logo
Advertisement

শরিকানা সম্পত্তি কেনার আগে জেনে নিন ভুল জমি কিনছেন না তো

এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
শরিকানা সম্পত্তি কেনার আগে জেনে নিন ভুল জমি কিনছেন না তো
শরিকানা সম্পত্তির দলিল যাচাইয়ে ব্যস্ত চার ব্যক্তি। ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

জীবনের কষ্টে অর্জিত সঞ্চয় কিংবা প্রবাস ফেরত কষ্টার্জিত অর্থ দিয়ে এক টুকরো জমি কেনা অনেকেরই জীবনের বড় একটি স্বপ্ন। তবে জমি কেনার ক্ষেত্রে সঠিক তথ্য না জেনে তাড়াহুড়ো করলে প্রতারক চক্র বা দালালদের খপ্পরে পড়ে সর্বস্ব হারানোর ঝুঁকি থাকে। বিশেষ করে যৌথ বা শরিকানা সম্পত্তি বিক্রয়ের ক্ষেত্রে সঠিক আইনি নিয়ম না মানলে ক্রেতাকে দীর্ঘদিন মামলা-মোকদ্দমায় জড়িয়ে পোহাতে হয় চরম দুর্ভোগ।

Advertisement

এসব সমস্যার সমাধান নিয়ে ‘জমি-জমা নিয়ে আপনার যত আইনি সমস্যা ও তার আইনি সমাধান’ শীর্ষক একটি বই লিখেছেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ড. পি. এম. সিরাজুল ইসলাম (সিরাজ প্রামাণিক)। বইটির দ্বিতীয় অধ্যায়ের ৩৪ ও ৩৫ নম্বর পৃষ্ঠায় শরিকানা সম্পত্তি কেনার আগে করণীয় নিয়ে আলোচনা করেছেন তিনি।

শরিকানা সম্পত্তি কেনার আগে জরুরি কিছু আইনি পদক্ষেপ যাচাই করা আবশ্যক।

সেগুলো হলো—

‘আইনি সমস্যা ও তার আইনি সমাধান’ বইয়ের প্রচ্ছদ। ছবি: এশিয়া পোস্ট
‘আইনি সমস্যা ও তার আইনি সমাধান’ বইয়ের প্রচ্ছদ। ছবি: এশিয়া পোস্ট

ওয়ারিশান সনদপত্র ও নামজারি: এজমালি বা যৌথ সম্পত্তি কেনার পূর্বে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা বা সিটি কর্পোরেশন থেকে ইস্যুকৃত ওয়ারিশান সনদপত্র যাচাই করতে হবে। বিক্রেতার নিজস্ব নামে নামজারি বা মিউটেশন হয়েছে কিনা তা দেখতে হবে। বিক্রেতার নামে নামজারি না থাকলে, তার পূর্বপুরুষের নামে হাল খতিয়ান আছে কিনা তা যাচাই করে ফারায়েজ অনুযায়ী বিক্রেতার নিজস্ব বিক্রয়যোগ্য অংশ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

বণ্টননামা দলিল: কোনো যৌথ সম্পত্তির লিখিত বণ্টননামা থাকলে তা রেজিস্ট্রিকৃত হতে হবে। বিক্রেতা সেই বাটোয়ারা দলিলে যতটুকু সম্পত্তি পেয়েছেন, শুধু ততটুকু অংশই তিনি বিক্রি করতে পারবেন।

অন্যান্য শরীকদের সাক্ষী রাখা ও বিজ্ঞপ্তি: বায়নানামা বা সাফকবলা দলিলে অন্যান্য ওয়ারিশ বা সহ-শরীকদের সাক্ষী ও শনাক্তকারী হিসেবে রাখা বুদ্ধিমানের কাজ। এর ফলে অন্য কোনো শরিক ভবিষ্যতে আইনি সুযোগ নিতে পারবে না। এছাড়া জমি চুক্তির পর সেখানে নোটিশ টাঙানো এবং পত্রিকায় আইনি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা যেতে পারে।

যৌথ সুবিধা ও প্রাক-ক্রয় (শুফা) অধিকার: জমিতে যাওয়া-আসার পথ, আলো-বাতাস বা পানির মতো এজমেন্ট সুবিধাগুলো ঠিক আছে কিনা তা দেখে নিতে হবে। পাশাপাশি প্রিয়েমশান বা অগ্রক্রয় (শুফা) অধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে অন্য কোনো শরিক মামলা করতে পারে কিনা, সে বিষয়ে আগে থেকেই নিশ্চিত হওয়া জরুরি।

