মুসলিম উত্তরাধিকার আইনের উৎস কী

অনেকেরই উত্তরাধিকার সংক্রান্ত দরকারি জ্ঞানটুকু নেই। উত্তরাধিকার বিষয়ে আমাদের অঞ্চলে অনেক অজ্ঞতা এবং কুসংস্কার প্রচলিত রয়েছে। ফলে মৃতের সম্পদ বণ্টনের সময় কাউকে অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়। কাউকে আবার সম্পদের হকদারই মনে করা হয় না। উত্তরাধিকার বা মিরাস সংক্রান্ত প্রচলিত অজ্ঞতা এবং কুসংস্কার দূর করা জরুরি। এ জন্য জানতে হবে উত্তরাধিকার আইনের উৎস কী।
এসব বিষয় নিয়ে ‘ফারায়েজ আইন’ শীর্ষক একটি বই লিখেছেন গাজী শামসুর রহমান। বইটির প্রথম অধ্যায়ের ২ থেকে ৬ নম্বর পৃষ্ঠায় ‘উত্তরাধিকার আইনের উৎস’ নিয়ে আলোচনা করেছেন তিনি।
উত্তরাধিকার আইনের উৎস চারটি
সকল ইসলামি আইনের মতো ফারায়েজের উৎস চারটি। যথা—কোরআন, হাদিস, ইজমা ও কিয়াস।
উত্তরাধিকার আইনের প্রথম উৎস কোরআন
উত্তরাধিকার আইনের প্রথম, প্রধান এবং শ্রেষ্ঠতম উৎস কোরআন। কোরআনে এ সম্পর্কে অতি স্পষ্ট আদেশ-নির্দেশ বিদ্যমান এবং এগুলো সব মুসলিম মানতে বাধ্য। প্রসঙ্গত স্মরণ রাখা উচিত, এ আদেশ-নির্দেশের অর্থ বা ব্যাখ্যা করার অধিকার সবার আছে; কিন্তু কোনো মুমিন-মুসলিম এ আদেশ-নির্দেশের প্রয়োজনীয়তা ও উপযোগিতা যাচাই করার অধিকার রাখেন না।

কোরআনের ব্যাখ্যা কঠিন কাজ। এ সম্পর্কে কয়েকটা বিশেষ সূত্রের উল্লেখ করছি। ক. যে আরবি ভাষায় কোরআন নাজিল হয়েছে, তার মৌলিক শব্দাবলির ধাতুগত অর্থ এত ব্যাপক এবং সদূরপ্রসারী যে, আধুনিক ভাষায় সেগুলোকে প্রকাশ করতে হলে আরবি একটা শব্দের পরিবর্তে অনেক শব্দ, এমনকি অনেক বাক্য ব্যবহার করতে হয়। আরবি ভাষায় একেকটা মৌলিক শব্দ যেন একেকটা ভাবের পাহাড়। যতই তার কাছে যাওয়া যায়, ততই বেশি তা নজরে পড়ে। উদাহরণস্বরূপ ফারায়েজবিষয়ক একটি আয়াতের ‘কালালা’ শব্দের উল্লেখ করা যেতে পারে। এ শব্দটা নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে। বাংলা একটি শব্দে এর অর্থ করা যায় না।
খ. কোরআনের আইনের ব্যাখ্যা ও প্রয়োগের সময় পুরো কিতাব বিবেচনা করা প্রয়োজন। কোনো বিশেষ আয়াতকে পৃথকভাবে গ্রহণ করে তার অর্থ করতে গেলে বিপত্তির সম্ভাবনা সমধিক। কোনো একটা বিশেষ আয়াতের সে অর্থটিই গ্রহণযোগ্য, যেটা সমগ্র কিতাবের সঙ্গে সুসমঞ্জস।
গ. কোরআনের কোনো বিশেষ বিধির অর্থ করার সময় যে অবস্থায় সেই বিধি নাজিল হয়েছিল, তা বিবেচনা করা প্রয়োজন। বিশেষভাবে বিবেচনার অধীনে আনা দরকার—
- বিবেচনাধীন নির্দেশ নাজিল হওয়ার আগে সে সম্পর্কে কোন আইন বলবৎ ছিল?
- পূর্ব প্রচলিত বিধিকে রদ করার কি প্রয়োজন সে সময় ঘটেছিল?
- কি পরিবর্তন কোরআনের বিধিতে আনার ব্যবস্থা করা হয়েছিল?
এই তিনটি কঠিন প্রশ্নের জবাব জানতে হলে তৎকালীন ও ইসলামপূর্ব সমগ্র ইতিহাস, সমাজ ব্যবস্থা ও রীতিনীতি সম্পর্কে প্রচুর জ্ঞান থাকা প্রয়োজন।

