্যান্ড রিসার্চ ফাউন্ডেশন (সিআরএফ) এবং বাংলাদেশ ইলেকশন অ্যান্ড পাবলিক অপিনিয়ন স্টাডিজ।

বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে জরিপের ফলাফল আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়।

সংবাদ সম্মেলনে জরিপের ফল উপস্থাপন করেন সিআরএফের স্ট্র্যাটেজিক কোঅর্ডিনেটর জাকারিয়া পলাশ। তিনি জানান, দেশের ৬৪ জেলার ১৮০টি সংসদীয় আসনে মোট ১১ হাজার ৩৮ জন ভোটারের ওপর এই জরিপ চালানো হয়েছে। ২০২৫ সালের ২০ নভেম্বর থেকে ২০২৬ সালের ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত দুই ধাপে জরিপ কার্যক্রম সম্পন্ন করা হয়।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ভোট দিতে আগ্রহী ভোটারের হার ৯০ শতাংশেরও বেশি। জরিপে অংশ নেওয়া ভোটারদের মধ্যে মাত্র ৮ শতাংশ জানিয়েছেন, তারা ভোট দেওয়া নিয়ে এখনো অনিশ্চিত অথবা নির্বাচনে অংশ নেওয়ার কোনো পরিকল্পনা করেননি।

জরিপে আরও উঠে এসেছে, আগে যারা আওয়ামী লীগকে ভোট দিতেন বর্তমানে দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় তাদের প্রায় অর্ধেক, অর্থাৎ ৪৮ দশমিক ২ শতাংশ এবার বিএনপির পক্ষে ভোট দেওয়ার কথা জানিয়েছেন। আর আওয়ামী লীগের ২৯ দশমিক ৯ শতাংশ ভোটার এবার জামায়াতের পক্ষে ভোট দেওয়ার কথা বলেছেন। জাতীয় নাগরিক পার্টিকে (এনসিপি) ভোট দেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন ৬ দশমিক ৫ শতাংশ ভোটার। অন্যদিকে ১৩ শতাংশ ভোটার অন্যান্য দলকে ভোট দেবেন বলে জানিয়েছেন। আর ২ দশমিক ৪ শতাংশ ভোটার এখনো সিদ্ধান্তহীন রয়েছেন।

জরিপে প্রথমবার বা ২০০৮ সালের পর এবার প্রথম ভোট দিতে যাচ্ছেন এমন ভোটারদের প্রবণতাও উঠে এসেছে। এই ভোটারদের মধ্যে ৩৭ দশমিক ৪ শতাংশ জামায়াতকে ভোট দেওয়ার কথা জানিয়েছেন। বিএনপিকে ভোট দেবেন ২৭ শতাংশ এবং এনসিপিকে ভোট দেওয়ার কথা বলেছেন ১৭ শতাংশ ভোটার। এ ছাড়া ১৮ দশমিক ৬ শতাংশ এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেননি।

জাকারিয়া পলাশ বলেন, জরিপে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে—ভোটাররা এমন নেতৃত্ব প্রত্যাশা করছেন, যারা সাধারণ মানুষের কথা ভাববেন এবং দৃঢ় ও কার্যকর নেতৃত্ব দিতে সক্ষম হবেন। ব্যক্তিগত যোগ্যতা বা খ্যাতির চেয়ে জনদরদি ও মানুষের সঙ্গে সংযুক্ত প্রার্থীকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন ভোটাররা।

ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে দল ও প্রার্থীর গুরুত্ব নিয়েও জরিপে বিভাজিত মতামত উঠে এসেছে। ৩৩ দশমিক ২ শতাংশ ভোটার জানিয়েছেন, তারা দল ও প্রার্থী— দুটোকেই সমান গুরুত্ব দেবেন। ৩০ দশমিক ৪ শতাংশ শুধু দলকে গুরুত্ব দেবেন, আর ৩০ দশমিক ২ শতাংশ গুরুত্ব দেবেন কেবল প্রার্থীকে। বাকি ৬ দশমিক ১ শতাংশ ভোটার জানিয়েছেন, তারা এখনও সিদ্ধান্ত নিতে পারেননি।

সংবাদ সম্মেলনে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন যুক্তরাজ্যের রেডিং বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির ভিজিটিং প্রফেসর ও নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির প্রফেসরিয়াল ফেলো এম নিয়াজ আসাদুল্লাহ। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ নির্বাচনের বাইরে থাকায় তাদের ভোটব্যাংক কোন দিকে যাবে—এটাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। তিনি জরিপের একটি বড় ইতিবাচক দিক হিসেবে ভোটারদের উচ্চ ভোটদানের আগ্রহের কথা উল্লেখ করেন।

তবে এম নিয়াজ আসাদুল্লাহ সতর্ক করে বলেন, ভোটের দিনের পরিস্থিতি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, যে ৮ শতাংশ ভোটার এখনো সিদ্ধান্তহীন, নিরাপত্তা ও পরিবেশ অনুকূলে না থাকলে তাদের বড় একটি অংশ ভোটকেন্দ্রে না–ও যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে এই ৮ শতাংশই একসময় ৮০ শতাংশে রূপ নিতে পারে।

তিনি আরও বলেন, ভোটের দিন পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে নির্বাচন কমিশন ও সরকারের দায়িত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে নারী ও বয়স্ক ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। যাতে তারা কোনো ভয় বা উদ্বেগ ছাড়াই ভোটকেন্দ্রে যেতে পারেন।

সংবাদ সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন সিআরএফের সহসভাপতি ও শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সাহাবুল হক। তিনি বলেন, এবারের নির্বাচনে ভোট দেওয়ার আগ্রহ অতীতের যে কোনো সময়ের তুলনায় বেশি দেখা যাচ্ছে।

তবে মানুষের মধ্যে উদ্বেগও রয়েছে উল্লেখ করে অধ্যাপক সাহাবুল হক বলেন, ভোট সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হবে কি না, ব্যালট বাক্স দখল কিংবা সহিংসতা হবে কি না এসব প্রশ্ন এখনও ভোটারদের মনে কাজ করছে। এই উদ্বেগ শুধু সাধারণ ভোটার নয়; বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপির সমর্থকদের মধ্যেও রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, আগের তুলনায় এবারের নির্বাচনে ধর্মীয় বিষয়কে কম গুরুত্ব দিচ্ছেন ভোটাররা। বরং প্রার্থী বা দলের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ আছে কি না—এই বিষয়টিকেই এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।