যে কোনো জমি কেনার ক্ষেত্রে কিছু সাধারণ সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি। সতর্কতাগুলো হলো— বিক্রেতার নামে সর্বশেষ জরিপের (এসএ বা আরএস) খতিয়ানের আসল বা সত্যায়িত কপি জেলা রেকর্ড রুম থেকে নিশ্চিত করতে হবে। রেজিস্ট্রি করার আগে নকশা ও সরেজমিনে জমির দাগ নম্বর এবং প্রস্তাবিত জমির সঠিক পজিশন/দখল শনাক্ত করে নেওয়া আবশ্যক। জমির সর্বশেষ হালনাগাদ খাজনা পরিশোধের দাখিলা চেক করতে হবে। সরকারি স্ট্যাম্প ফি ফাঁকি দেওয়ার উদ্দেশ্যে দলিলের মূল্য কম দেখালে স্ট্যাম্প আইনের ৬৪ ধারা অনুযায়ী ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়েরই সাজা হতে পারে।

বইটি থেকে লেখার অংশ বিশেষ, পৃষ্ঠা-৩৪। ছবি: এশিয়া পোস্ট
বইটি থেকে লেখার অংশ বিশেষ, পৃষ্ঠা-৩৪। ছবি: এশিয়া পোস্ট

এছাড়াও জমিটি অর্পিত সম্পত্তি, সরকার কর্তৃক অধিগ্রহণকৃত নাকি প্রস্তাবাধীন, কিংবা কোনো ব্যাংক বা প্রতিষ্ঠানে মর্গেজ দেওয়া আছে কিনা তা সংশ্লিষ্ট সরকারি অফিস থেকে যাচাই করে নিন। জমিটি শিকস্তি (নদীভাঙন) বা অনাদায়ে নিলাম হয়েছে কিনা তাও নিশ্চিত হওয়া দরকার। একই জমি বারবার বিক্রি, জাল দলিল বা আইনি জটিলতা থেকে বাঁচতে একটু সচেতনতা ও সঠিক কাগজপত্র যাচাই-বাছাই আপনার কষ্টার্জিত সঞ্চয়কে নিরাপদে রাখতে পারে।

পাশাপাশি ক্রেতাকে দেখতে হবে— যৌথ এজমেন্ট সুবিধা আছে কি-না। অর্থাৎ পথের অধিকার, চলার অধিকার, আলো বাতাস ও পানির অধিকার। সেই সঙ্গে দেখতে হবে, ওই জমি ক্রয়ের পর প্রিয়েমশান বা অগ্রক্রয় বা শুফা অধিকার প্রয়োগের মামলা হওয়ার সম্ভাবনা আছে কি-না। এরূপ এজমালি সম্পত্তি ক্রয়ের ক্ষেত্রে বায়নানামা দলিল কিংবা সাফকবলা দলিলে যতদূর সম্ভব অন্যান্য ওয়ারিশানগণকে সাক্ষী ও শনাক্তকারী হিসেবে রাখা উচিত। তাহলে অন্যান্য শরিক বা সহ-শরিকরা এ সুযোগ আর নিতে পারবে না।

লেখক এ জাতীয় এজমালি সম্পত্তির বিক্রয় চুক্তি হওয়ার পর সম্পত্তির উপর নোটিশ টাঙানো এবং পত্রিকায় আইনগত বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করার পরামর্শ দিয়েছেন। জমি ক্রয়ের পূর্বে লক্ষণীয় যে ১৫টি বিষয়ের কথা লেখক বলেছেন তা পর্যায়ক্রমে দেওয়া হলো।

১. জমি বিক্রেতার প্রকৃত মালিকানা সত্ত্ব আছে কিনা।

২. মালিকানার প্রমাণ হিসেবে বিক্রেতার নামে সর্বশেষ জরিপের এসএ রেকর্ড অথবা আরএস রেকর্ড আছে কিনা। রেকর্ড/খতিয়ানের মূল কপি বা সত্যায়িত কপি দেখে নিশ্চিত হতে হবে।

৩. বিক্রেতা যদি ক্রয় সূত্রে জমির মালিক হয়ে থাকেন তাহলে তার নামে মিউটেশন বা নামজারি করা হয়েছে কিনা।

৪. বিক্রি প্রস্তাবিত জমির দখল যাচাই করা।

৫. জমির হালনাগাদ খাজনা পরিশোধ আছে কি-না জানতে খাজনার দাখিলা যাচাই করে নিন।

বইটি থেকে লেখার অংশ বিশেষ, পৃষ্ঠা-৩৫। ছবি: এশিয়া পোস্ট
বইটি থেকে লেখার অংশ বিশেষ, পৃষ্ঠা-৩৫। ছবি: এশিয়া পোস্ট

৬. জমির দাগ নম্বর এবং খতিয়ান নম্বর জেলা রেকর্ড রুম থেকে তুলে জমির মালিকানা সূত্র নিশ্চিত হতে পারেন।

৭. জমি রেজিস্ট্রি করার পূর্বে রেকর্ড, নকশায় ও সরেজমিনে জমির দাগ নম্বর শনাক্ত করে নিন।

