একদিনের রিমান্ডে ঘটনার সত্যতা স্বীকার করেছে আখতারুজ্জামান: পুলিশ

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে লাগেজ ও ট্রলি সংকটকে কেন্দ্র করে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি, সরকারি কাজে বাধা দেওয়া এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও নিরাপত্তা সদস্যকে লাঞ্ছিত করার অভিযোগে দায়ের করা মামলায় জামায়াতে ইসলামীর নেতা মেজর (অব.) আখতারুজ্জামানকে এক দিনের রিমান্ড শেষে কারাগারে আটক রাখার আবেদন করেছেন পুলিশ। অপরদিকে তার পক্ষের আইনজীবীরা জামিন চেয়ে আবেদন করেছেন।
রোববার (৪ অক্টোবর) দুপুরে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. জামসেদ আলমের আদালতে উভয়পক্ষের আবেদনের ওপর শুনানি হবে বলে জানিয়েছেন আসামিপক্ষের আইনজীবী আব্দুর রাজ্জাক।
আটক রাখার আবেদনে তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, ‘একদিনের রিমান্ডে আখতারুজ্জামান ঘটনার সত্যতা স্বীকার করেছেন। মামলায় জোর তদন্ত চলছে। যাচাই-বাছাই চলছে। এমতাবস্থায় তাকে কারাগারে আটক রাখা প্রয়োজন।’
এদিকে এক দিনের রিমান্ড শেষে তাকে সিএমএম কোর্টের হাজতখানায় এনে রাখা হয়। তবে পুনরায় রিমান্ড আবেদন না থাকায় তাকে মূল এজলাসে তোলা হবেনা বলে আদালত সূত্রে জানা গেছে।
গতকাল শনিবার (৩ অক্টোবর) দুপুরে তদন্ত কর্মকর্তা বিমানবন্দর থানার উপপরিদর্শক মাজেদুল ইসলাম পাঁচ দিনের রিমান্ড আবেদন করলে শুনানি শেষে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আলবিরুনী মীর এ আদেশ দেন।
গত শুক্রবার (২ অক্টোবর) বিমানবন্দরের নিরাপত্তা কর্মকর্তা মো. শাহরিয়ার আলম সজিব বাদী হয়ে বিমানবন্দর থানায় মামলাটি করেন। ওই দিনই মামলাটি আদালতে উপস্থাপন হলে বিচারক তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মাজেদুল ইসলামকে আগামী ১০ নভেম্বরের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেন।
এর আগে শুক্রবার সন্ধ্যায় রাজধানীর ক্যান্টনমেন্ট-সংলগ্ন ধামালকোট এলাকার নিজ বাসা থেকে আখতারুজ্জামানকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ। পরে তাকে বিমানবন্দর থানায় হস্তান্তর করা হয়।
মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, গত ১ অক্টোবর জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের ৩৪ জন প্রতিনিধি স্বপরিবারে মদিনা হতে ঢাকায় আসেন। ফ্লাইটটি ৮টা ৫৫ মিনিটে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে এবং ৯টা ৮ মিনিটে পার্কিং করে। পরবর্তীতে যাত্রীরা বিমানবন্দরের ২১নং গেইট দিয়ে টার্মিনালে প্রবেশ করেন এবং ইমিগ্রেশন সম্পন্ন করে ল্যাগেজ সংগ্রহের জন্য ৮নং ল্যাগেজ বেল্ট এলাকায় পৌছান।
ওই সময়ে বিমানবন্দরে আগমনী যাত্রীর অতিরিক্ত চাপ থাকায় ট্রলি সংগ্রহের ক্ষেত্রে সাময়িক সংকট সৃষ্টি হয় এবং ট্রলি সংগ্রহের জন্য দীর্ঘ লাইন তৈরি হয়। কয়েকজন প্রটোকল সহকারী লাইনের নিয়ম ভঙ্গ করে ট্রলি সংগ্রহের চেষ্টা করেন। পরবর্তীতে লাগেজ আসতে বিলম্ব হওয়া এবং জমজমের পানি না আসাকে কেন্দ্র করে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন ব্যক্তি উত্তেজিত ও অশোভন আচরণ করতে থাকেন।
