নিজের বা সম্পত্তির অধিকার প্রতিষ্ঠা করা যায় যে মামলা করে

কোনো ব্যক্তি নিজের পদ, পদবী, ব্যক্তিগত অধিকার বা স্থাবর সম্পত্তিতে আইনগত স্বত্ব কিংবা অধিকার থেকে বঞ্চিত হলে ঘোষণামূলক মোকদ্দমা বা স্বত্বের মামলা, অর্থাৎ ডিক্লারেশন স্যুট দায়ের করতে পারেন। বৈধ কোনো অধিকার, চরিত্র বা স্বার্থ অন্য কোনো ব্যক্তি লঙ্ঘন করলে আদালতের মাধ্যমে সেই অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য ঘোষণার ডিক্রি চেয়ে মামলা করা যায়। তবে এ ধরনের মামলা কেন, কখন, কোথায় ও কীভাবে করতে হয়, কী কী কাগজপত্র প্রয়োজন এবং মামলায় বিজয়ী হতে কত সময় লাগতে পারে, তা জানা জরুরি।
এ মামলার মূল উদ্দেশ্য হলো স্বত্ব রক্ষা করা। এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইন, ১৮৭৭-এর ৪২ ধারায় অধিকার প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছে। জমি-জমার চূড়ান্ত মালিকানা পেতে আইনি বাধার নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ড. পি. এম. সিরাজুল ইসলাম (সিরাজ প্রামাণিক)। তার রচিত ‘জমি-জমা নিয়ে আপনার যত আইনি সমস্যা ও তার আইনি সমাধান’ বইটির দ্বিতীয় অধ্যায়ের ৬২ ও ৬৩ নম্বর পৃষ্ঠায় ‘যে মামলা করে আপনি নিজের বা সম্পত্তির অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পারেন!’ শিরোনামে তিনি বিষয়টির বিশদ ব্যাখ্যা দিয়েছেন।

বিষয়টি একটি উদাহরণের মাধ্যমে আরও পরিষ্কার হওয়া যাক। ধরুন, একটি গ্রামের লোকজন পার্শ্ববর্তী গ্রামের রহিম মিয়ার জমির ওপর দিয়ে চলাচলের পথের অধিকার দাবি করলেন। রহিম মিয়া এতে রাজি নন। কারণ, গ্রামবাসী রহিম মিয়ার ব্যক্তিগত সম্পত্তির ওপর এ ধরনের অধিকার দাবি করতে পারেন না। এ অবস্থায় রহিম মিয়া তার সম্পত্তির ওপর একক অধিকার রয়েছে, এই মর্মে ঘোষণা চেয়ে গ্রামবাসীকে বিবাদী করে মামলা দায়ের করতে পারেন।
দুই ধরনের প্রতিকার চাওয়া যায়
এ ধরনের মামলায় দুই রকমের প্রতিকার চাওয়া যায়। এগুলো হলো রক্ষণমূলক ও প্রতিকারমূলক প্রতিকার।
কয়েকটি উদাহরণ দিলে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হবে। ধরুন, সুমি খাতুনকে এসএসসি পরীক্ষার হল থেকে বেআইনি উপায়ে এক্সপেল করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে সুমি খাতুন এসএসসি পাস করেছেন, এই মর্মে ঘোষণা চেয়ে সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনের ৪২ ধারা অনুযায়ী মামলা দায়ের করতে পারবেন। এখানে তার আইনগত পরিচয়ের ওপর আঘাত আনা হয়েছে। তাই তিনি ঘোষণামূলক মামলা দায়ের করতে পারবেন।
স্বত্ব বা টাইটেল কথাটির সহজ অর্থ হলো কোনো স্থাবর সম্পত্তির ওপর মালিকানা। ধরুন, জালাল মিয়া ২০ শতাংশ জমির মালিক। এখন করিম মিয়া যদি ওই ২০ শতাংশ জমিতে জালাল মিয়ার স্বত্ব অস্বীকার করেন, তাহলে জালাল মিয়া প্রতিকার চেয়ে করিম মিয়ার বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনের ৪২ ধারা অনুযায়ী ওই ২০ শতাংশ জমিতে তার স্বত্ব রয়েছে, এই মর্মে ঘোষণামূলক মামলা দায়ের করতে পারবেন।