৮. কৃষি জমি ক্রয়ের ক্ষেত্রে রেকর্ডিও মালিকানায় অংশীদারগণ অগ্রাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন। সেকারণ অংশীদারদের সম্মতি সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে নিন।

৯. স্ট্যাম্প ফিশ ফাঁকি দেওয়ার উদ্দেশ্যে জমির বাজার মূল্য অপেক্ষা কম মূল্য নির্ধারণ করে দলিল রেজিস্ট্রি করা থেকে বিরত থাকুন। এতে স্ট্যাম্প আইনের ৬৪ ধারা মোতাবেক ক্রেতা/বিক্রেতার উভয়েরই শাস্তি হতে পারে।

১০. বিক্রির জন্য প্রস্তাবিত জমি সরকার কর্তৃক ইতোপূর্বে অধিগ্রহণ হয়েছে কিনা অথবা অধিগ্রহণের প্রস্তাবাধীন কী না তা সংশ্লিষ্ট অফিস হতে যাচাই করে দেখে নিন।

১১. একই জমি একাধিকবার বিক্রির মাধ্যমে হস্তান্তরিত হয়েছে কী না।

১২. জমির খাজনা/ ভূমি কর অনাদায়ে নিলাম হয়েছে কী না।

১৩. জমি শিকস্তি হওয়ার কারণে মালিকানা বিলুপ্ত হয়েছে কী না।

১৪. সংশ্লিষ্ট জমি সরকার বা কোনো সংস্থাকে ঋণ গ্রহণের মর্গেজ দেওয়া আছে কী না।

১৫. বিক্রি প্রস্তাবিত জমিতে কোনো বিরোধ বা মামলা মোকদ্দমা আছে কী না- এগুলো ভাল করে যাচাই করে নিন। নতুবা সারা জীবনের অর্জন দিয়ে ক্রয় করা সম্পত্তি নিয়ে বাকী জীবনটা ঝামেলার মধ্যে কাটাতে হতে পারে।

লেখকের পরিচয়

ড. পি. এম. সিরাজুল ইসলাম পাঠকসমাজে ‘সিরাজ প্রামাণিক’ নামে পরিচিত। কলেজজীবন থেকেই তিনি সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত হন। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর তাঁর কাজের পরিধি আরও বিস্তৃত হয়। তিনি দৈনিক যুগান্তর, দৈনিক সংবাদ, দৈনিক আমার দেশসহ বিভিন্ন জাতীয় ও স্থানীয় দৈনিক পত্রিকায় লিখেছেন।

বইটির ফ্লাপে দেওয়া লেখক পরিচিতি। ছবি: এশিয়া পোস্ট
বইটির ফ্লাপে দেওয়া লেখক পরিচিতি। ছবি: এশিয়া পোস্ট

সংবাদপত্রের সুবাদে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে বিভিন্ন সেমিনারে যোগ দিতে তিনি সার্কভুক্ত বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেছেন। গবেষণার কাজে কিছু সময় কাটিয়েছেন থাইল্যান্ডের চিয়াং মাই বিশ্ববিদ্যালয়ে। রাজধানী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পর ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে অধ্যাপক ড. মো. শাহজাহান মণ্ডলের তত্ত্বাবধানে উচ্চতর গবেষণা করেন।

তার গবেষণার বিষয় ছিল, ‘Right to life and personal liberty in Bangladesh with special reference to extra-judicial killing.’ লেখকের আইনবিষয়ক বিভিন্ন নিবন্ধ দেশের জাতীয় দৈনিকগুলোতে প্রকাশিত হয়েছে। তিনি আইনবিষয়ক একাধিক গ্রন্থ রচনা করেছেন। তাঁর বেশ কিছু গ্রন্থ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে রেফারেন্স গ্রন্থ হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে বলে বইয়ের লেখক পরিচিতিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

তার প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে—‘পকেট আইন’, ‘আইনে আপনার যত অধিকার’, ‘২২টি আইনের সহজ পাঠ’, ‘জমি ক্রয়-বিক্রয় আইন’, ‘জমি জমার আইন-কানুন ও আলোচনা’, ‘রেজিস্ট্রেশন অ্যাক্ট অ্যান্ড ডিড রাইটিং’, ‘উইথ মডেল’, ‘রিয়াদ আইন’, ‘বিয়ে-তালাক-দেনমোহর-ভরণপোষণ ও নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন’, ‘সংবাদপত্র বিষয়ে আইন’, ‘কম্পিউটার অপরাধ আইন’, ‘ফৌজদারি মামলা পিটিশন পদ্ধতি’, ‘পারিবারিক আইন’, ‘নাগরিক অধিকার আইন’, ‘লিগ্যাল নোটিশ অ্যান্ড অ্যাফিডেভিট লেখার পদ্ধতি’, ‘প্রাত্যহিক জীবনে আইন’, ‘উত্তরাধিকার আইন’ ও ‘ওয়াক্‌ফ’ প্রভৃতি।