logo

ভোটের আগে বড় প্রতিশ্রুতি পূরণে কতটা সক্ষম দলগুলো?

ভোটের আগে বড় প্রতিশ্রুতি পূরণে কতটা সক্ষম দলগুলো?

বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন চলছে। দক্ষিণ এশিয়ার এ দেশটির ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক অঙ্গনজুড়ে এখন প্রতিশ্রুতির ঝড়। নগদ সহায়তা, সুদমুক্ত ঋণ, কোটি কোটি চাকরি, বিদেশে পড়াশোনার স্কলারশিপ—বড় দলগুলো বিশেষ করে তরুণ ভোটারদের মন জয়ের লড়াইয়ে একের পর এক আকর্ষণীয় ঘোষণা দিচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, এসব প্রতিশ্রুতি বাস্তবে কতটা সম্ভব, আর দেশের অর্থনীতি কি এই ভার বইতে পারবে?

কয়েক বছর ধরে প্রতিযোগিতামূলক সরকারি চাকরির প্রস্তুতিতে ডুবে থাকা বহু তরুণের কাছে স্থায়ী চাকরিই এখনো নিরাপদ ভবিষ্যতের সবচেয়ে নিশ্চিত ভরসা। নির্বাচনি প্রচারণায় বেকারদের জন্য নগদ সহায়তা বা সুদমুক্ত ঋণের প্রতিশ্রুতি শোনা গেলেও তাদের বড় অংশ মনে করেন, সাময়িক সহায়তার চেয়ে বেশি জরুরি একটি গতিশীল কর্মসংস্থানের বাজার এবং মেধাভিত্তিক নিয়োগব্যবস্থা।

২০২৪ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলন, যা পরে দেশজুড়ে বিস্তৃত গণঅসন্তোষে রূপ নেয়, সেই প্রজন্মের বড় একটি অংশকে রাজনীতির কেন্দ্রে এনে দাঁড় করিয়েছে। ফলে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন তাদের কাছে কেবল সরকার বদলের প্রশ্ন নয়; বরং আগামী দিনের অর্থনৈতিক দিকনির্দেশনা ও সুযোগের বাস্তব পরীক্ষাও বটে।

অর্থনীতির চাপ ও প্রতিশ্রুতির বাস্তবতা

নির্বাচনের এই মুহূর্তে বাংলাদেশের অর্থনীতি নানা চাপে রয়েছে। মহামারির আগে যেখানে প্রবৃদ্ধি ৮ শতাংশের ওপরে ছিল, সেখানে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তা নেমে এসেছে প্রায় ৪-৫ শতাংশে। খাদ্যসহ সার্বিক মূল্যস্ফীতি দীর্ঘদিন ধরেই উচ্চ এক অঙ্কে অবস্থান করছে, ফলে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। বেসরকারি বিনিয়োগ জিডিপির প্রায় ২২-২৩ শতাংশে আটকে আছে, আর কর-জিডিপি অনুপাত ৭ শতাংশের নিচে, যা দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায়ও কম।

অর্থনীতিবিদদের মতে, এই বাস্তবতায় বিপুল সামাজিক সুরক্ষা, ব্যাপক কর্মসংস্থান বা কর কমানোর প্রতিশ্রুতি একসঙ্গে বাস্তবায়ন করা যে কোনো সরকারের জন্য কঠিন হবে।

প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিশ্রুতির লড়াই

আওয়ামী লীগ ব্যালটের বাইরে থাকায় মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা এখন বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট এবং জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোটের মধ্যে। দুপক্ষই আনুষ্ঠানিক ইশতেহার প্রকাশ না করলেও হাইপ্রোফাইল সভা-সমাবেশে দেওয়া ঘোষণাগুলোই নির্বাচনি বার্তার কেন্দ্রে।

বিএনপির ‘ফ্যামিলি কার্ড’ তাদের সবচেয়ে আলোচিত প্রস্তাব। প্রতিটি পরিবারের একজন নারীর নামে কার্ড দিয়ে মাসে ২,০০০-২,৫০০ টাকা নগদ বা সমমূল্যের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য দেওয়ার পরিকল্পনা। শুরুতে ৪০ লাখ পরিবারকে অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলা হলেও দেশব্যাপী বাস্তবায়ন করলে এর ব্যয় দাঁড়াতে পারে বছরে প্রায় ১.২ ট্রিলিয়ন টাকা, যা বর্তমানে সামাজিক সুরক্ষা খাতে সরকারের মোট ব্যয়ের প্রায় সমান।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ব্যয়ের পাশাপাশি বড় চ্যালেঞ্জ হবে সঠিক উপকারভোগী নির্ধারণ ও দুর্নীতি রোধ। বিএনপি নেতারা এর জবাব হিসেবে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমানো ও সেবা ডিজিটাল করার কথা বলছেন।

অন্যদিকে জামায়াতের ‘স্মার্ট সোশ্যাল সিকিউরিটি কার্ড’ ধারণা—জাতীয় পরিচয়পত্র, স্বাস্থ্যসেবা, কর ও সামাজিক সুরক্ষা একীভূত করে একটি সমন্বিত ব্যবস্থা তৈরি করা। তাদের দাবি, এতে ফাঁকফোকর কমবে এবং প্রকৃত সুবিধাভোগীরা সহজে সেবা পাবেন।