এসময় ঢাকা-৫ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ কামাল হোসেন হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এস এম রাগীব সামাদকে ঘটনাস্থলে ডেকে পাঠান। নির্বাহী পরিচালক ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে পরিস্থিতি সম্পর্কে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলার সময় মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান হঠাৎ তার দিকে আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে এগিয়ে আসেন এবং অত্যন্ত রূঢ়, অশালীন ও অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করতে থাকেন।
নির্বাহী পরিচালক অত্যন্ত শান্তভাবে বিমানবন্দরে অতিরিক্ত যাত্রীর চাপ এবং ট্রলি ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে তাকে বোঝানোর চেষ্টা করলেও আখতারুজ্জামান আরও উত্তেজিত হয়ে প্রকাশ্যে তাকে বলেন ‘আমি কিন্তু পিটাবো ধইরা’, ‘Get out from here’, ‘ঘাড় ধরে বের করে দিবো’, ‘কাজ জানেন না, তদবির করে পোস্টিং এ আসবেন’, ‘মাইর খাইতে চান?’ এ সময় আখতারুজ্জামানের আচরণ ছিল অত্যন্ত আক্রমণাত্মক ও মারমুখী।
পরিস্থিতি আরও অবনতির আশঙ্কায় মোহাম্মদ কামাল হোসেন নির্বাহী পরিচালককে নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে নিয়ে যান। পরবর্তীতে আখতারুজ্জামান পুনরায় উত্তেজিত হয়ে উপস্থিত ব্যক্তিদের উদ্দেশ্যে হুমকি দেন, ‘আপনাদের সবাইকে বিমানবন্দরে বেঁধে পিটানো এবং সোশাল মিডিয়ায় দেওয়া দরকার যাতে তারেক রহমান এটি দেখেন, তখন আপনারা সোজা হবেন। আপনাদের ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দেবো।’
এছাড়াও তিনি বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী সম্পর্কে অত্যন্ত অশালীন ও অবমাননাকর ভাষা ব্যবহার করেন। বলেন ‘He is a bastard. বিমানবন্দরের জন্য কিছুই করছে না।’
এসময় আখতারুজ্জামানের সঙ্গে থাকা কতিপয় প্রটোকল সহকারী এ ঘটনার ভিডিও ধারণ করতে থাকে এবং তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল করার হুমকি দেন। এতে বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা পরিস্থিতি আরও অবনতির আশঙ্কা সৃষ্টি হয়। ঘটনাস্থলে দায়িত্ব পালনরত নিরাপত্তা সুপারভাইজার ওয়ারেন্ট অফিসার মোহাম্মদ কামাল উদ্দিন বিমানবন্দরের কেপিআই-ভুক্ত এলাকায় ভিডিও ধারণ না করার জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নিষেধ করেন।
এসময় মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান তার কাছে এগিয়ে গিয়ে তাকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেন এবং একপর্যায়ে শারীরিকভাবে আঘাত করেন। পরবর্তীতে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একজন প্রতিনিধি ঘটনাস্থলে উপস্থিত হলে আখতারুজ্জামান তার সঙ্গেও অশোভন ও মারমুখী আচরণ করেন।
এছাড়াও তিনি অন্যান্য সাধারণ যাত্রীদের সংগ্রহ করা জমজমের পানির বোতল/পাত্র ট্রলি হতে ছুড়ে ফেলে দিয়ে ক্ষতি সাধন করে। এসব কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে আখতারুজ্জামান হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের মতো একটি কেপিআই-ভুক্ত ও স্পর্শকাতর স্থাপনায় দায়িত্ব পালনরত সরকারি কর্মকর্তা ও নিরাপত্তা সদস্যদের দায়িত্ব পালনে বাধা দেওয়া, ভয়ভীতি ও হুমকি দেওয়া, প্রকাশ্যে অশালীন ভাষায় গালিগালাজ, মারমুখী আচরণ এবং একজন দায়িত্বপ্রাপ্ত নিরাপত্তা সদস্যকে শারীরিকভাবে আঘাত করেছেন বলে মামলায় অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।
