logo

চাঁপাইনবাবগঞ্জে আওয়ামী লীগের ভোট নিয়ে কাড়াকাড়ি

চাঁপাইনবাবগঞ্জে আওয়ামী লীগের ভোট নিয়ে কাড়াকাড়ি

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আর মাত্র কয়েকদিন বাকি। এ নির্বাচনকে ঘিরে চাঁপাইনবাবগঞ্জের চায়ের দোকান থেকে শুরু করে হাটবাজার–সবখানেই চলছে ভোটের আলোচনা, প্রার্থী ও সম্ভাব্য ফলাফল নিয়ে নানা হিসাবনিকাশ।

যদিও এবারের নির্বাচনে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ভোটারদের ভূমিকা অনেকটাই ভাগ্য নির্ধারক হিসেবে দেখা হচ্ছে। আওয়ামী লীগের প্রার্থী না থাকলেও দলটির সমর্থকদের ভোট কার ঝুলিতে যাবে, তা নিয়ে দুই প্রধান দলের মধ্যেই চলছে জোর প্রচেষ্টা। ভোট টানতে দেওয়া হচ্ছে নানা প্রতিশ্রুতি, ধর্মপ্রাণ ভোটারদের জন্যও থাকছে আলাদা বার্তা।

এদিকে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার করলে থানা ঘেরাওয়ের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনে বিএনপির প্রার্থী হারুনুর রশীদ। গত ১০ জানুয়ারি রাতে এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগ এখন ভোট করছে না, আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রতীক নেই। এখন তারা কাকে ভোট দেবে এটা তাদের পছন্দের ব্যাপার। কিন্তু আমাকে ভোট দেবে এমন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার করলে আমি জনসাধারণকে নিয়ে থানা ঘেরাও করব।’

অন্যদিকে, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ (সদর) আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য লতিফুর রহমান সম্প্রতি ঘোষণা দিয়েছেন, আওয়ামী লীগ থেকে জামায়াতে যোগ দিলে তারা সব দায়দায়িত্ব নেবেন। তিনি বলেন, ‘আগামী দিনের বাংলাদেশে একটা পরিবর্তন হতে চলেছে। আমাদের দলে আপনারা আওয়ামী লীগ থেকে আসবেন। আপনাদের সব দায়দায়িত্ব আমরা নেব। জেলখানা, নবাবগঞ্জ থানা, যেকোনো দায়দায়িত্ব আমরা নেব।’

স্থানীয় রাজনীতিকদের মতে, এ দুই আসনে জামায়াত-বিএনপি প্রায় সমানে সমান অবস্থানে। যে পক্ষ আওয়ামী লীগের ভোট টানতে পারবে, শেষ পর্যন্ত জয় তার দিকেই যেতে পারে। তবে নানা কারণে চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ (ভোলাহাট, নাচোল ও গোমস্তাপুর) আসনে জামায়াতকে তুলনামূলক এগিয়ে রাখছেন অনেকে।

এ জেলার তিনটি আসনেই বিএনপি ও জামায়াত মনোনীত প্রার্থীদের ঘিরেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ (সদর) আসনের সুন্দরপুর ইউনিয়নের জয়ন্দীপুর মোন্নাপাড়া গ্রামের ইসরাফিল আলমের দাবি, জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী নুরুল ইসলাম বুলবুল এবার বিপুল ভোটে জয়ী হবেন। তার বক্তব্য শেষ না হতেই শফিকুল ইসলাম নামের এক তরুণ বলেন, কোনো সুযোগ নেই বিএনপির হারুনুর রশীদই এবার বিপুল ভোটে জয়লাভ করবেন। এভাবে দুপক্ষই নিজেদের প্রার্থীকে এগিয়ে রাখছেন।

নির্বাচন নিয়ে জনমত, প্রত্যাশা ও রাজনৈতিক বাস্তবতা জানতে তৃণমূল থেকে শহরতলি ঘুরে সাধারণ ভোটার, রাজনীতিক, বিশ্লেষক ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলে দেখা গেছে, চাঁপাইনবাবগঞ্জের তিনটি আসনেই এবার জামায়াত ও বিএনপির মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস স্পষ্ট। বিশেষ করে চাঁপাইনবাবগঞ্জ-১ (শিবগঞ্জ) ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ (সদর) আসনে কোনো পক্ষকেই এখনও স্পষ্টভাবে এগিয়ে রাখা যাচ্ছে না।

