জমি রক্ষায় জাল দলিল বাতিল করবেন যেভাবে
-8fce0d-720x405.webp)
বাংলাদেশে সম্পত্তি নিয়ে বিরোধের অন্যতম প্রধান কারণ ভুয়া, জাল ও বানোয়াট দলিল। অন্যের মালিকানাধীন জমি হড়প করতে অসাধু চক্র প্রায়শই জালিয়াতির আশ্রয় নেয়। তবে সঠিক আইনি পদক্ষেপ জানা থাকলে প্রতারকদের চক্রান্ত নস্যাৎ করে নিজের স্বত্ব ও দখল পুনরুদ্ধার করা সম্ভব। আইন অনুযায়ী জাল বা ভুয়া দলিল বাতিল এবং নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠার সুনির্দিষ্ট উপায়গুলো নিচে তুলে ধরা হলো।
জমি-জমার চূড়ান্ত মালিকানা পেতে আইনি বাধার নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ড. পি. এম. সিরাজুল ইসলাম (সিরাজ প্রামাণিক)। তার রচিত ‘জমি-জমা নিয়ে আপনার যত আইনি সমস্যা ও তার আইনি সমাধান’ বইটির দ্বিতীয় অধ্যায়ের ১৫৬, ১৫৭ ও ১৫৮ নম্বর পৃষ্ঠায় ‘দলিল বাতিলের মামলা কেন, কখন, কোথায়, কিভাবে করবেন?’ শিরোনামে তিনি বিষয়টির বিশদ ব্যাখ্যা দিয়েছেন।

জাল দলিল ও প্রতিকার চাওয়ার অধিকার
কোনো ব্যক্তি যদি প্রতারণার উদ্দেশ্যে আপনার জমির ভুয়া, মিথ্যা বা সৃজিত দলিল তৈরি করে স্বত্ব কিংবা দখল হাসিল করতে চান, তবে ভুয়া দলিলের বিষয়টি উদঘাটনের তারিখ হতে নির্দিষ্ট মেয়াদের মধ্যে তা বাতিলের জন্য মামলা করতে পারেন। এখানে ভুয়া দলিল বলতে বোঝায়—যার দলিল করে দেওয়ার যোগ্যতা বা স্বত্ব ছিল না, যিনি দলিলটি প্রতারণা করে হাসিল করেছেন কিংবা যার দলিল জাল, সৃজিত, মিথ্যা ও বানোয়াটভাবে সম্পাদিত হয়েছে। এ ধরনের দলিল দ্বারা যার স্বত্ব বা স্বার্থ বিঘ্নিত হয়, তিনি ওই দলিল রহিতের জন্য মামলা দায়ের করতে পারবেন।
বাস্তব উদাহরণ
ধরুন, আপনি দীর্ঘদিন ধরে নিজের জমিতে ফসল ফলিয়ে ভোগদখল করে আসছেন। এমতাবস্থায় কুদৃষ্টি পড়ে প্রতিবেশী এক কৃষকের। আপনাকে জমি থেকে বেদখল করার উদ্দেশ্যে তিনি একটি জাল দলিল উপস্থাপন করলেন, যা তার নিজের নামেই তৈরি করা। কিন্তু দলিলটি যে সম্পূর্ণ মিথ্যা, জাল ও বানোয়াট তা স্পষ্ট। এ ক্ষেত্রে আপনাকে প্রতিকার চেয়ে আদালতের দ্বারস্থ হতে হবে।
বিচারক বিবাদীদের বিরুদ্ধে সমন জারি করবেন এবং উভয় পক্ষের বক্তব্য শুনে ও সাক্ষীর মাধ্যমে মামলার নিষ্পত্তি করবেন। আদালতে দলিলটি ভুয়া প্রমাণিত হলে আদালত বাতিল আদেশ বা রায় দেবেন। রায় পাওয়ার পর ডিক্রির একটি কপি সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে পাঠানো হবে এবং রেজিস্ট্রি অফিস বালাম বইতে দলিল বাতিলের বিষয়টি লিপিবদ্ধ করে রাখবে।

