logo

বিশ্বকবির গ্রাফিতিতে কালি, রিমান্ড শেষে আয়াস-রিমি কারাগারে

বিশ্বকবির গ্রাফিতিতে কালি, রিমান্ড শেষে আয়াস-রিমি কারাগারে
আল নূর মোহাম্মদ আয়াস ও মারজিয়া খন্দকার রিমিকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দিয়েছেন আদালত। ছবি: বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর

শিল্পকলা একাডেমির সামনে দেয়ালে আঁকা বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গ্রাফিতিতে কালি দিয়ে মোছার চেষ্টায় অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র, বিদ্বেষ ছড়ানো ও ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের মামলায় রাষ্ট্র সংলাপ ফোরামের সদস্যসচিব আল নূর মোহাম্মদ আয়াস ও মারজিয়া খন্দকার রিমিকে রিমান্ড শেষে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দিয়েছেন আদালত।

বুধবার (১৪ অক্টোবর) বিকেলে ঢাকার মেট্রোপলিটন মাজিস্ট্রেট মো. রিয়াদ হাসান তদন্ত কর্মকর্তার আবেদনের প্রেক্ষিতে এ আদেশ দেন।

এদিন আয়াশকে তিন দিন এবং রিমিকে দুই দিনের রিমান্ড শেষে কারাগারে আটক রাখার আবেদন করেন তদন্ত কর্মকর্তা শাহবাগ থানার উপপরিদর্শক আব্দুল গাফফার হিমেল। এর আগে গত রোববার এ মামলার অন্য দুই আসামিসহ আরও দুজনকে রিমান্ডে পাঠানো হয়। তারা হলেন, সাকিবুল হাসান ও সুজন শেখ। এর মধ্যে সাকিবকে তিন দিন এবং সুজনকে দুই দিনের রিমান্ড মঞ্জুর হয়। গতকাল মঙ্গলবার এ দুজনকে রিমান্ড শেষে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

আজ দুপুর ২টা ৪০ মিনিটে আসামি আয়াস ও রিমিকে আদালতে হাজির করে তদন্ত কর্মকর্তা শাহবাগ থানার উপপরিদর্শক আব্দুল গাফফার হিমেল আটক রাখার আবেদন করেন। আবেদনে আসামিদ্বয় রিমান্ডে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন এবং সেগুলো সেগুলো যাচাই-বাছাই এবং তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাদেরকে কারাগারে আটক রাখার আবেদন জানানো হয়।

প্রসিকিউশন বিভাগের এসআই শাহ আলম বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

এদিন আদালতে রাষ্ট্র পক্ষের আইনজীবী পাবলিক প্রসিকিউটর পিপি ওমর ফারুক আসামিদ্বয়ের আটক রাখার পক্ষে শুনানি করেন। তিনি আদালতে বলেন, ‘আয়াস রবীন্দ্রনাথ ছাড়া কারও মুখে কালি দেয়নি। রবীন্দ্রনাথের মুখে কালি দিয়ে মূলত হিন্দু সম্প্রদায়কে উসকে দিয়েছে, কারণ সামনে দুর্গাপূজা। ফ্রান্সে বসবাসকারী বাংলাদেশি সেফুদা থেকে এরা গালি শিখছে। গালাগালি করলে মনে করে ভাইরাল হতে পারব। ভালো কথা বলে ভাইরাল হওয়ার সুযোগ আছে।’

পিপি বলেন, ‘বাংলাদেশ স্বাধীন দেশ। এখানে পাকিস্তান নিয়ে বক্তব্য দেওয়ার কিছু ছিল না।’

আয়াসকে নিয়ে পিপি আরও বলেন, ‘কেন আপনি এখানে পাকিস্তানকে টানতে গেলেন। জীবনে বাবা-মা, দাদা-দাদির কবর জেয়ারত করেন না। মিলাদ পড়ান না। পাকিস্তানে আরেক নেতার কবর জিয়ারত নিয়ে কেন এত মাতামাতি। সুতরাং এটার পেছনে দুর্ভিসন্ধি রয়েছে।’

পিপি বলেন, ‘গোলাম আজম-নিজামীর ছবি দেওয়ার দাবি করতে পারতেন। কিন্তু আরেকজনের (রবীন্দ্রনাথের) ছবিতে কালি দিতে গেলেন কেন। মূলত মানুষকে শ্রেণি বিভেদ করতে সেখানে গিয়ে এসব করতে গেছেন। সুতরাং মামলার সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে আসামিদ্বয়ের জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানো হোক।’