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা প্রশাসক ও জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা শাহাদাত হোসেন মাসুদ এশিয়া পোস্টকে বলেন, নির্বাচনি পরিবেশ ভালো রয়েছে। যৌথ বাহিনীসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিয়মিত টহল দিচ্ছে। আচরণবিধি মানতে ১১ জন ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে টিম কাজ করছে। এখন পর্যন্ত বড় ধরনের আচরণবিধি লঙ্ঘনের খবর পাওয়া যায়নি। অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন নিশ্চিত করতে সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে। পুলিশের পাশাপাশি সেনাবাহিনী ও আনসার সদস্যরাও দায়িত্ব পালন করবেন। জেলার ৫১৫টি ভোটকেন্দ্র সিসি ক্যামেরার আওতায় থাকবে, থাকবে বডি ক্যামেরাসহ আধুনিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা কমিটির সভাপতি আসলাম কবির বলেন, চাঁপাইনবাবগঞ্জে জামায়াত ও বিএনপি দুই দলই শক্তিশালী। এবার আওয়ামী লীগের প্রার্থী না থাকলেও দলটির প্রায় ৭০ শতাংশ সমর্থক ভোট দিতে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিভিন্ন পর্যালোচনায় দেখা গেছে, এসব ভোটার এককভাবে কোনো প্রার্থীকে নয়, বরং পরিস্থিতি অনুযায়ী ভোট দিতে পারেন। তাই সামগ্রিকভাবে তিনটি আসনেই হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের সম্ভাবনা রয়েছে। 

তিনি আরও বলেন, প্রশাসন এখন পর্যন্ত নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করছে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও মোটামুটি ভালো। তবে প্রার্থীদের কিছু বক্তব্যে উত্তেজনা দেখা যাচ্ছে, যা থেকে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ জজকোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সাইফুল ইসলাম রেজা এশিয়া পোস্টকে বলেন, গত ১৬ বছরে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে সাধারণ ভোটারদের মধ্যে তেমন উৎসাহ ছিল না। কারণ, অনেকেই মনে করতেন ফলাফল আগেই নির্ধারিত। তবে এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। সাধারণ মানুষ বিশ্বাস করছে, নির্বাচিত সরকারের মাধ্যমেই টেকসই উন্নয়ন সম্ভব। সে কারণেই ভোট নিয়ে আগের মতো উৎসাহ ফিরে এসেছে, যা একটি গণতান্ত্রিক দেশের জন্য ইতিবাচক। তার মতে, কোনো একক দল বা প্রার্থীকে খুব বেশি এগিয়ে রাখা যাচ্ছে না, তবে ফলাফলে আওয়ামী লীগের ভোট গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।

এ ছাড়া চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসন থেকে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের ফজলুর ইসলাম খান, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের হয়ে মনিরুল ইসলাম এবং গণঅধিকার পরিষদ থেকে শফিকুল ইসলাম প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।

জেলা বিএনপিতে কোন্দল প্রকাশ্যে

চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলও নির্বাচনি রাজনীতিতে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। ২০২৪ সালের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে জেলা বিএনপি তিন ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। একাংশের নেতা বর্তমান দলীয় প্রার্থী হারুনুর রশীদের পক্ষে শুরুতে মাঠে সক্রিয় ছিলেন না। জেলা আহ্বায়ক কমিটিও দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে আলাদাভাবে মাঠে ছিল। শেষ পর্যন্ত হারুনুর রশীদকে মনোনয়ন দেওয়ায় এ বিভক্তি আরও প্রকাশ্যে আসে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে হারুনুর রশীদ এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘জেলা আহ্বায়ক কমিটি আমাদের মতামত ছাড়াই গঠন করা হয়েছে। জেলা বিএনপি বলে যে কমিটি রয়েছে, এটা ঢাকা থেকে করে দেওয়া, এদের সঙ্গে আমাদের কোনো সম্পর্ক নেই। জেলা বিএনপির কমিটিতে যারা রয়েছেন, তারা সবাই জামায়াত ও আওয়ামী লীগের।’ তবে তিনি আরও দাবি করেন, বিএনপির সব লোক তার সঙ্গে রয়েছেন। বিএনপির কোনো কর্মী বাইরে নেই, সবাই একসঙ্গে কাজ করছেন। 

