logo
Advertisement

জমি দখল ও স্বত্ব পুনরুদ্ধার নিয়ে আইন কী বলে

এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
জমি দখল ও স্বত্ব পুনরুদ্ধার নিয়ে আইন কী বলে
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি দিয়ে তৈরি ছবি

জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধ ও অবৈধ দখল বাংলাদেশসহ এই অঞ্চলের অন্যতম প্রধান সামাজিক ও আইনি সমস্যা। নিজস্ব ক্রয়কৃত বা পৈতৃক সম্পত্তি হাতছাড়া হলে প্রতিকার পাওয়ার বিধান সংবিধানে ও প্রচলিত আইনে রয়েছে। তবে যথাযথ আইনি ধারা, সময়সীমা এবং আদালতের নজির সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা না থাকায় অনেকেই দীর্ঘমেয়াদি আইনি জটিলতায় পড়েন। অবৈধ দখল উচ্ছেদ এবং সম্পত্তি পুনরুদ্ধারে বিদ্যমান আইন ও আইনি পদক্ষেপের বিস্তারিত তুলে ধরা হলো।

সম্পত্তি যদি কেউ জোরপূর্বক বা অবৈধভাবে দখল করে নেয়, তবে আইনের মাধ্যমে তা উদ্ধার করা সম্ভব। তবে এ ক্ষেত্রে সময় ও আইনের সঠিক ধারা জানা অত্যন্ত জরুরি।

এ সম্পর্কিত বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ড. পি. এম. সিরাজুল ইসলাম (সিরাজ প্রামাণিক)। তার রচিত ‘জমি-জমা নিয়ে আপনার যত আইনি সমস্যা ও তার আইনি সমাধান’ বইটির নবম অধ্যায়ের ২৫১, ২৫২ ও ২৫৩ নম্বর পৃষ্ঠায় ‘দখলদারের বিরুদ্ধে উচ্ছেদের মামলা কিভাবে করবেন?’ শিরোনামে তিনি বিষয়টির বিশদ ব্যাখ্যা দিয়েছেন।

‘আইনি সমস্যা ও তার আইনি সমাধান’ বইয়ের প্রচ্ছদ। ছবি: এশিয়া পোস্ট
‘আইনি সমস্যা ও তার আইনি সমাধান’ বইয়ের প্রচ্ছদ। ছবি: এশিয়া পোস্ট

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান আইনানুগভাবে সম্পত্তির মালিক না হয়েও যদি ১২ বছরের অধিককাল টানা দখলে থাকে, তবে ক্ষেত্রবিশেষে 'অ্যাডভার্স পজেশন' (বিরুদ্ধ দখল) সংক্রান্ত আইনি জটিলতা তৈরি হতে পারে। কিন্তু দখলের মেয়াদ ১২ বছরের কম হলে সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনের মাধ্যমে সহজেই উচ্ছেদ মামলা করা যায়। তবে সরকারি সম্পত্তির ক্ষেত্রে এই নিয়ম প্রযোজ্য নয়।

সংবিধানের ৪২ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, আইনগত বাধা ছাড়া প্রত্যেক নাগরিকের সম্পত্তি অর্জন, ধারণ ও হস্তান্তরের অধিকার রয়েছে। আইনবহির্ভূতভাবে কারও সম্পত্তি হরণ করা হলে সংবিধানের ৩১ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ভুক্তভোগী আইনের আশ্রয় পাওয়ার সম্পূর্ণ অধিকারী।

সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইন ১৮৭৭-এর ৯ ধারা অনুসারে, কোনো ব্যক্তি অন্যায়ভাবে দখলচ্যুত হলে তিনি আদালতের মাধ্যমে তা পুনরুদ্ধার করতে পারেন। এছাড়া ফৌজদারী কার্যবিধির ১৪৪ ও ১৪৫ ধারার অধীনে জমি দখল প্রতিরোধ ও দ্রুত প্রতিকারের জন্য নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে আবেদন করার সুযোগ রয়েছে। ফৌজদারী ধারায় পুলিশি তদন্ত ও সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

তবে দীর্ঘদিন অতিবাহিত হলে ভুক্তভোগীকে সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনের ৮ ধারা অনুযায়ী দেওয়ানি আদালতে স্বত্ব প্রমাণের মামলা করতে হয়। বেদখল হওয়ার ১২ বছরের মধ্যে এই মোকদ্দমা দায়ের করতে হয় এবং জমির মূল্যমানের ওপর নির্ধারিত কোর্ট ফি পরিশোধ করতে হয়।

