logo

ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং কী

ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং কী

আর মাত্র চার দিন পরই অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এ উপলক্ষে শেষ মুহূর্তের প্রচারে ব্যস্ত প্রার্থীরা। তবে নির্বাচনি প্রচারে রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাদের মুখে প্রায় প্রতিদিনই ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের’ কথা শোনা যায়। 

বিএনপি, জামায়াত, এনসিপিসহ প্রায় সব দলের সিনিয়র নেতারা একে অপরকে ইঙ্গিত করে ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের কথা বলছেন। শুধু তাই নয়, সরকারি চাকরির পরীক্ষায় ‘বাংলাদেশের রাজনীতিতে ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং বলতে কী বুঝায়- এমন প্রশ্নও দেখা গেছে।

তবে, নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেছেন, আমরা জাতিকে স্বচ্ছ ও সুষ্ঠু নির্বাচন দিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এবার কোনো ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং হবে না।

ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং কী

২০১২ সালের সেপ্টেম্বরে ‘ইলেকটোরাল ইঞ্জিনিয়ারিং: ভোটিং রুলস অ্যান্ড পলিটিক্যাল বিহেভিয়ার’ নামে হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির পলিটিক্যাল সায়েন্সের অধ্যাপক পিপ্পা নোরিসের একটি বই প্রকাশিত হয়। ব্রিটিশ আমেরিকান এই পলিটিক্যাল সায়েন্টিস্ট তার বইয়ে ইলেকটোরাল ইঞ্জিনিয়ারিং কীভাবে একটি নির্বাচনে ধাপে ধাপে এর সকল স্টেকহোল্ডারদের প্রভাবিত করে সেটি লিখেছেন।

বইটিতে ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং বলতে পিপ্পা নোরিস বুঝিয়েছেন, আনুষ্ঠানিক সব নির্বাচনি নিয়মের পরিবর্তনকেই ইলেকটোরাল ইঞ্জিনিয়ারিং বলে। রাজনৈতিক দল, রাজনীতিবিদ এবং জনগণের কৌশলগত আচরণ পরিবর্তন করে বড় ধরনের কনসিকোয়েন্স বা পরিণতি তৈরির ক্ষমতা রাখে এ পদ্ধতি। অর্থাৎ এই পদ্ধতির মাধ্যমে নির্বাচনি প্রক্রিয়াকে এমনভাবে প্রভাবিত করা হয় যাতে বিশেষ একটি পক্ষের জন্য পূর্বনির্ধারিত ফলাফল নিশ্চিত করা হয়।

কোনো কোনো দেশে ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মাধ্যমে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আনার জন্য ব্যবহৃত হলেও বেশিরভাগ সময়ই তা গণতন্ত্রকে প্রশ্নের মুখে ফেলে। দেশটিতে বেশিরভাগ সময়ই ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং শব্দটি নেতিবাচক অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। 

রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদের মতে, বাংলাদেশে নির্বাচনকে ‘ম্যানিপুলেট’ করার জন্যেই মূলত এই প্রক্রিয়া ব্যবহারের প্রচলন রয়েছে। ভোট গণনায় কারচুপি, ভোটার তালিকায় ভুয়া ভোটার থাকা, প্রতিপক্ষের প্রার্থীর সমর্থকদের ভোটদানে বাধা বা জোর করে ভোট দেওয়া, ব্যালট বাক্স চুরি, পোলিং এজেন্টদের বাধা এ রকম নানা বিষয় এই পদ্ধতিতে যুক্ত।

২০০০ সালের পরে বাংলাদেশের নির্বাচনে ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং শব্দটি রাজনীতিবিদদের মুখে বেশি শোনা যায়। যদিও নানা নামে বা ফরম্যাটে এই শব্দ এর আগেও ব্যবহার হয়েছে। 

১৯৭৩ সালের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচন ব্যাপক অনিয়ম-কারচুপির অভিযোগ রয়েছে। এমনকি একজন প্রার্থীকে জেতাতে হেলিকপ্টারে করে ব্যালট পেপার ঢাকায় নিয়ে আসার মতো ঘটনাও ঘটেছিল। ১৯৮৬ সালে নির্বাচনও বেশ বিতর্কিত ছিল। নির্বাচনটি ‘মিডিয়া ক্যু’ এর নির্বাচন বলে সমালোচিত হয়। মূলত মিডিয়াতে দুদিন নির্বাচনের খবর প্রচার বন্ধ থাকায় এ নাম পরিচিতি পায়। 

এ ছাড়া ১৯৯১ সালের নির্বাচনকে ‘সূক্ষ্ম কারচুপির নির্বাচন’, ১৯৯৬ এর নির্বাচনকে ‘পুকুর নয় সাগর চুরি’র সঙ্গে তুলনা করা হয়। তখনও সরাসরি ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং শব্দটি মানুষের মুখে শোনা যায়নি।

২০০১ সালের নির্বাচনের ফলাফলের পরই মূলত বাংলাদেশের নির্বাচনি ইতিহাসে ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং শব্দের ব্যবহার শুরু হয়। নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াতের চারদলীয় জোটের নেতৃত্বে সরকার গঠন করে। ওই সময়ই প্রথম আওয়ামী লীগ সরাসরি নির্বাচনে ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং হয়েছে বলে অভিযোগ তুলে।

২০০৮ সালের নির্বাচনকে গ্রহণযোগ্য মনে করা হলেও এই নির্বাচনেও কারচুপির অভিযোগ তোলা হয়। এই নির্বাচনের পরে ১৫ বছর আওয়ামী লীগের সরকার দেশের ক্ষমতায় ছিল। তাদের অধীনে পরবর্তীতে তিনটি নির্বাচন ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দেয়। 

২০১৪ সালের নির্বাচনকে ‘তামাসার নির্বাচন’, ২০১৮ সালের নির্বাচনকে ‘রাতের ভোট’ এবং ২০২৪ নির্বাচনকে ‘আমি আর ডামি’ হিসেবে বেশি পরিচিত। তথ্যসূত্র: বিবিসি বাংলা