ঘ. কোরআনের আইনের নির্দেশগুলোর মধ্যে যেগুলো নিষেধাত্মক, হানাফি মাজহাবের মতে, সেগুলো অনুমতিজ্ঞাপক নির্দেশের ওপর স্থান পাবে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় যে, বাদীদের পাণিগ্রহণ করার অনুমতির আইন যেখানে কোরআনে বর্ণনা করা হয়েছে, সেখানে একত্রে দুই বোনকে বিয়ের নিষেধের উল্লেখ নেই, অথচ কোরআনে আরেক জায়গায় বলা হয়েছে, একত্রে দুই বোনের পাণিগ্রহণ নিষিদ্ধ। এ অবস্থায় বাদীদের মধ্যেও দুই বোনকে একসঙ্গে বিয়ে করা নিষিদ্ধ।
ঙ. আরবি ভাষায় যেহেতু দ্বিবচন আছে, সেহেতু এই ভাষায় বহুবচন অর্থে অন্তত তিনজন বুঝায়। উত্তরাধিকার ও ওসিয়তনামার ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রম আছে। কোরআনে যেখানে ‘ভাইয়েরা’ বলা হয়েছে, উত্তরাধিকারের বেলায় সেখানে দুজন বা ততোধিক বুঝায়।
চ. কোরআনে যেখানে হুকুমাত্মক শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে, সেখানে হানাফি মাজহাবের মতে সেই নির্দেশটিকে অবশ্য পালনীয় হিসেবে গ্রহণ করতে হবে।
উত্তরাধিকার আইনের দ্বিতীয় উৎস সুন্নাহ
ইসলামি উত্তরাধিকার আইনের দ্বিতীয় প্রধান উৎস হচ্ছে সুন্নাহ বা রাসুলুল্লাহর (স.) জীবনধারার সর্বতোমুখী ও পূর্ণাঙ্গ বিবরণপঞ্জী। রাসুলুল্লাহর দীর্ঘ তেইশ বৎসরব্যাপী নবীজীবনের সর্বকর্ম, কথোপকথন, অনুমোদন, অসম্মতি, উৎসাহ বা বিরক্তির সমাহারকে একত্রে ‘সুন্নাহ’ বলা যায়। যে অমৃতবচন তাঁর পূত মুখ থেকে নিঃসৃত হয়েছে, যে কর্মাবলি তাঁর পবিত্র অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দ্বারা সম্পাদিত হয়েছে এবং যে কথা ও কাজ তাঁর অনুমোদন লাভ করেছে, তার সবগুলোই সুন্নাহর উপাদান।

সুন্নাহর সাহায্য ছাড়া আইনের পথে অগ্রসর হওয়া অসম্ভব; এমনকি, ধর্মীয় আচার-পদ্ধতির বেলায়ও সুন্নাহ ছাড়া পূর্ণ জ্ঞান সম্ভব নয়। স্পষ্টতই আইনের উৎস হিসেবে সুন্নাহর গুরুত্ব অপরিসীম; কিন্তু পবিত্র কোরআনের প্রতিটি আইন ও আদেশ যেমনভাবে প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত সমস্ত কালের ভ্রূকুটিকে উপেক্ষা করে অক্ষয় ও অক্ষত রয়ে গেছে, সুন্নাহর বেলায় ঐতিহাসিক কারণে ঠিক তেমনটি হতে পারেনি।
রাসুলুল্লাহর মৃত্যুর পর যেসব মামলা-মোকদ্দমা সমাধান ও নিষ্পত্তির জন্য পেশ হতে লাগল, সেগুলোতে প্রযোজ্য আইনের জন্য প্রথমেই স্বাভাবিকভাবে আশ্রয় নেওয়া হলো পবিত্র কোরআনের। কোরআন যেখানে নীরব, সেখানে এই উপস্থিত প্রশ্ন বা মামলা সম্পর্কে কোন আদেশ, কোন রায়, কোন অভিমত বা কোন ইঙ্গিত রাসুলুল্লাহ দিয়েছেন কিনা, তা বিবেচনা করা হতে লাগল। এভাবে আইনের উৎস হিসেবে সুন্নাহ আপন স্থান প্রতিষ্ঠিত করে নিল। ক্রমে এমন অনেক মোকদ্দমা উপস্থিত হতে লাগল, যেগুলো আনয়ন করা হতো কোনো বিশেষ সুন্নাহর ওপর ভিত্তি করে। সেক্ষেত্রে সুন্নাহর সত্যতা নিরূপণ করে তার পরে সেই ভিত্তিতে রায় দেয়া হতে লাগল।
উদাহরণ দিয়ে ব্যাখ্যা
হজরত আবু বকর (রা.)-এর কাছে এক মৃত ব্যক্তির দাদি এসে উত্তারাধিকার দাবি করেন। আবু বকর (রা.) তাকে জানালেন যে, পবিত্র কোরআন কিংবা সুন্নায় এমন কোনো নির্দেশ আছে বলে তার জানা নেই, যাতে করে দাদি ওয়ারিস হতে পারেন। তবে তিনি এ ব্যাপারে সুন্নাহর সন্ধান করবেন। মুগিরা নামক এক সাহাবির কাছ থেকে তিনি জানতে পারলেন যে, রাসুল (সা.) পিতামহীকে সম্পত্তির এক-ষষ্ঠাংশ দিয়েছিলেন। আবু বকর (রা.) এ ব্যাপারে সাক্ষ্য চাইলে মুহাম্মদ ইবনে মাসলামাহ মুগীরার কথার সত্যতা অনুসারেই অভিমত প্রদান করেছিলেন।
আবার নবী-নন্দিনী হজরত ফাতেমা (রা.) একবার দাবি করেন, তিনি তাঁর পিতার সম্পদের ওয়ারিস; কিন্তু এর উত্তরে হযরত আবু বকর (রা.) রাসুলুল্লাহর পবিত্র বাণী ‘আমরা, নবীরা কোনো সম্পদ ওয়ারিসদের জন্য রেখে যাই না; আমাদের যা থাকে, তা অবশ্যই খয়রাতের জন্য’ আবৃত্তি করলেন। এই হাদিসের সত্যতা সম্পর্কে কেউ প্রশ্ন করল না। হযরত ফাতেমা (রা.)-এর দাবি অগ্রাহ্য করা হলো।