মনে রাখতে হবে, এ মামলায় মূল প্রতিকারের পাশাপাশি যে অন্যান্য প্রতিকার চাওয়া হয়, সেগুলোকে আনুষঙ্গিক প্রতিকার বলা হয়। যেমন, স্বত্ব ঘোষণার মামলায় স্বত্ব ঘোষণার সঙ্গে দখল উদ্ধারের প্রার্থনাও করতে হয়। এখানে স্বত্ব আছে, এই মর্মে ঘোষণা চাওয়াটি মূল প্রতিকার। আর দখল উদ্ধারের প্রার্থনা আনুষঙ্গিক প্রতিকার। অর্থাৎ বাদী যখন সম্পত্তির দখলে থাকবেন না, তখন তাকে আনুষঙ্গিক প্রতিকার হিসেবে দখল উদ্ধারের প্রার্থনাও করতে হবে। সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনের ৪২ ধারায় স্বত্বের মামলায় আনুষঙ্গিক প্রতিকার প্রার্থনা করাকে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
যেসব বিষয়েও ঘোষণামূলক মামলা করা যায়
কোন কোন বিষয়ে এ ধরনের মামলা করা যায়, তা জানা দরকার। যেমন, বিয়ে সংক্রান্ত কোনো প্রশ্ন উঠলে এ বিষয়ে মামলা করে প্রতিকার পাওয়া যেতে পারে।
ধরুন, সাক্ষী খাতুন আপনাকে তার স্বামী দাবি করলেন। কিন্তু আপনি কখনোই সাক্ষী খাতুনকে চেনেন না কিংবা তার সঙ্গে বিয়ের পিঁড়িতে বসেননি। এ অবস্থায় বাদী বিবাদীকে বিয়ে করেছেন কি না, এই মর্মে দেওয়ানি আদালতে ঘোষণামূলক মোকদ্দমা দায়ের করা যায়। একইভাবে বাদী ও বিবাদী স্বামী ও স্ত্রী কি না, এই মর্মেও ঘোষণামূলক মামলা করা যায়।
আপনি সাক্ষী খাতুনের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হননি, এই মর্মেও দেওয়ানি আদালতে ঘোষণামূলক মামলা দায়ের করতে পারবেন। মামলার পক্ষগণের মধ্যে বিবাহবিচ্ছেদ হয়েছে কি না, এই মর্মেও ঘোষণামূলক মামলা করা যায়।
ধর্মীয় কাজ করার অধিকার একটি আইনগত অধিকার। তাই কেউ আপনার ধর্মীয় অধিকারে হস্তক্ষেপ করলে সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনের ৪২ ধারা অনুসারে ঘোষণামূলক মোকদ্দমা দায়ের করতে পারেন।
এ ছাড়া সন্তানের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে, মৃত ব্যক্তির উত্তরাধিকার বিষয়ে, কারও ভোটাধিকার বা চাকরি বিষয়ে এবং মেধাস্বত্ব বা Intellectual Property বিষয়ে স্বত্ব ঘোষণা চেয়ে মামলা করা যেতে পারে।
মামলা দায়েরের সময়সীমা ও কোর্ট ফি
তবে এ মামলা ছয় বছরের মধ্যে দায়ের করতে হয়। তামাদি আইনের ১২০ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ঘোষণামূলক মামলার প্রকৃত কারণ উদ্ভব হওয়ার সময় থেকে ছয় বছরের মধ্যে এ মামলা দায়ের করতে হয়।
সাধারণত ঘোষণামূলক মামলা দায়ের করতে হলে সর্বনিম্ন ৩০০ টাকা কোর্ট ফি দিতে হয়। তবে আনুষঙ্গিক প্রতিকারসহ ঘোষণামূলক মামলা দায়ের করতে হলে মূল্যায়নভিত্তিক কোর্ট ফি প্রদান করতে হয়।
