মৃতের সম্পত্তি কে পাবে, কে বঞ্চিত হবে

আমাদের সমাজে উত্তরাধিকার সম্পত্তি নিয়ে প্রায়ই বাকবিতণ্ডা হয়। কখনো কখনো ঝগড়া হয় আপনজনদের মধ্যে। মৃতের সম্পত্তি কে পাবে আর কে পাবে না—এ নিয়েও দেখা দেয় নানা মতভেদ। নানা অজুহাতে কাউকে কাউকে সম্পদ থেকে বঞ্চিত পর্যন্ত করা হয়। কেউ আবার জোর করে নিজেকে উত্তরাধিকার দাবি করে সম্পত্তি নিতে চায়।
মৃতের সম্পদ কে পাবে আর কে বঞ্চিত হবে, এ বিষয়ে সঠিক ধারণা থাকলে ঝগড়া এড়িয়ে চলা সম্ভব। সুষ্ঠুমতে মৃতের সম্পত্তি উত্তরাধিকারদের মধ্যে বণ্টনও করা যায়। মৃত ব্যক্তির সম্পত্তি কে পাবে আর কে বঞ্চিত হবে, বঞ্চিত হওয়ার কারণগুলো কি, ত্যাজ্য পুত্র-কন্যাদের সম্পত্তি প্রাপ্তিতে আইনি বাধা, নারীদের সম্পত্তিতে অংশ বিষয়ক আইনি আলোচনা নিয়ে বই লিখেছেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ড. পি. এম. সিরাজুল ইসলাম (সিরাজ প্রামাণিক)। বইয়ের নাম ‘জমি-জমা নিয়ে আপনার যত আইনি সমস্যা ও তার আইনি সমাধান’। বইটির দ্বিতীয় অধ্যায়ের ৩৯ ও ৪০ নম্বর পৃষ্ঠায় ‘সম্পত্তি কে পাবে, কে বঞ্চিত হবে’ বিষয়ে আলোচনা করেছেন তিনি।
মৃতের সম্পত্তি কে পাবে, কে পাবে না
বইটিতে লেখা হয়েছে, ‘ইসলামে সম্পত্তির সুষ্ঠু নীতিমালার কথা যেমন বলা হয়েছে, তেমনি কোন কোন প্রেক্ষাপটে কী কী কারণে সম্পত্তির উত্তরাধিকার থেকে ওয়ারিশদেরকে বঞ্চিত করা যাবে সে সম্পর্কেও সুনির্দিষ্ট বক্তব্য রয়েছে। কারণগুলো হলো—
১. ছেলে যদি বাবাকে অথবা যেকোনো উত্তরাধিকারী যদি সম্পত্তির মালিককে ইচ্ছাকৃত বা ভুলবশত হত্যা করে তবে হত্যাকারী নিহতের সম্পত্তিতে উত্তরাধিকার পাবে না।
২. একজন মুসলিম কোনো অমুসলিমের সম্পত্তিতে উত্তরাধিকার পাবে না।
৩. ইসলাম ত্যাগকারী, মুরতাদ হয়ে গেলে সে তার মুসলিম আত্মীয়ের সম্পত্তির উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত হবে।
৪. মৃত্যুর সময় তথা কে আগে বা কে পরে মারা গেছে, তার সঠিক তথ্য জানা না থাকাও উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ার অন্যতম কারণ।’

উদাহরণ দিয়ে ব্যাখ্যা
উল্লিখিত চার নম্বর বিষয়টি উদাহরণ দিয়ে বুঝিয়েছেন লেখক। তিনি লিখেছেন, ‘যেমন জাহাজ ডুবি অথবা কোনো দালান থেকে পড়ে বহু লোক একত্রে মারা গেল। এমতাবস্থায় নিহত ব্যক্তিরা একজন অপরজনের সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত হবে। এখানে মনে করতে হবে সবাই একসঙ্গে মারা গেছে। সুতরাং তাদের সম্পত্তি জীবিত উত্তরাধিকারীদের মধ্যে ফারায়েজ (উত্তরাধিকারী) মোতাবেক বণ্টিত হবে।’
ভিন্ন ধর্মের কাউকে বিয়ে করলে উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত হয় না জানিয়ে বইয়ে লেখা হয়েছে, ‘স্বধর্ম ত্যাগ না করে ভিন্ন ধর্মের কাউকে বিয়ে করলে উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত হবে না। একইভাবে সৎ বাবা বা সৎ মা, সৎ ছেলে-মেয়েরা সম্পত্তি পায় না। অনুরুপভাবে মুসলিম সন্তানও তার বিধর্মী বাবা-মায়ের উত্তরাধিকার পাবে না। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিবাহ বিচ্ছেদ হলে কেউ কারও সম্পত্তি পাবে না। জারজ সন্তান পিতার উত্তরাধিকারী হয় না, কিন্তু তার মা ও মায়ের আত্মীয়দের থেকে সম্পত্তি সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী পাবে (মুসলিম হানাফি আইন অনুসারে)।’
পাগল কি সম্পত্তি পাবে
মানসিক ভারসাম্যহীন বা পাগল সম্পত্তি পাবে কি না, এ বিষয়ে বইয়ে লেখা আছে, ‘শরিয়া আইনে শারীরিক কিংবা মানসিক ভারসাম্যহীনতার কারণে কাউকে সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করার কোনো সুযোগ নেই। তবে মানসিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তি যেহেতু তার সম্পত্তির ব্যবস্থাপনা ঠিকমতো করার সক্ষমতা রাখে না, তাই তার সম্পত্তি তার কল্যাণে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার উদ্দেশ্যে একজন অভিভাবক নিযুক্ত করার বিধান রয়েছে। আদালতের মধ্য দিয়ে এই অভিভাবক নিযুক্ত করা যায়।’