অপর একটি উদাহরণ দেওয়া যাক: রহিম মিয়া তার ১ একর জমি রিয়াজ সাহেবের কাছে ৫ মার্চ ২০১৮ তারিখে বিক্রয় করে জমি হস্তান্তর করেন। পরবর্তীতে রহিম মিয়া প্রতারণামূলকভাবে ২ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ তারিখের ব্যাকডেটে একটি জাল দলিল তৈরি করে জমিটি জাবেদ নামক ব্যক্তির কাছে বিক্রয়ের নাটক সাজান। এ ক্ষেত্রে রিয়াজ সাহেব আইনি প্রক্রিয়ায় জাবেদের জাল দলিলটি বিলুপ্ত বা বাতিল করাতে পারবেন।
সুনির্দিষ্ট প্রতিকার ও তামাদি আইন
প্রচলিত সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনের ৩৯ ধারা অনুযায়ী, কোনো দলিল বাতিল বা বাতিলযোগ্য মনে হলে এবং তা বহাল থাকলে গুরুতর ক্ষতির আশঙ্কা থাকলে বাতিল ঘোষণার মামলা করা যায়। ৪০ ধারা অনুসারে আংশিক দলিল সৃজিত হলে আংশিক বাতিলের মামলাও চলব। এর পাশাপাশি সম্পত্তির দখল পাওয়ার আবেদনও করা যায়।
তবে তামাদি আইনের ৯১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, জাল দলিলের বিষয়টি জানার তারিখ থেকে পরবর্তী ৩ বছরের মধ্যে মামলা রুজু করতে হবে। কোনো কারণে এই নির্ধারিত সময় পার হয়ে মামলা তামাদি হয়ে গেলে, সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনের ৪২ ধারা অনুযায়ী ‘ঘোষণামূলক মোকদ্দমা’ (ডিক্লারেশন মামলা) দায়ের করে প্রতিকার পাওয়ার আইনি সুযোগ রয়েছে।
আদালত ও কোর্ট ফি
ভুয়া দলিলের তফসিল যে থানার অধীনে অবস্থিত, মামলাটি সেই থানার আইনি অধিক্ষেত্রে করতে হবে। আদালতের আর্থিক অধিক্ষেত্র জমির মূল্যমানের ওপর নির্ভর করে:
১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত: সহকারী জজ আদালত
২৫ লাখ টাকা পর্যন্ত: সিনিয়র সহকারী জজ আদালত
২৫ লাখ টাকার ঊর্ধ্বে: যুগ্ম জেলা জজ আদালত
যদি বাদী ভুয়া দলিলের কারণে জমি থেকে বেদখল হন, তবে সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনের ৮ ধারা অনুযায়ী স্বত্ব সাব্যস্ত খাস দখলের মামলা এবং আরজিতে দলিল বাতিলের আবেদন করতে পারবেন। ৪২ ধারায় পৃথক ঘোষণাও চাওয়া যায়, যার জন্য অতিরিক্ত কোর্ট ফি দিতে হয়। বাতিলের আবেদনে সুনির্দিষ্ট মূল্য উল্লেখ না থাকলে বাদী নিজের ইচ্ছাধীন মূল্য নির্ধারণ করে আদালতের আর্থিক অধিক্ষেত্র নিরূপণ করতে পারেন। তবে সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনের ৩৯ ধারায় শুধু দলিল বাতিলের মামলায় কোর্ট ফি আইন, ১৮৭০-এর দ্বিতীয় তফসিলের ১২(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নির্দিষ্ট ৩০০ টাকা কোর্ট ফি দিতে হয়।