শুনানি চলাকালে মুহূর্তে রাষ্ট্র পক্ষের আইনজীবীরা আয়াশের আইনজীবীদের কয়েকজনকে জামায়াতের সমর্থক বলেন। এ সময় এ কথাকে কেন্দ্র করে এজলাসে ৪টা ৩৫ মিনিটের দুই পক্ষের আইনজীবীদের মধ্যে কথা-কাটাকাটি ও বাকবিতণ্ডার এক পর্যায়ে হাতাহাতি শুরু হয়। পরে বিচারক ৪টা ৩৬ মিনিটে বিচারক এজলাস থেকে নেমে যান।

আয়াস তখন আইনজীবীদের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘আপনারা এসব করে আমার জীবন ধ্বংস করবেন?’ পরে ৪টা ৪৩ মিনিটে বিচারক পুনরায় এজলাসে উঠেন এবং উপস্থিত আইনজীবীরা বিচারকের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন।

এদিন আসামিপক্ষের আইনজীবী মনির হোসাইন সুমনসহ কয়কজন বিরোধিতা করে জামিন আবেদনের ওপর শুনানি করেন। আদালতে আয়াসের অসুস্থতার কথা বলে জামিনের প্রার্থনা করেন। এ সময় আদালতের সামনে আয়াসকে লক্ষ্য করে তিনি বলেন, ‘তোমার কি সমস্যা?’ তখন আয়াস বলেন, ‘গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা।’

একই সঙ্গে রিমির আইনজীবী আদালতকে বলেন, ‘আমাদের দেশের কবিদের নিয়ে গ্রাফিতি করা হয়নি বলে সে (রিমি) মোছার চেষ্টা করছে। সে একজন নারী, তার ছোট শিশু আছে। জামিন পাওয়ার হকদার। তাদেরকে যেই পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে সে ফ্যাসিস্টের দালাল কি না, এটা যাচাই করা হোক।’

মামলার অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গ্রাফিতি মোছার চেষ্টার ঘটনায় শাহবাগ থানার এসআই জিয়াউল হক মামলা করেন। ধারা অনুযায়ী, অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র করা, বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে শত্রুতা সৃষ্টি করা এবং ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানার বিষয়টিকে অন্তর্ভুক্ত করেছেন মামলার বাদী। শিল্পকলা একাডেমির সামনে দেয়ালে শনিবার দুপুরে আঁকা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গ্রাফিতি মুছতে গিয়ে পুলিশের বাঁধার মুখে পড়েন একদল তরুণ। এর জেরে উভয়পক্ষের বাক-বিতণ্ডার মধ্যে আয়াসসহ চারজনকে আটক করে থানায় নিয়ে যায় পুলিশ। ঘটনাস্থলে এক নারী রবীন্দ্রনাথের প্রতিকৃতিতে কালি দিতে দেখা যায়, তখন এক পুলিশ সদস্য তাকে বাধা দেন। এসময় ওই নারী বলেন, ‘তারা ভারতীয় আগ্রাসনের প্রতিবাদ জানাতে এসেছেন। পুলিশি বাধার মুখে আয়াসের নেতৃত্বে তারা স্লোগানও দেয়।’

গত ৫ অক্টোবর সেগুনবাগিচার ফুটপাত দখলমুক্ত করে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)। এরপর ফুটপাতের দেয়ালে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন, সত্যজিৎ রায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ও কাজী নজরুল ইসলামসহ শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে অবদান রাখা ১০ গুণী ব্যক্তিত্বের গ্রাফিতি আঁকা হয়।

শুক্রবার জুলাই রেভ্যুলুশনারি অ্যালায়েন্স নামের একটি ফেসবুক পেইজ থেকে এই সাংস্কৃতিক ব্যক্তিদের ছবি আঁকা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। সত্যজিৎ রায় কিংবা ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকে পশ্চিমবঙ্গের সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব আখ্যা দিয়ে তাদের প্রতিকৃতি আঁকা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। শনিবার রাষ্ট্র সংলাপ ফোরামের আয়াসের নেতৃত্বে সেসব গ্রাফিতি মুছতে যায় একদল লোক।