logo
Advertisement

নুসরাতের গায়ে আগুন লাগার রহস্য থেকেই গেল: শিশির মনির

এশিয়া পোস্ট নিউজ
নুসরাতের গায়ে আগুন লাগার রহস্য থেকেই গেল: শিশির মনির
নুসরাত হত্যা মামলার রায়ের পর কথা বলেন অ্যাডভোকেট শিশির মনির। ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া

ফেনীর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে কীভাবে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়েছিল, তা নিয়ে এখনও রহস্য রয়ে গেছে বলে মন্তব্য করেছেন আইনজীবী অ্যাডভোকেট শিশির মনির।

Advertisement

সোমবার (২৪ আগস্ট) নুসরাত হত্যা মামলার ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের শুনানি শেষে সাংবাদিকদের তিনি এ কথা বলেন।

শিশির মনির বলেন, নুসরাত মৃত্যুর আগে দেওয়া জবানবন্দিতে চারজন নারীর কথা বলেছিলেন। আর সাজার সময় একজন নারী পাওয়া গেল, বাকি তিনজন পুরুষ হয়ে গেল কী করে? এটা রহস্য থেকে থেকে গেল। আর নুসরাতের সাইক্লোন সেন্টারের তিন তলার উপরে নুসরাতের গায়ে কীভাবে সেখানে আগুন লাগাল? কেউই শুনল না, আশপাশের কেউ জানল না, কেউ শব্দ পেল না—একা একা কী আগুন লেগে গেল? এই অংশের রহস্য থেকেই গেল।

নুসরাত হত্যা মামলাটি চাঞ্চল্যকর উল্লেখ করে এই আইনজীবী বলেন, বিচারিক আদালত এ মামলায় ১৬ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিলেন। তাদের মধ্যে ১২ জনের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি ছিল এবং চারজনের কোনো স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি ছিল না।

তিনি বলেন, ডেথ রেফারেন্সের শুনানি শেষে হাইকোর্ট ১০ আসামিকে বেকসুর খালাস দিয়েছেন, চারজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন এবং দুজনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখেছেন।

শিশির মনির আরও বলেন, বিচারিক আদালতের রায়ে নির্বিচারে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার বিষয়টি হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণে এসেছে। এতে সংশ্লিষ্ট পরিবারগুলোর ওপর ‘বিধ্বংসী প্রভাব’ পড়েছে বলেও আদালত মন্তব্য করেছেন বলে জানান তিনি। একই সঙ্গে ওই বিচারকের বিচারিক ক্ষমতা কেড়ে নিয়ে তাকে আইন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।

শিশির মনির জানান, এ মামলায় তিনি তিনজন আসামির আইনজীবী ছিলেন। তারা হলেন—কামরুন নাহার মনি, সাইফুর রহমান জুবায়ের ও মোহাম্মদ শামীম। তাদের মধ্যে মনি ও মোহাম্মদ শামীম খালাস পেয়েছেন। সাইফুর রহমান জুবায়েরকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

জুবায়েরের পক্ষে উচ্চ আদালতে আপিল করার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, আমরা জুবায়েরের জন্য উচ্চ আদালতে আপিল করব।

মামলার ঘটনাস্থলে সিসিটিভি ক্যামেরা থাকার বিষয়টি তুলে ধরে শিশির মনির বলেন, আমরা আদালতে একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি যুক্তি তুলে ধরেছিলাম, রাষ্ট্রপক্ষ তার জবাব দেয়নি। ছয় বছর আগেও সেখানে সিসিটিভি ক্যামেরা ছিল। কিন্তু তদন্ত কর্মকর্তা বা প্রসিকিউশন সেই ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করে আদালতে উপস্থাপন করেনি।

ঘটনাস্থলে একটা সিসিটিভি ক্যামেরা ছিল। এই সিসিটিভি ক্যামেরার ছবি আজও সেখানে আছে। ছয় বছর আগেও সেখানে সিসিটিভি ক্যামেরা ছিল। কিন্তু প্রসিকিউশন বা তদন্ত কর্মকর্তা ওই সিসিটিভি ক্যামেরাও জব্দ করেনি। সিসিটিভি ক্যামেরাটাকে আদালতের সামনে উপস্থাপনও করেনি। এই ঘটনাস্থলে থাকা সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ যদি আদালতের সামনে আসতো সুনির্দিষ্টভাবে বোঝা যেত কে কাকে কোথায় কি করেছে, কীভাবে কে কাকে মেরেছে কিংবা মারেনি। সিসিটিভি ফুটেজ পাওয়া গেলে মামলার মূল ভিত্তি ও আসামিপক্ষের যুক্তি ভিন্ন হতে পারত।