এছাড়া, সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনের ৪১ ধারা অনুযায়ী রায় প্রদানের সময় আদালত ন্যায়বিচারের স্বার্থে বিজয়ী পক্ষকে অপরের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ পাওয়ার নির্দেশও দিতে পারেন।
প্রমাণের দায় ও ফৌজদারি মামলা
সাক্ষ্য আইনের ১০১ ধারা এবং ২৬ ডিএলআর ৩৯২ অনুযায়ী, দলিলটি যে জাল বা জোরপূর্বক সম্পাদিত—তা প্রমাণের মূল দায়িত্ব বাদীর।
দেওয়ানি মামলার পাশাপাশি জাল দলিল তৈরিকারীদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি আদালতে দণ্ডবিধির ৪০৬, ৪২০, ৪৬৩-৪৭৩ ধারায় মামলা করা যায়। আমলী ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক সরাসরি অভিযোগ আমলে নিয়ে আসামির বিরুদ্ধে সমন বা গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করতে পারেন কিংবা পুলিশের মাধ্যমে তদন্তের নির্দেশ দিতে পারেন। অপরাধ প্রমাণিত হলে আসামির কারাদণ্ড হতে পারে।
তবে ফৌজদারি আদালতে কেবল অপরাধীর সাজা হয়, দলিল বাতিল হয় না। দলিলটি পুরোপুরি বাতিল করতে দেওয়ানি আদালতেই যেতে হবে। আইন অনুযায়ী একই ঘটনায় দেওয়ানি ও ফৌজদারি দুটি মামলাই পাশাপাশি চালানো সম্ভব (৫৭ ডিএলআর ৭২৭)।

ভুয়া দলিলের খপ্পরে পড়লে ভয় না পেয়ে দ্রুত অভিজ্ঞ আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়া উচিত। সময়মতো দেওয়ানি ও ফৌজদারি পদক্ষেপ নিলে জাল দলিল বাতিল হওয়ার পাশাপাশি নিজের জমির স্বত্ব ও দখল চিরতরে সুরক্ষিত থাকে।
লেখকের পরিচয়
ড. পি. এম. সিরাজুল ইসলাম পাঠকসমাজে ‘সিরাজ প্রামাণিক’ নামে পরিচিত। কলেজজীবন থেকেই তিনি সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত হন। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর তার কাজের পরিধি আরও বিস্তৃত হয়। তিনি দৈনিক যুগান্তর, দৈনিক সংবাদ, দৈনিক আমার দেশসহ বিভিন্ন জাতীয় ও স্থানীয় দৈনিক পত্রিকায় লিখেছেন।
সংবাদপত্রের সুবাদে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে বিভিন্ন সেমিনারে যোগ দিতে তিনি সার্কভুক্ত বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেছেন। গবেষণার কাজে কিছু সময় কাটিয়েছেন থাইল্যান্ডের চিয়াং মাই বিশ্ববিদ্যালয়ে। রাজধানী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পর ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে অধ্যাপক ড. মো. শাহজাহান মণ্ডলের তত্ত্বাবধানে উচ্চতর গবেষণা করেন।

তার গবেষণার বিষয় ছিল, ‘Right to life and personal liberty in Bangladesh with special reference to extra-judicial killing.’ লেখকের আইনবিষয়ক বিভিন্ন নিবন্ধ দেশের জাতীয় দৈনিকগুলোতে প্রকাশিত হয়েছে। তিনি আইনবিষয়ক একাধিক গ্রন্থ রচনা করেছেন। তাঁর বেশ কিছু গ্রন্থ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে রেফারেন্স গ্রন্থ হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে বলে বইয়ের লেখক পরিচিতিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
তার প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে—‘পকেট আইন’, ‘আইনে আপনার যত অধিকার’, ‘২২টি আইনের সহজ পাঠ’, ‘জমি ক্রয়-বিক্রয় আইন’, ‘জমি জমার আইন-কানুন ও আলোচনা’, ‘রেজিস্ট্রেশন অ্যাক্ট অ্যান্ড ডিড রাইটিং’, ‘উইথ মডেল’, ‘রিয়াদ আইন’, ‘বিয়ে-তালাক-দেনমোহর-ভরণপোষণ ও নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন’, ‘সংবাদপত্র বিষয়ে আইন’, ‘কম্পিউটার অপরাধ আইন’, ‘ফৌজদারি মামলা পিটিশন পদ্ধতি’, ‘পারিবারিক আইন’, ‘নাগরিক অধিকার আইন’, ‘লিগ্যাল নোটিশ অ্যান্ড অ্যাফিডেভিট লেখার পদ্ধতি’, ‘প্রাত্যহিক জীবনে আইন’, ‘উত্তরাধিকার আইন’ ও ‘ওয়াক্ফ’ প্রভৃতি।


