জমি-জমার চূড়ান্ত মালিকানা পেতে কী করবেন

জমি কেনার পর দলিল হাতে পেলেই অনেকেই ধরে নেন, এখন থেকে জমিটির মালিক তিনিই। কিন্তু বাস্তবে শুধু জমির দলিল রেজিস্ট্রি করলেই মালিকানার পুরো প্রক্রিয়া শেষ হয় না। জমি কেনার পর আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি ও প্রশাসনিক ধাপ সম্পন্ন করতে হয়। এসব ধাপের কোনো একটি বাদ পড়লে ভবিষ্যতে জমির মালিকানা নিয়ে জটিলতা, বিরোধ এমনকি মামলাতেও জড়াতে হতে পারে।
জমি-জমার চূড়ান্ত মালিকানা পেতে আইনি বাধার নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ড. পি. এম. সিরাজুল ইসলাম (সিরাজ প্রামাণিক)। তার রচিত ‘জমি-জমা নিয়ে আপনার যত আইনি সমস্যা ও তার আইনি সমাধান’ বইটির দ্বিতীয় অধ্যায়ের ৪৬ ও ৪৭ নম্বর পৃষ্ঠায় ‘জমি-জমার চূড়ান্ত মালিকানা পেতে কি করবেন?’ শিরোনামে তিনি বিষয়টির বিশদ ব্যাখ্যা দিয়েছেন।

জমির মালিকানা নিশ্চিত করতে মূলত দলিল রেজিস্ট্রেশন, নামজারি বা মিউটেশন এবং রেকর্ডস অব রাইটস হালনাগাদের মতো ধাপগুলো সঠিকভাবে সম্পন্ন করা জরুরি। একই সঙ্গে জমি কেনার আগে দাগ, খতিয়ান, জমির পরিমাণ ও চৌহদ্দি যাচাইয়ের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় কাগজপত্রও ভালোভাবে পরীক্ষা করে নিতে হয়। তাই জমি কেনার পর কোন কাজটি আগে করতে হবে, নামজারি কেন গুরুত্বপূর্ণ এবং জমি রেজিস্ট্রির সময় কী কী কাগজ সঙ্গে রাখতে হবে, এসব বিষয় জানা থাকাটাও জরুরি।
প্রথম ধাপ: দলিল রেজিস্ট্রেশন
জমির মালিকানা নিশ্চিত করার প্রথম ধাপ হচ্ছে দলিল রেজিস্ট্রেশন। তবে রেজিস্ট্রেশনের আগে অভিজ্ঞ আইনজীবী কিংবা দলিল লেখকের মাধ্যমে দলিলটি ভালোভাবে লিখে নিতে হবে। যে জমিটি কিনছেন, তার দাগ ও খতিয়ান ভালো করে দেখে নিতে হবে। জমির পরিমাণ ও চৌহদ্দিও যাচাই করা জরুরি।
এ ছাড়া জমির দাতা ও গ্রহীতার নাম, ঠিকানা এবং বানান দলিলে ঠিক আছে কি না, তা ভালোভাবে দেখে নিতে হবে। এলটি নোটিশে জমির পরিমাণ দেখে নিতে হবে। রেজিস্ট্রি খরচের ব্যাংক পে-অর্ডারের ফটোকপিও সংরক্ষণ করতে হবে।
জমির ক্রেতা হিসেবে আপনাকে কিন্তু সব খরচ বহন করতে হবে না। আয়কর ও ভ্যাট জমির বিক্রেতা দেবেন। দলিল রেজিস্ট্রেশন হয়ে গেলে ৫২ ধারার রশিদ বুঝে নিতে হবে। সবশেষে দলিলের অবিকল নকলের জন্য আবেদন করতে হবে।
দ্বিতীয় ধাপ: নামজারি বা মিউটেশন
এরপরের ধাপ হচ্ছে নামজারি বা মিউটেশন। অনেকেই দলিল রেজিস্ট্রি হওয়ার পরই মনে করেন জমি তার হয়ে গেছে। কিন্তু জমির মালিকানা সংক্রান্ত প্রক্রিয়া এখানেই শেষ হয় না।
এক হিসাবে, বাংলাদেশের মামলার মোট ৮৭ শতাংশের মূল কারণ ভূমি সংক্রান্ত বিরোধ। এতে আদালতে মামলাজট তৈরি হয় এবং আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েন সংশ্লিষ্ট সবাই।