বিএনপির এ নেতা আরও বলেন, ‘আগে জামায়াত আমার সঙ্গে পাঁচবার প্রতিযোগিতা করে বিপুল ভোটে পরাজিত হয়েছে। এবারও জামায়াত বিপুল ভোটে পরাজিত হবে। আমরা গণসংযোগ কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছি।’

চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক গোলাম জাকারিয়া এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘আমরা তারেক রহমান গঠিত কমিটি। চেয়ারম্যানের নির্দেশনার পরও তিনি আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেননি। তবে আমরা প্রার্থী দেখে নয় বরং তারেক রহমানের নির্দেশনায় ধানের শীষের পক্ষে কাজ করছি।’

আশাবাদী জামায়াত

চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর-৩ আসনের জামায়াত মনোনীত প্রার্থী ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আমির নুরুল ইসলাম বুলবুল বলেন, বিএনপির ধারণা রাজার ছেলে রাজা হবে। কিন্তু চাঁপাইনবাবগঞ্জের জনগণ চাঁদাবাজি, বালুমহল দখল, সন্ত্রাস, মাদকসহ অন্যান্য অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড থেকে পরিত্রাণ চায়। তিনি নির্বাচিত হলে এসব ক্ষেত্রে আমূল পরিবর্তন আনতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। সাধারণ ভোটাররাও তার এই প্রতিশ্রুতিতে আস্থা রাখছেন। তিনি নিজেই বিপুল ভোট পেয়ে জয়ী হবেন।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ-১ (শিবগঞ্জ) আসন

এ আসনে মনোনয়নপ্রত্যাশী তিন নেতার মান ভাঙিয়ে একক প্রার্থী হিসেবে বিএনপির প্রার্থী অধ্যাপক শাহজাহান মিঞা মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন। দলের কোনো বিদ্রোহী প্রার্থী না থাকায় এ নেতা স্বস্তিতে রয়েছেন। তবে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীও হাল ছাড়ছেন না। এ আসনে দলটির প্রার্থী হয়েছেন রাজশাহী মহানগর জামায়াতের আমির ও শিবগঞ্জ উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ড. কেরামত আলী। এ আসনে বিএনপির শক্ত প্রতিপক্ষ হলেও গত সংসদ নির্বাচনের পরিসংখ্যানে জামায়াতের জয়ের নজির নেই। কিন্তু জুলাই বিপ্লবের পর পাল্টে গেছে সব হিসাবনিকাশ।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ আসন

নাচোল ও গোমস্তাপুর এবং ভোলাহাট উপজেলা নিয়ে গঠিত চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ আসন। এ আসনে বিএনপি থেকে তিন মনোনয়নপ্রত্যাশী মাঠে সরব এবং মনোনয়ন উত্তোলন করলেও শেষ পর্যন্ত জমা দেননি। তাদের অনুসারীদের বেশির ভাগই উপজেলা কমিটির শীর্ষ পদে। বিএনপির মনোনয়ন পাওয়া সাবেক সংসদ সদস্য আমিনুল ইসলাম ওই সব নেতার মান না ভাঙানোয় অনেকটা কোণঠাসা।

অন্যদিকে, একসময়ের বিএনপি নেতা মু. খুরশেদ আলম বাচ্চু অভিমানে আওয়ামী লীগে এবং পরে জাতীয় পার্টিতে যোগ দিয়ে মনোনয়ন বাগিয়ে এখন ভোটের মাঠে। এর আগের নির্বাচনগুলোতে তিনি সর্বোচ্চ ৪৫ হাজার ভোট পেয়ে পরাজিত হয়েছেন। এ নির্বাচনে আঞ্চলিকতা, আওয়ামী লীগ ও বিএনপির বঞ্চিত নেতাদের ভোট বাগিয়ে নিতে পারেন। ফলে বাড়তি সুবিধা পেয়ে যেতে পারেন জামায়াতের প্রার্থী ড. মিজানুর রহমান।