শিশির মনির বলেন, কিন্তু একটা রহস্য থেকে গেল যে তিন তালার উপরে সাইক্লোন সেন্টারে নুসরাতের গায়ে কি করে আগুন লাগলো কেউই শুনল না, আশপাশের লোক কেউ জানল না, কেউ শব্দ পেল না একা একা আগুন লেগে গেল- এই পার্টটুকুর রহস্য এখানে থেকেই গেল। ফলে আমরা এর বিরুদ্ধে আপিল করব। আমরা আশা করি আপিল বিভাগে গিয়ে এই রহস্যের উন্মোচন হবে।

শিশির মনির বলেন, নুসরাতের মৃত্যুকালীন জবানবন্দির যে অডিও এবং ভিডিও রয়েছে হাইকোর্টে সেটি উপস্থাপনের জন্য তারা আবেদন করেছিলেন। ওই ভিডিও সরাসরি দেখলে নুসরাত আসলে কী বলেছিলেন এবং কী বলেননি, তা স্পষ্টভাবে বোঝা যেত।

শিশির মনিরের দাবি, মৃত্যুকালীন জবানবন্দিতে চারজন বোরকা পরা নারীর কথা বলা হলেও পরবর্তী মামলায় তাদের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ আসামি পাওয়া যায়নি।

নুসরাতের মৃত্যুকালীন জবানবন্দিতে চারজন বোরকা পরা নারীর কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু মামলায় সাজাপ্রাপ্তদের মধ্যে তিনজন পুরুষ ও একজন নারী। ফলে জবানবন্দিতে বলা চার নারীর সঙ্গে মামলার আসামিদের মিল না থাকার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন থেকে গেছে। সাইফুর রহমান জুবায়েরের আপিলের মাধ্যমে ন্যায়বিচার পাওয়ার আশা প্রকাশ করেন আসামিপক্ষের এই আইনজীবী।

উল্লেখ্য, ফেনীর বহুল আলোচিত মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলায় আসামিদের ডেথ রেফারেন্স, আসামিদের আপিল ও জেল আপিলের রায় ঘোষণা হয়েছে। এতে আগে মৃতুদণ্ডপ্রাপ্ত ১৬ আসামির মধ্যে ২ জনের মৃত্যুদণ্ড বহাল, ৪ জনের সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন ও ১০ জনকে খালাস দেন।

সোমবার বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি কে এম রাশেদুজ্জামান রাজার হাইকোর্ট বেঞ্চ আলোচিত এ মামলার রায় দেন। রায়ে যে দুজনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখা হয়েছে তারা হলেন- সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদরাসার সাবেক অধ্যক্ষ এস এম সিরাজ-উদ-দৌলা ও শাহাদাত হোসেন শামীম।

আর সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন দেওয়া হয়েছে চার আসামিকে। তারা হলেন- সাইফুর রহমান জুবায়ের, উম্মে সুলতানা পপি, নুর উদ্দীন ও সাখাওয়াত হোসেন জাবেদ।

এই মামলায় খালাস পাওয়া ১০ জন হলেন- সোনাগাজী পৌর আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মাকসুদ আলম ওরফে মোকসুদ কাউন্সিলর, হাফেজ আব্দুল কাদের, আবছার উদ্দিন, কামরুন নাহার মনি, আব্দুর রহিম শরীফ, ইফতেখার উদ্দিন রানা, ইমরান হোসেন ওরফে মামুন, সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও মাদরাসার সাবেক সহ-সভাপতি রুহুল আমিন, মহিউদ্দিন শাকিল ও মোহাম্মদ শামীম।

আদালতে আসামিদের পক্ষে ছিলেন অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির, অ্যাডভোকেট এস এম শাহজাহান, ব্যারিস্টার মাসুদ হোসেন দোলন। আর রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল, ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল সৈয়দ ইজাজ কবির।