যুবকেন্দ্রিক কর্মসংস্থান প্রতিশ্রুতি

বাংলাদেশের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ভোটার তরুণ। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, স্নাতক শিক্ষিতদের মধ্যে বেকারত্ব ১৩.৫ শতাংশ, যা প্রায় ৮ লাখ ৮৫ হাজার মানুষ। সামগ্রিক বেকারত্ব ৪.৬৩ শতাংশ, সংখ্যায় প্রায় ২৭ লাখ।

বিএনপি ১৮ মাসে ১ কোটি চাকরি সৃষ্টির ঘোষণা দিয়েছে। ডিজিটাল অর্থনীতিতে ৮ লাখ আইটি চাকরি, আন্তর্জাতিক পেমেন্ট গেটওয়ে চালু করে ফ্রিল্যান্স আয়ের পথ সহজ করার কথাও বলছে দলটি।

জামায়াত পাঁচ বছরে ১ কোটি তরুণকে প্রশিক্ষণ, ৫০ লাখ চাকরির সংযোগ, ৫ লাখ উদ্যোক্তা তৈরির লক্ষ্য ঘোষণা করেছে। পাশাপাশি বেকার স্নাতকদের জন্য মাসে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত সুদমুক্ত ঋণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, এই মাত্রার কর্মসংস্থান বাস্তবায়নে ধারাবাহিক ৮-১০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ও বড় বিনিয়োগ প্রয়োজন, যা বর্তমান প্রেক্ষাপটে বড় চ্যালেঞ্জ।

শিক্ষা, কর ও সামাজিক খাত

শিক্ষা খাতেও প্রতিশ্রুতির প্রতিযোগিতা স্পষ্ট। বিএনপি শিক্ষকদের ট্যাব দেওয়া, কারিগরি শিক্ষার বিস্তার, মধ্যাহ্নভোজ কর্মসূচি সম্প্রসারণ এবং তৃতীয় ভাষা শিক্ষার প্রস্তাব দিয়েছে। জামায়াত মেধাভিত্তিক সুদমুক্ত শিক্ষা ঋণ ও বাইরের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার জন্য সীমিতসংখ্যক পূর্ণ স্কলারশিপের ঘোষণা দিয়েছে।

কর ব্যবস্থায় জামায়াত করপোরেট ট্যাক্স ১৯ শতাংশ ও ভ্যাট ১০ শতাংশে নামানোর প্রস্তাব দিয়েছে। তাদের হিসাব অনুযায়ী, কর ফাঁকি রোধ ও প্রশাসনিক দক্ষতা বাড়িয়ে ১-২ ট্রিলিয়ন টাকা অতিরিক্ত রাজস্ব আদায় সম্ভব। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কর সংস্কার ছাড়া টেকসই রাজস্ব বাড়ানো কঠিন।

স্বাস্থ্য খাতে বিএনপি ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ ও বিনামূল্যে প্রাথমিক চিকিৎসা ও ওষুধ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। জামায়াত ৬০ বছরের ঊর্ধ্বে নাগরিক ও পাঁচ বছরের নিচের শিশুদের জন্য বিনামূল্যে চিকিৎসা এবং প্রতিটি জেলায় বিশেষায়িত হাসপাতাল নির্মাণের কথা বলছে।

কৃষি ও শিল্পে ভারসাম্যের প্রশ্ন

কৃষিতে বিএনপির ‘ফার্মার কার্ড’—ভর্তুকি, সহজ ঋণ, বীমা ও বাজার তথ্যের প্রতিশ্রুতি—আর জামায়াতের সুদমুক্ত কৃষিঋণ পরিকল্পনা ইতিবাচক হলেও অর্থনীতিবিদরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, এই খাত এরই মধ্যে বড় ভর্তুকিনির্ভর। শিল্প খাতে জামায়াত তিন বছরের জন্য গ্যাস-বিদ্যুৎ-পানির মূল্য স্থির রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, যা ব্যবসায়ীদের জন্য স্বস্তিদায়ক হলেও সরকারের রাজস্ব চাপে প্রভাব ফেলতে পারে।

ভোটারের প্রত্যাশা: প্রতিশ্রুতির বাইরে

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সাধারণ ভোটার সরল বার্তা পছন্দ করলেও তারা অন্ধ নন। সুবিধা বণ্টন দলীয় আনুগত্যের ভিত্তিতে হবে নাকি সবার জন্য সমান—এ প্রশ্নটি তাদের কাছে বড় হয়ে উঠছে।

নির্বাচনের প্রাক্কালে বাংলাদেশের রাজনীতি তাই এক দ্বৈত বাস্তবতার মুখোমুখি—একদিকে বিপুল সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রত্যাশা, অন্যদিকে সীমিত সম্পদ ও কাঠামোগত দুর্বলতা। নতুন সরকার যে-ই গঠন করুক, তাদের জন্য আসল পরীক্ষা হবে প্রতিশ্রুতির ভাষণ নয়, বাস্তবায়নের সক্ষমতা।