তবে নতুন ব্যবস্থাপনায় এসব সমস্যা অনেকটাই কমিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এখন সাবরেজিস্ট্রার অফিস ও এসি ল্যান্ডের অফিসের মধ্যে পারস্পরিক তথ্যবিনিময়ের সফটওয়্যার রয়েছে। বাংলাদেশের সব এসি ল্যান্ড অফিসের চার কোটি ৩০ লাখ রেকর্ডস অব রাইটস অনলাইনে চলে এসেছে।
এখন সাবরেজিস্ট্রার অফিস ও এসি ল্যান্ড অফিসের কর্মকর্তারা একে অন্যের ডাটাবেইসে প্রবেশ করতে পারেন। এর ফলে কেউ জমি রেজিস্ট্রি করতে গেলে রেজিস্ট্রি অফিস প্রথমে সেই জমির আরএস অর্থাৎ রেকর্ডস অব রাইটস দেখে নিশ্চিত হবে, যিনি জমি বিক্রি করছেন তিনি প্রকৃত মালিক কি না।
নতুন পদ্ধতিতে জমি রেজিস্ট্রি হয়ে যাওয়ার তথ্য সঙ্গে সঙ্গেই ভূমি অফিস দেখতে পারে। আপনি আবেদন করে যদি বলেন যে অমুক তারিখে এত নম্বর দলিলটি আপনার, তাহলে ভূমি অফিস তা যাচাই করে সহজেই আপনার জমির নামজারি করে দিতে পারবে। এতে সময়ক্ষেপণের সুযোগ থাকার কথা নয়।
কোনো এসি ল্যান্ড সময়ক্ষেপণ করতে চাইলে তা ডিসি অফিসের নজরদারিতে ধরা পড়তে পারে, যা তার চাকরির অসদাচরণ হিসেবে গণ্য হবে।
তৃতীয় ধাপ: রেকর্ডস অব রাইটস
সবশেষে তৃতীয় ধাপ হচ্ছে আরএস অর্থাৎ রেকর্ডস অব রাইটস। খতিয়ানে নাম, জেলা ও মৌজার নাম লিপিবদ্ধ থাকে। এ ছাড়া একাধিক কলামে জমির মালিকের নাম, পিতার নাম, ঠিকানা, দাগ নম্বর, জমির শ্রেণি, পরিমাণসহ বিভিন্ন তথ্য লিপিবদ্ধ থাকে।
নামজারি হয়ে যাওয়ার পর এসি ল্যান্ডকে সংশ্লিষ্ট জমির রেকর্ডস অব রাইটস বা আরওআরে জমির নতুন মালিকের তথ্য হালনাগাদ করতে হবে। এই তিনটি ধাপ অতিক্রমের পরই জমিতে আপনার চূড়ান্ত মালিকানা অর্জিত হয়।
আপনাদের জানিয়ে রাখি, নতুন পদ্ধতিতে জমি রেজিস্ট্রির আট দিনের মধ্যেই আপনার জমির মিউটেশন বা নামজারি হওয়ার কথা।
জমি রেজিস্ট্রির সময় যেসব কাগজ লাগবে
জমিটি যিনি বিক্রি করবেন, তাকে অবশ্যই রেজিস্ট্রি অফিসে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সঙ্গে নিয়ে যেতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে-
- সিএস/এসএ/আরএস/বিএস খতিয়ান অথবা নামজারি খতিয়ান, অর্থাৎ এলআর খতিয়ানের সর্বশেষ জরিপের মাধ্যমে সৃষ্ট খতিয়ান
- প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে দলিলের মূল কপি অথবা সার্টিফাইড কপি
- হালনাগাদ সন পর্যন্ত ভূমি উন্নয়ন কর বা খাজনা পরিশোধের রশিদ বা দাখিলা
- জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি
- উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সম্পত্তি হলে ওয়ারিশ সনদ
- পাসপোর্ট সাইজের রঙিন ছবি
- প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে বিক্রি করা জমির বায়া দলিল অর্থাৎ পিঠ দলিলসমূহ