উত্তরাধিকার আইনের তৃতীয় উৎস ইজমা
ইজমা শব্দের শাব্দিক অর্থ ঐকমত্য। আর ব্যুৎপত্তিগত মৌলিক অর্থ হলো ছড়িয়ে থাকা জিনিসের একত্রীকরণ এবং বিতর্কিত প্রশ্নের সমাধানে ঐক্যমত পোষণ। মুসলিম আইন মনীষীদের মতে, যখন একটা বিশেষ দেশে বিশেষ যুগে একটা প্রশ্নের সমাধানে মুসলিম মুজতাহিদরা একমত হন, তখনই হয় ‘ইজমা’। মুজতাহিদরা তাদের ঐকমত্যের ভিত্তিতে যখন সিদ্ধান্ত গ্রহণ বা জ্ঞাপন করেন কিংবা সম্মিলিতভাবে কোনো কাজ সমাধা করেন, অথবা পুনঃপুনঃ সংঘটিত কোন কাজে বা কথায় নীরব সমর্থন জ্ঞাপন করেন, তখনই হয় সেটা ইজমা। ইজমাতে অংশগ্রহণকারীদের অবশ্যই ‘মুজতাহিদ’ হওয়া প্রয়োজন।
মুজতাহিদ হলো যিনি নিজের বিবেক-বুদ্ধিকে অধ্যবসায় ও আন্তরিকতার সঙ্গে কাজে লাগিয়ে কোরআন ও হাদিসের আওতার মধ্যে থেকে স্বাধীনভাবে কোনো জটিল ও কূট প্রশ্নের সমাধান করতে সক্ষম।