সম্পত্তিতে দত্তক সন্তানের অংশ আছে?
ইসলামি আইনে যেহেতু দত্তক সন্তান গ্রহণের বিধান নেই। কাজেই দত্তক সন্তান উত্তরাধিকার পাবে না। তবে সম্পদের মালিক যে কেউ তার অধীনে থাকা পোষ্য বা পালিত সন্তানের নিরাপত্তায় জীবিতাবস্থায় সম্পদ দান করতে পারেন; এমনকি সব সম্পদও। সম্পদ কেনার সময়েই পোষ্যর নামে কিনতে পারেন।
সন্তানকে ত্যাজ্য করে সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করা যাবে?
ত্যাজ্যপুত্র একটি ভ্রান্ত ধারণা উল্লেখ করে সিরাজ প্রামাণিক লিখেছেন, ‘বাংলাদেশের কোনো আইনে কিংবা বিধিতে উল্লেখ নেই। কাজেই সন্তানদের ওপর রাগের বশবর্তী হয়ে বাবা-মা কোর্টে গিয়ে মামলা করা সম্পত্তির অধিকার ফিরে পেতে পারেন। নোটারি পাবলিকের সামনে ২০০ টাকার নন জুডিসিয়াল স্ট্যাম্পে হলফনামা দিয়ে সব প্রকার সম্পর্ক ছেদ ও সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করার ঘোষণাকে অনেক ত্যাজ্য হিসেবে চিহ্নিত করেন। এ রকম ঘোষণা দেওয়ায় বাবার মৃত্যুর পর অন্য উত্তরাধিকারিরা সম্পত্তি বণ্টনের সময় পক্ষপাতমূলক বা ভুল সিদ্ধান্ত দিতে দেখা যায়। তবে ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষ ১৮৯৩ সালের বাটোয়ারা আইনে কোর্ট ফি দিয়ে দেওয়ানি আদালতে বাটোয়ারা মামলা করা সম্পত্তির অধিকার ফিরে পেতে পারেন।’
মৃতের উত্তরাধিকার না থাকলে কী হবে
বইয়ে লেখা আছে, ‘মৃত ব্যক্তির কোনো উত্তরাধিকার না থাকলে এবং তা তিনি জীবিতকালে কাউকে না দেওয়ার ব্যবস্থা করে গেলে সরকার তার পরিত্যক্ত সম্পত্তির ওয়ারিশ হবে।’