মনে রাখবেন, অধিকার রক্ষায় সময়মতো আইনি পদক্ষেপ জরুরি। কোনো ব্যক্তি নিজের স্বত্ব, সম্পত্তির মালিকানা বা অন্য কোনো আইনগত অধিকার নিয়ে বিরোধের মুখে পড়লে বিষয়টি অবহেলা না করে দ্রুত আইনি পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। ঘোষণামূলক মামলা অধিকার প্রতিষ্ঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি পথ। তবে মামলার ধরন, প্রযোজ্য আইন, সময়সীমা ও প্রয়োজনীয় প্রতিকারের বিষয়টি সঠিকভাবে নির্ধারণ করা প্রয়োজন। তাই কোনো অধিকার নিয়ে বিরোধ দেখা দিলে সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র যাচাই করে আইনজীবীর পরামর্শ নিয়ে যথাসময়ে আদালতের আশ্রয় নেওয়াই নিরাপদ।
লেখকের পরিচয়
ড. পি. এম. সিরাজুল ইসলাম পাঠকসমাজে ‘সিরাজ প্রামাণিক’ নামে পরিচিত। কলেজজীবন থেকেই তিনি সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত হন। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর তার কাজের পরিধি আরও বিস্তৃত হয়। তিনি দৈনিক যুগান্তর, দৈনিক সংবাদ, দৈনিক আমার দেশসহ বিভিন্ন জাতীয় ও স্থানীয় দৈনিক পত্রিকায় লিখেছেন।

সংবাদপত্রের সুবাদে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে বিভিন্ন সেমিনারে যোগ দিতে তিনি সার্কভুক্ত বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেছেন। গবেষণার কাজে কিছু সময় কাটিয়েছেন থাইল্যান্ডের চিয়াং মাই বিশ্ববিদ্যালয়ে। রাজধানী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পর ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে অধ্যাপক ড. মো. শাহজাহান মণ্ডলের তত্ত্বাবধানে উচ্চতর গবেষণা করেন।
তার গবেষণার বিষয় ছিল, ‘Right to life and personal liberty in Bangladesh with special reference to extra-judicial killing.’ লেখকের আইনবিষয়ক বিভিন্ন নিবন্ধ দেশের জাতীয় দৈনিকগুলোতে প্রকাশিত হয়েছে। তিনি আইনবিষয়ক একাধিক গ্রন্থ রচনা করেছেন। তাঁর বেশ কিছু গ্রন্থ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে রেফারেন্স গ্রন্থ হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে বলে বইয়ের লেখক পরিচিতিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
তার প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে—‘পকেট আইন’, ‘আইনে আপনার যত অধিকার’, ‘২২টি আইনের সহজ পাঠ’, ‘জমি ক্রয়-বিক্রয় আইন’, ‘জমি জমার আইন-কানুন ও আলোচনা’, ‘রেজিস্ট্রেশন অ্যাক্ট অ্যান্ড ডিড রাইটিং’, ‘উইথ মডেল’, ‘রিয়াদ আইন’, ‘বিয়ে-তালাক-দেনমোহর-ভরণপোষণ ও নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন’, ‘সংবাদপত্র বিষয়ে আইন’, ‘কম্পিউটার অপরাধ আইন’, ‘ফৌজদারি মামলা পিটিশন পদ্ধতি’, ‘পারিবারিক আইন’, ‘নাগরিক অধিকার আইন’, ‘লিগ্যাল নোটিশ অ্যান্ড অ্যাফিডেভিট লেখার পদ্ধতি’, ‘প্রাত্যহিক জীবনে আইন’, ‘উত্তরাধিকার আইন’ ও ‘ওয়াক্ফ’ প্রভৃতি।