ইজমা সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে একটা আপাতবিরোধী সমস্যা আমাদের সামনে উপস্থিত হয়। বলা যেতে পারে যে, ইসলামি আইন একটি আল্লাহপ্রদত্ত আইন এবং এতে মানুষের তৈরি আইন বা ইজমার কোনো জায়গা থাকা সঙ্গত নয়। প্রকৃতপক্ষে কোরআন ও হাদিসে অসংখ্য নির্দেশ ও উপদেশ আছে, যাতে বোঝা যায় যে, আল্লাহ আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ আইন প্রণয়নের অধিকার এবং দায়িত্ব সমগ্র সমাজের।
কোরআনে বারবার এসেছে, ‘তোমরা কি চিন্তা কর না?’ ‘তোমরা কি বুঝ না?’ ‘তোমাদের কি জ্ঞান নেই?’ ইত্যাদি। কোরআনে অলস মনের মানুষকে জানোয়ার বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে এবং বলা হয়েছে, তারা জানোয়ারেরও অধম। ‘তাদের অন্তর আছে, তা দিয়ে হৃদয়ঙ্গম করতে পারে না; এবং তাদের চোখ আছে, তা দিয়ে দেখতে পায় না এবং তাদের কান আছে, তা দিয়ে শুনতে পায় না, ওরা চতুস্পদতুল্য বরং ওরা তদপেক্ষাও বিভ্রান্ত, ওরা তারাই, যারা অমনোযোগী।’ (সুরা আরাফ, আয়াত: ১৭৯)
আরেক আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয় আল্লাহর কাছে সেইসব মুক, বধির, বিচরণশীল জীব নিকৃষ্টত যারা হৃদয়ঙ্গম করতে পারে না।’ (সুরা আনফাল, আয়াত: ২২)
বহুল উদ্ধৃত একটা হাদিস ইজতিহাদের সমর্থক। মুয়াজ গভর্নর নিযুক্ত হওয়ার পর যখন বললেন যে, কোরআন ও সুন্নাহ থেকে তিনি যদি কোনো সমস্যার সমাধা খুঁজে না পান, তবে ‘আমি ইজতিহাদ করব’, তখন রাসুলুল্লাহ হাত তুলে বলেছিলেন, ‘আলহামদু লিল্লাহ।’
ইসলামি আইনের প্রয়োগ ও উপযোগিতা এ দ্বারাই প্রমাণিত হয়, ইসলাম আল্লাহপ্রদত্ত আইনের মধ্যে মানবিক আইন প্রণয়নের মৌলিক অধিকারও স্বীকার করে।

উত্তরাধিকার আইনের চতুর্থ উৎস কিয়াস
কিয়াস বলতে কোরআন, সুন্নাহ বা ইজমায় পাওয়া যায়, এমন সমস্যা এবং তার সমাধানের সঙ্গে সঙ্গে নতুন সমস্যার সামঞ্জস্য বিবেচনা করা এবং সামঞ্জস্য থাকলে নতুন সমস্যায় সেই পুরাতন সমাধান প্রবর্তন করাকে বোঝায়। ফকিহদের অভিমত হলো, কোরআন ও সুন্নাহ বা ইজমায় যে আইন পাওয়া যায়, তার কারণ অনুসন্ধান করতে হবে এবং সে কারণ যদি এ নতুন সমস্যায় বিদ্যমান থাকে, তবে পুরাতন আইন প্রবর্তন করতে হবে।
কিয়াসের অনুমতি কোরআন ও সুন্নাহ হতে বিদ্যমান। কোরআনে আল্লাহ তায়ালা বহু জাতির উত্থান-পতন এবং নাফরমানি ও শাস্তির উল্লেখ করেছেন এবং আরবের কাফির ও মুনাফিকদের তা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতে বলেছেন। এ নির্দেশের তাৎপর্য এই যে, কাফেররা নিজেদের অবস্থাকে শাস্তিপ্রাপ্ত লোকদের ওপর কিয়াস করবে এবং ধরে নেবে যে, বর্তমান কাফেরদের অবস্থা যদি পুরানো দিনের কাফেরদের অনুরূপ হয়, তাহলে বর্তমান কাফেরদের ওপর অনুরূপ শাস্তি আসবে।
শরিয়তের উৎসসমূহের মধ্যে কিয়াসের স্থান চতুর্থ হলেও ইজতিহাদের প্রধান পন্থা হিসেবে এর প্রভাব অতি বিপুল। কারণ, মানবজীবনের ঘটনাবলি সীমাহীন, অথচ কোরআন ও সুন্নাহ থেকে আইনের যেসব ধারা বিদ্যমান, সেসব স্বাভাবিকভাবে সীমাবদ্ধ। তাই জীবনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই প্রত্যেক যুগে কিয়াসের আবশ্যকতা দেখা দিয়েছে। এক কথায় কিয়াসকে ইসলামি আইনের জীবনী-শক্তি বলা যায়।
লেখকের পরিচয়
গাজী শামছুর রহমান (১৯২১-১৯৯৮) বাংলাদেশি আইনবিদ ও আইন সংস্কারক, বিচারক, ভাষাবিদ এবং টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব। তিনি বাংলায় আইনবিষয়ক গ্রন্থ রচনায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। তার রচিত বইয়ের সংখ্যা শতাধিক। তিনি ১৯৮৫ সালে একুশে পদক পান। তিনি জেলা জজ ছিলেন। সরকারের যুগ্ম সচিব হিসেবে তিনি চাকরি থেকে অবসর গ্রহণ করেন। এ ছাড়া বাংলাদেশ প্রেস ইনস্টিটিউট ও বাংলা একাডেমির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্বরত ছিলেন কিছুদিন।