সম্পত্তি বণ্টনের আগে করণীয়
ইসলামি আইনে কোনো মুসলমান মারা গেলে তার সম্পত্তি বণ্টনের আগে কিছু আনুষ্ঠানিকতা পালন করতে হয় জানিয়ে বইয়ে লেখা আছে—‘১. মৃত ব্যক্তির পর্যাপ্ত সম্পত্তি থাকলে সেখান থেকে তার দাফন-কাফনের যাবতীয় খরচ মেটাতে হবে। ২. জীবিত থাকা অবস্থায় কোনো ধারদেনা করে থাকলে তাও রেখে যাওয়া সম্পত্তি থেকে পরিশোধ করে দিতে হবে। ৩. তার স্ত্রী বা স্ত্রীদের দেনমোহর পরিশোধিত না হয়ে থাকলে বা আংশিক অপরিশোধিত থাকলে তা পরিশোধ করে দিতে হবে। মোটকথা স্ত্রীর সম্পূর্ণ দেনমোহর স্বামী মৃত অথবা জীবিত যাই থাকুন না কেন—তা স্বামীর সম্পত্তি থেকে আইন অনুযায়ী সম্পূর্ণ পরিশোধ করতে হবে। ৪. মৃত ব্যক্তি কোনো উইল বা অসিয়ত করে গেলে তা পালন করতে হবে।’
সম্পত্তিতে নারীর অধিকার
ইসলাম সম্পত্তিতে নারীর উত্তরাধিকার নিশ্চিত করেছে উল্লেখ করে বইয়ে লেখা আছে, ‘১৮৮২ সলের Married Women’s Property Act.-এর আগে ব্রিটিশ আইনে নারীর সম্পত্তিতে কোনো অধিকার ছিল না। বিয়ে আগে নারীর উপার্জিত সম্পদের মালিকানা বিয়ের সঙ্গে সঙ্গেই চলে যেত তাঁর স্বামীর হাতে। পবিত্র কোরআনে এরশাদ হয়েছে, ‘এক ছেলের অংশ দুই মেয়ের অংশের সমান। কিন্তু শুধু মেয়ে যদি দুইয়ের অধিক থাকে, তাদের জন্য পরিত্যক্ত সম্পত্তির দুই-তৃতীয়াংশ। আর মাত্র একজন মেয়ে থাকলে তার জন্য (পুরো সম্পদের) অর্ধাংশ...। এটা আল্লাহর নির্ধারিত অংশ।’ (সুরা নিসা, আয়াত: ১১)। একটু চিন্তা করলে দেখা যায়, কোনো নারী যদি বাবার সম্পত্তির প্রাপ্য অংশ যথানিয়মে পেয়ে যায়, স্বামীও যদি যথাসময়ে দেনমোহর পরিশোধ করে, স্বামীর সম্পত্তি থেকে প্রাপ্য অংশও যদি বিধবা স্ত্রীকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে একজন নারী বিপুল পরিমাণ অর্থের মালিক হবেন।’
লেখকের পরিচয়
ড. পি. এম. সিরাজুল ইসলাম পাঠকসমাজে ‘সিরাজ প্রামাণিক’ নামে পরিচিত। কলেজজীবন থেকেই তিনি সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত হন। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর তাঁর কাজের পরিধি আরও বিস্তৃত হয়। তিনি দৈনিক যুগান্তর, দৈনিক সংবাদ, দৈনিক আমার দেশসহ বিভিন্ন জাতীয় ও স্থানীয় দৈনিক পত্রিকায় লিখেছেন।

সংবাদপত্রের সুবাদে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে বিভিন্ন সেমিনারে যোগ দিতে তিনি সার্কভুক্ত বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেছেন। গবেষণার কাজে কিছু সময় কাটিয়েছেন থাইল্যান্ডের চিয়াং মাই বিশ্ববিদ্যালয়ে। রাজধানী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পর ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে অধ্যাপক ড. মো. শাহজাহান মণ্ডলের তত্ত্বাবধানে উচ্চতর গবেষণা করেন।
তার গবেষণার বিষয় ছিল, ‘Right to life and personal liberty in Bangladesh with special reference to extra-judicial killing.’ লেখকের আইনবিষয়ক বিভিন্ন নিবন্ধ দেশের জাতীয় দৈনিকগুলোতে প্রকাশিত হয়েছে। তিনি আইনবিষয়ক একাধিক গ্রন্থ রচনা করেছেন। তাঁর বেশ কিছু গ্রন্থ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে রেফারেন্স গ্রন্থ হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে বলে বইয়ের লেখক পরিচিতিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
তার প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে—‘পকেট আইন’, ‘আইনে আপনার যত অধিকার’, ‘২২টি আইনের সহজ পাঠ’, ‘জমি ক্রয়-বিক্রয় আইন’, ‘জমি জমার আইন-কানুন ও আলোচনা’, ‘রেজিস্ট্রেশন অ্যাক্ট অ্যান্ড ডিড রাইটিং’, ‘উইথ মডেল’, ‘রিয়াদ আইন’, ‘বিয়ে-তালাক-দেনমোহর-ভরণপোষণ ও নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন’, ‘সংবাদপত্র বিষয়ে আইন’, ‘কম্পিউটার অপরাধ আইন’, ‘ফৌজদারি মামলা পিটিশন পদ্ধতি’, ‘পারিবারিক আইন’, ‘নাগরিক অধিকার আইন’, ‘লিগ্যাল নোটিশ অ্যান্ড অ্যাফিডেভিট লেখার পদ্ধতি’, ‘প্রাত্যহিক জীবনে আইন’, ‘উত্তরাধিকার আইন’ ও ‘ওয়াক্ফ’ প্রভৃতি।