বইটি থেকে লেখার অংশ বিশেষ। ছবি: এশিয়া পোস্ট
বইটি থেকে লেখার অংশ বিশেষ। ছবি: এশিয়া পোস্ট

উচ্চ আদালতের বিভিন্ন নজির (যেমন: ৩৮ ডিএলআর (এডি) ২২ এবং ২০ বিএলডি (হাইকোর্ট) ৪০৭) অনুযায়ী, শুধু বেআইনি দখলে থাকলেই আসল মালিকের স্বত্ব বিলুপ্ত হয় না। বৈধ দলিল ছাড়া কেবল বহুবছর দখলে থাকলেই কেউ জমির মালিক হতে পারে না।

তবে বাস্তব ক্ষেত্রে ভূমি অফিসের ভুলে এবং প্রশাসনিক জটিলতায় ভুগে অনেক নাগরিককে বছরের পর বছর ধরে আইনি লড়াই চালিয়ে যেতে হয়।

জমিজমা সংক্রান্ত যেকোনো বিরোধে আইনি জটিলতা এড়াতে সঠিক সময়ে উপযুক্ত আদালতে পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। আইনি প্রতিকারের পাশাপাশি ভূমি রেকর্ড ও দলিলের সচেতনতা রক্ষা করা গেলে অনাকাঙ্ক্ষিত বেদখল ও দীর্ঘসূত্রী মামলা থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব।

লেখকের পরিচয়

ড. পি. এম. সিরাজুল ইসলাম পাঠকসমাজে ‘সিরাজ প্রামাণিক’ নামে পরিচিত। কলেজজীবন থেকেই তিনি সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত হন। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর তার কাজের পরিধি আরও বিস্তৃত হয়। তিনি দৈনিক যুগান্তর, দৈনিক সংবাদ, দৈনিক আমার দেশসহ বিভিন্ন জাতীয় ও স্থানীয় দৈনিক পত্রিকায় লিখেছেন।

সংবাদপত্রের সুবাদে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে বিভিন্ন সেমিনারে যোগ দিতে তিনি সার্কভুক্ত বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেছেন। গবেষণার কাজে কিছু সময় কাটিয়েছেন থাইল্যান্ডের চিয়াং মাই বিশ্ববিদ্যালয়ে। রাজধানী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পর ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে অধ্যাপক ড. মো. শাহজাহান মণ্ডলের তত্ত্বাবধানে উচ্চতর গবেষণা করেন।

বইটির ফ্লাপে দেওয়া লেখক পরিচিতি। ছবি: এশিয়া পোস্ট
বইটির ফ্লাপে দেওয়া লেখক পরিচিতি। ছবি: এশিয়া পোস্ট

তার গবেষণার বিষয় ছিল, ‘Right to life and personal liberty in Bangladesh with special reference to extra-judicial killing.’ লেখকের আইনবিষয়ক বিভিন্ন নিবন্ধ দেশের জাতীয় দৈনিকগুলোতে প্রকাশিত হয়েছে। তিনি আইনবিষয়ক একাধিক গ্রন্থ রচনা করেছেন। তাঁর বেশ কিছু গ্রন্থ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে রেফারেন্স গ্রন্থ হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে বলে বইয়ের লেখক পরিচিতিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

তার প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে—‘পকেট আইন’, ‘আইনে আপনার যত অধিকার’, ‘২২টি আইনের সহজ পাঠ’, ‘জমি ক্রয়-বিক্রয় আইন’, ‘জমি জমার আইন-কানুন ও আলোচনা’, ‘রেজিস্ট্রেশন অ্যাক্ট অ্যান্ড ডিড রাইটিং’, ‘উইথ মডেল’, ‘রিয়াদ আইন’, ‘বিয়ে-তালাক-দেনমোহর-ভরণপোষণ ও নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন’, ‘সংবাদপত্র বিষয়ে আইন’, ‘কম্পিউটার অপরাধ আইন’, ‘ফৌজদারি মামলা পিটিশন পদ্ধতি’, ‘পারিবারিক আইন’, ‘নাগরিক অধিকার আইন’, ‘লিগ্যাল নোটিশ অ্যান্ড অ্যাফিডেভিট লেখার পদ্ধতি’, ‘প্রাত্যহিক জীবনে আইন’, ‘উত্তরাধিকার আইন’ ও ‘ওয়াক্‌ফ’ প্রভৃতি।