- প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে টিআইএন সার্টিফিকেট অর্থাৎ আয়কর সনদপত্র
জমি কেনার ক্ষেত্রে শুধু দলিল রেজিস্ট্রি করেই দায়িত্ব শেষ হয় না। দলিল রেজিস্ট্রেশনের পর নামজারি এবং রেকর্ডস অব রাইটস হালনাগাদের ধাপগুলোও সম্পন্ন করতে হয়। তাই জমি কেনার আগে ও পরে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়াগুলো সঠিকভাবে সম্পন্ন করা জরুরি।
লেখকের পরিচয়
ড. পি. এম. সিরাজুল ইসলাম পাঠকসমাজে ‘সিরাজ প্রামাণিক’ নামে পরিচিত। কলেজজীবন থেকেই তিনি সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত হন। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর তার কাজের পরিধি আরও বিস্তৃত হয়। তিনি দৈনিক যুগান্তর, দৈনিক সংবাদ, দৈনিক আমার দেশসহ বিভিন্ন জাতীয় ও স্থানীয় দৈনিক পত্রিকায় লিখেছেন।

সংবাদপত্রের সুবাদে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে বিভিন্ন সেমিনারে যোগ দিতে তিনি সার্কভুক্ত বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেছেন। গবেষণার কাজে কিছু সময় কাটিয়েছেন থাইল্যান্ডের চিয়াং মাই বিশ্ববিদ্যালয়ে। রাজধানী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পর ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে অধ্যাপক ড. মো. শাহজাহান মণ্ডলের তত্ত্বাবধানে উচ্চতর গবেষণা করেন।
তার গবেষণার বিষয় ছিল, ‘Right to life and personal liberty in Bangladesh with special reference to extra-judicial killing.’ লেখকের আইনবিষয়ক বিভিন্ন নিবন্ধ দেশের জাতীয় দৈনিকগুলোতে প্রকাশিত হয়েছে। তিনি আইনবিষয়ক একাধিক গ্রন্থ রচনা করেছেন। তাঁর বেশ কিছু গ্রন্থ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে রেফারেন্স গ্রন্থ হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে বলে বইয়ের লেখক পরিচিতিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
তার প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে—‘পকেট আইন’, ‘আইনে আপনার যত অধিকার’, ‘২২টি আইনের সহজ পাঠ’, ‘জমি ক্রয়-বিক্রয় আইন’, ‘জমি জমার আইন-কানুন ও আলোচনা’, ‘রেজিস্ট্রেশন অ্যাক্ট অ্যান্ড ডিড রাইটিং’, ‘উইথ মডেল’, ‘রিয়াদ আইন’, ‘বিয়ে-তালাক-দেনমোহর-ভরণপোষণ ও নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন’, ‘সংবাদপত্র বিষয়ে আইন’, ‘কম্পিউটার অপরাধ আইন’, ‘ফৌজদারি মামলা পিটিশন পদ্ধতি’, ‘পারিবারিক আইন’, ‘নাগরিক অধিকার আইন’, ‘লিগ্যাল নোটিশ অ্যান্ড অ্যাফিডেভিট লেখার পদ্ধতি’, ‘প্রাত্যহিক জীবনে আইন’, ‘উত্তরাধিকার আইন’ ও ‘ওয়াক্ফ’ প্রভৃতি।


